কলাম

কৃষিতে অনেক সাফল্য

আব্দুল হাই রঞ্জু
আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। এই অর্থনীতির মূল কারিগর হলো কৃষক। যাদের নিরলস শ্রম, মেধা ও ঐকান্তিকতায় দেশের কৃষি দিন দিন উন্নত ও সমৃদ্ধ হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্যপণ্যের জোগান দেয়ার পাশাপাশি অর্জিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। আর এই কৃষকই জোগান দিচ্ছে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা। গত ৪৭ বছরে কৃষি উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিনগুণ অথচ প্রতিনিয়তই কমছে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ। সীমিত এই জমিতে কৃষক বছরে ২-৩ বার পর্যন্ত খাদ্যের চাষাবাদ করে যাচ্ছে। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের মুখের আহার যারা জোগান দিচ্ছে, সেই কৃষকের সমৃদ্ধি আসেনি। উল্টো নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহে অপারগ চাষিরা অতিকষ্টে দিনাতিপাত করতে বাধ্য হচ্ছে। যাদের মধ্যে অধিকাংশের ভাগ্যেই মৌলিক অধিকারগুলো ভোগের সুযোগ মেলে না।
সম্প্রতি জাতীয় একটি দৈনিকে ‘৪০০ কোটি টাকার টমেটো নষ্ট’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরটি যে উদ্বেগের তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগারের অভাবে সবজির বাড়তি ফলন হলেই বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে কৃষক। যেমন বেশ ক’বছর ধরেই টমেটোর বাম্পার ফলন হচ্ছে। এ বছর চাষি পর্যায়ে যার ক্রয়মূল্য প্রতি কেজি মাত্র ৪-৫ টাকা। যাতে উৎপাদন খরচ তো উঠেই না, বাধ্য হয়ে টমেটো মাঠেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অথচ ভোক্তা পর্যায়ে যার সর্বনিম্ন মূল্য ১০-১৫ টাকা। অর্থাৎ একদিকে যেমন উৎপাদকের স্বার্থ ক্ষুণœ হচ্ছে, অন্যদিকে ভোক্তাকেও তুলনামূলক বেশি মূল্যে পণ্য কিনতে হচ্ছে। অথচ সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার স্থাপিত হলে টমেটো চাষিরা টমেটো হিমাগারে সংরক্ষণ করে সারা বছরই উপযুক্ত মূল্যে বিক্রি করার সুযোগ পেত। কিন্তু সে সুযোগ যেন এ দেশের চাষিদের ভাগ্যে সোনার হরিণের মতোই। বরাবরই আমরা দেখে আসছি, যখন টমেটো চাষের মৌসুম শেষ হয়ে যায় তখন বিদেশ থেকে দেদার টমেটো আমদানি হয়। যা ভোক্তাদের চড়া মূল্যে কিনে খেতে হয়। মূলত রপ্তানিকারক দেশের হিমাগারে টমেটো সংরক্ষিত থাকে। দাম বেড়ে গেলে চাষিরা হিমাগার থেকে টমেটো তুলে রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রি করে। ফলে সে দেশের টমেটো চাষিরা উপকৃত হয় এবং দেশও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। দেশে প্রতি বছর ৭৫ হাজার একর জমিতে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টন টমেটো উৎপাদিত হয়। ভোক্তা পর্যায়ে এর গড় দাম ধরা হয়েছে প্রতি কেজি ২০ টাকা পর্যন্ত। সে হিসাবে উৎপাদিত টমেটোর দাম ৮০০ কোটি টাকা। অথচ সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের অভাব, সরবরাহে দুর্বলতা, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতার অভাবে নষ্ট হচ্ছে এর অর্ধেকটাই; যার বাজার মূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ফল ও সবজি ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সংগ্রহ পরবর্তী লোকসান’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ এলাকায় উৎপাদিত সবজি ও ফলের অপচয়ের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন দেশভিত্তিক আলাদা আলাদা প্রতিবেদনের সমীক্ষায় বাংলাদেশের টমেটোর প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, টমেটো আবাদের সময় টমেটো চাষিরা বাছবিচারহীনভাবে রোগ সংক্রমণ ও কীটপতঙ্গের