খেলা

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলায় ১৩ বার চ্যাম্পিয়ন হলেন দিদার বলি

ক্রীড়া প্রতিবেদক
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলার ১০৮তম আসরে ১৩ বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন দিদার বলি। এর আগে ১২ বারের চ্যাম্পিয়ন রামুর দিদার বলি ফাইনালে প্রায় ১৭ মিনিট লড়াই করে গতবারের চ্যাম্পিয়ন উখিয়ার শামসু বলিকে পরাজিত করে শিরোপা জেতেন। ২৪ এপ্রিল নগরীর লালদিঘি মাঠে শুরু হয় জব্বারের বলির ফাইনাল খেলা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শতাধিক বলি এতে অংশ নেন। খেলা শেষে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন চ্যাম্পিয়ন দিদার বলি ও রানার আপ শামসু বলির হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন। টানটান উত্তেজনার ফাইনাল খেলায় একে অন্যকে পরাস্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। ফাইনাল খেলা শুরুর পর থেকেই দুই ফাইনালিস্ট একে অন্যকে মাটিতে ফেলে দিয়ে পরাস্ত করার চেষ্টা করতে থাকেন। দিদার বলি কয়েকবার শামসু বলিকে উপরের দিকে তুলে মাটিতে আছড়ে ফেললেও শামসুর পিঠ মাটিতে লাগাতে পারেননি তিনি। পরে খেলার ১৭ মিনিটের মাথায় মাঠের সীমানার বাঁশ এবং রশির পাশে আছড়ে ফেলে শামসুকে পরাস্ত করেন দিদার। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আগামীবার থেকে আর দেখা যাবে না ঐতিহ্যবাহী জব্বার বলির সবচেয়ে বেশি ট্রফির মালিক দিদারকে। এর আগে জব্বারের বলি খেলায় অংশ নিতে নিবন্ধন করেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ১০২ জন বলি। এর মধ্যে খেলায় অংশ নেন ৭৪ জন বলি। প্রথম রাউন্ডের খেলায় ৭০ জন অংশ নেন। প্রথম রাউন্ডে ৩৫ জন খেলোয়াড় তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে জয়ী হন। এরপর প্রথম সেমিফাইনালে মিরসরাইয়ের লিয়াকত বলিকে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেন রামুর দিদার বলি। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে কুমিল্লার রাশেদ বলিকে হারিয়ে বিজয়ী হন উখিয়ার শামসু বলি। ফাইনালে উখিয়ার শামসু বলিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন রামুর দিদার বলি। বলি খেলায় চ্যাম্পিয়নকে নগদ ২০ হাজার টাকা এবং রানার আপকে ১৫ হাজার টাকা পুরস্কার হিসেবে দেয়া হয়। এছাড়া প্রথম রাউন্ডের খেলায় বিজয়ী ৩৫ জনকে ক্রেস্ট এবং ১ হাজার টাকা করে পুরস্কার দেয়া হয়। খেলা শেষে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গতবারের চ্যাম্পিয়ন শামসু বলি অভিযোগ করে বলেন, আমার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। আমার পিঠ মাটিতে ফেলতে পারেনি দিদার। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আমাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে হারানো হয়েছে। চ্যাম্পিয়ন দিদার বলি এ অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, রেফারির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। লাখো দর্শক দেখেছে, কে জিতেছে। জব্বারের বলি খেলার এবারের ১০৮তম আসরের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মাসুদ উল হাসান। অনুষ্ঠান আয়োজক কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী ও সাধারণ সম্পাদক শওকত আনোয়ার বাদলসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলা ও বৈশাখী মেলার ১০৮তম আসরে ২৪ এপ্রিল ছিল মেলার দ্বিতীয় দিন। বর্ণাঢ্য ও বর্ণিল আয়োজনের মাধ্যমে লালদিঘির ময়দানের আশপাশের প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এ বৈশাখী মেলা বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বৈশাখী মেলা। জব্বার বলির ফাইনাল খেলার দিন মেলায় সাধারণ মানুষের উপচেপড়া ভিড় ছিল লক্ষ্য করা মতো।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি যুবসম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করতে ও শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম নগরীর বদরপাতি এলাকার সওদাগর আবদুল জব্বার ১৯০৯ সালে এই খেলা ও মেলার সূচনা করেন। এ খেলার প্রবর্তক আবদুল জব্বারের মৃত্যুর পর এ প্রতিযোগিতা জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রতি বছর ১২ বৈশাখ নগরের লালদিঘি মাঠে এই বলি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘কুস্তি’ বলি খেলা নামে পরিচিতি। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও তৎকালীন বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকেও নামিদামি বলিরা এ খেলায় অংশ নিতেন।
চট্টগ্রামকে বলা হয় বলির দেশ। কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীর মধ্যবর্তী স্থানের ১৯টি গ্রামে মল্ল উপাধিধারী মানুষের বসবাস ছিল। প্রচ- দৈহিক শক্তির অধিকারী মল্লরা সুঠামদেহী সাহসী পুরুষ এবং তাদের বংশানুক্রমিক পেশা হচ্ছে শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন। এই মল্লবীরেরাই ছিলেন বলি খেলার প্রধান আকর্ষণ ও বলি খেলা আয়োজনের মূল প্রেরণা। চট্টগ্রামের ২২টি মল্ল পরিবার ইতিহাস প্রসিদ্ধ। আশিয়া গ্রামের আমান শাহ মল্ল, চাতরি গ্রামের চিকন মল্ল, কাতারিয়া গ্রামের চান্দ মল্ল, জিরি গ্রামের ঈদ মল্ল ও নওয়াব মল্ল, পারি গ্রামের হরি মল্ল, পেরলা গ্রামের নানু মল্ল, পটিয়ার হিলাল মল্ল ও গোরাহিত মল্ল, হাইদগাঁওর অলি মল্ল ও মোজাহিদ মল্ল, শোভনদন্ডীর তোরপাচ মল্ল, কাঞ্চননগরের আদম মল্ল, ঈশ্বরখাইনের গনি মল্ল, সৈয়দপুরের কাসিম মল্ল, পোপাদিয়ার যুগী মল্ল, খিতাপচরের খিতাপ মল্ল, ইমামচরের ইমাম মল্ল, নাইখাইনের বোতাত মল্ল, মাহাতার এয়াছিন মল্ল, হুলাইনের হিম মল্ল, গৈরলার চুয়ান মল্ল।
সাম্প্রতিক সময়ে পেশাদার বলির অভাবে বলি খেলার তেমন আকর্ষণ না থাকলেও জব্বারের বলি খেলার মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে মেলা। জব্বার মিয়ার বলি খেলা ও বৈশাখী মেলা চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অহংকারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় লোকজ উৎসব হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করা হয়। খেলাকে কেন্দ্র করে ৩ দিনের আনুষ্ঠানিক মেলা বসার কথা থাকলেও কার্যত ৫-৬ দিনের মেলা বসে লালদীঘির ময়দানের চারপাশের এলাকা ঘিরে। জব্বারের বলি খেলার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে যেমন কক্সবাজারে ডিসি সাহেবের বলি খেলা, সাতকানিয়ায় মক্কার বলি খেলা, আনোয়ারায় সরকারের বলি খেলা, রাউজানে দোস্ত মোহাম্মদের বলি খেলা, হাটহাজারীতে চুরখাঁর বলি খেলা, চান্দগাঁওতে মৌলভীর বলি খেলা বিদ্যমান রয়েছে।