প্রকোপের আশঙ্কায় ২৯ ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করেন। এএফওর জরিপে দেখা গেছে, উৎপাদিত টমেটোর ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ স্থানীয় মোকাম পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায় আবার এ টমেটো রাজধানী পর্যন্ত অন্যান্য সবজির সঙ্গে ট্রাকে গাদাগাদি করে নেয়ার কারণেও নষ্ট হয়ে থাকে। এএফওর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, টমেটো চাষিরা গড়ে প্রতি কেজিতে ৫ টাকা পর্যন্ত মূল্য পেয়ে থাকেন। আর ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজিতে ৪০-৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। এএফওর সমীক্ষায় বলা হয়েছে, সাধারণ কয়েকটি ভুল পদ্ধতির কারণে বাংলাদেশে এ সবজিটি বিপুল পরিমাণে নষ্ট হচ্ছে। টমেটো সংগ্রহের সময় কাঁচি ব্যবহার করে বোঁটাসহ সংগ্রহ, সঠিকভাবে আক্রান্ত সবজি আলাদা করা ও ক্লোরিন পানিতে ধুয়ে ব্যাকটেরিয়া রোধ করাসহ ঝুড়িতে পরিবহন করা সম্ভব হলে অপচয় ২ শতাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাস্তবতা হচ্ছে টমেটোভিত্তিক কৃষি শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হলে প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ টমেটো নষ্ট হচ্ছে, তা রোধ করা সম্ভব হবে। দেশটি কৃষিনির্ভর অথচ উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণের অভাবে যেমন সমানেই নষ্ট হচ্ছে, তেমনি উৎপাদনের ধারাবাহিকতাকেও ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে টমেটো চাষিরা লোকসান গুনতে থাকলে একপর্যায়ে এ ফসল উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবে। ফলে টমেটোর ঘাটতি দেখা দেবে আবার চাহিদা পূরণ করতে বিদেশ থেকে টমেটো আমদানি বেড়ে যাবে। আমাদের দেশে শুধু টমেটোর ক্ষেত্রেই নয়, আলু, বেগুনসহ অন্যান্য সবজির ক্ষেত্রেও বাড়তি চাষাবাদ হলে কৃষকের কপাল পোড়ে। উল্লেখ্য, নওগাঁর রানীনগরে চলতি রবি মৌসুমে বিটি, কাজলা, আলতা বুলবুলি, বারি-১ ও সাদা লড়ি জাতের বেগুনের বাম্পার ফলন হলেও বাজারমূল্য আশানুরূপ না পাওয়ায় চাষিরা লোকসানের মুখে পড়েছে। এভাবেই সবজির বাম্পার ফলন হলেও উপযুক্ত মূল্যের অভাবে চাষিদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এ সংকট মোকাবিলা করতে হলে সবজি সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার সরকারি-বেসরকারিভাবে স্থাপন করা জরুরি। চাষিরা যেন স্বল্প খরচে উৎপাদিত সবজি হিমাগারে সংরক্ষণ করতে পারে, তা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনরা খাদ্যশস্য উৎপাদনে যে পরিমাণ ভর্তুকি কিংবা সহায়তা দিয়ে থাকে, উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ কিংবা বিপণনের ক্ষেত্রে সে পরিমাণ সহায়তা দেয় না। ফলে কমবেশি প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো পণ্যের বাড়তি ফলন হলেই চাষিদের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়।
মোদ্দা কথা, কৃষিনির্ভর দেশে কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের ক্ষেত্রে সরকারের কৃষিবান্ধব সমন্বিত কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। তাহলে বাড়তি চাষ করে চাষিদের লোকসানের মুখে পড়তে হবে না আর এটি নিশ্চিত করতে না পারলে চাষিদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলতে বলতে হয়ত মুখে ফেনা তোলা সম্ভব হবে কিন্তু প্রকৃত অর্থে চাষির স্বার্থ রক্ষা করা কোনো সময়েই সম্ভব হবে না। উল্টো কৃষি কাজের প্রতি আগ্রাহ হারিয়ে কৃষক অন্য জীবিকা বেছে নেবে। এতে করে আমাদের কৃষি অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি চরম খাদ্য সংকটে পড়বে দেশ।
লেখক : কলাম লেখক