সাহিত্য

ডায়াবেটিক ভালোবাসা সিনথেটিক প্রেম

অরুণ কুমার বিশ^াস
শিরোনামেই বদনাম। হয়ত ভাবছেন, ভালোবাসার আবার রোগ হয় নাকি! মানে ডায়াবেটিস। সোজা বাংলায় যাকে বলে চিনিরোগ। কথাটা অবশ্যি আমার নয়, মহামতি প্লেটো আরো আগেই বলে গেছেন। তার ভাষায় প্লেটোনিক লাভ। মানে বিড়াল বলে, মাছ খাবো না, আঁশ ছোঁবো না, কাশী যাবো। শুধু ভালোবাসাই বা বলি কেন, সবখানেই এখন কেমন যেনো কী নেই কী নেই ভাব! দেশের রাজনীতির কথাই ধরুন না! দেশ চলছে, উন্নয়ন আসছে, একের পর এক সুখবর শুনছি। অথচ পাবলিকের মনে আনন্দ নেই। তারা যেন কেমন ম্যাদা মেরে গেছে। তার মানে কি সব্বাইকে চিনিরোগে ধরেছে! তাই কেমন মিইয়ে গেছে সব! কী জানি বাপু! হবেও বা। আগে একটু চিনিবিহীন ভালোবাসার কথা বলে নিই, তারপর অন্যসব। ইদানীং লক্ষ্য করবেন, মানুষে মানুষে আগের সেই ভাব-ভালোবাসা যেন আর নেই। কোনো সম্পর্কে জাড়ানোর আগে সকলে যেন গণনযন্ত্র মানে ক্যালকুলেটর নিয়ে বসে। ভাবতে থাকে এই সম্পর্ক করলে আমার আখেরে লাভ কী! লাভ যদি নাই হবে, তাহলে মিছে ‘লাভ’ মানে ভালোবাসায় জড়াবো কেন!
আবার ওদিকে কিছু একটা সম্পর্ক না থাকলেই বা চলে কী করে! একেবারে একা কি থাকা যায়! মানুষ তো আর অরণ্যানী বা দ্বীপ নয় যে একা থাকবে! অমুকের প্রেমিক আছে আমার নেই, এ কেমন কথা! আবার ছেলেটি ভাবে, একটা অন্তত গার্লফ্রেন্ড না থাকলে লোকে কী ভাববে! কাপুরুষ! এই যে লোকে কী ভাববে, বা পাছে লোকে কিছু বলেÑ এই ভেবে ভেবে আমাদের জান জেরবার। যেন জীবনটা নিজের নয়, পরের কথায় চলে! স্বকীয়তা বা স্বাতন্ত্র্য শব্দগুলো ক্রমশ যেনো বিদায় নিচ্ছে আমাদের জীবন থেকে। আর সেই থেকে ডায়াবেটিক প্রেমের উদ্ভব। আছি আর নেই এর মাঝামাঝি একরকম সম্পর্ক। তাতে না আছে স্বাদ না কমিটমেন্ট। একটু ভেবে দেখুন, আমাদের পারিবারিক সম্পর্কগুলোর অবস্থাও কিন্তু তথৈবচ। দিন দিন সম্পর্কের আঁশ কেটে যাচ্ছে। যৌথপরিবার নেই বললেই চলে। যা-ও বা আছে, ডাঙায় তোলা মাছের মতো সেসব সম্পর্ক রীতিমতো খাবি খাচ্ছে। দেশে ক্রমশ ওল্ডহোম বাড়ছে। ক্যারিয়ার নামক বস্তুটি বগলদাবা করতে গিয়ে আমরা সব কচ্ছ তুলে ছুটছি। ভালোবাসা সেখানে নেই বা থাকলেও ওই যে, চিনিবিহীন লাভ; বড়ই বিস্বাদ আর বিড়ম্বনার ব্যাপার।
অবশ্য কখনো কখনো এর উল্টোটাও দেখা যায়। বড় বেশি মাখোমাখো ভাব। তাতেও বিড়ম্বনা বড় কম নয়। যাকে বলে পরচর্চা ও পরকীয়া। অনেকে আবার এই পরকীয়া শব্দটিতে কিঞ্চিৎ দোষ দেখেন। কেন ভাই, করতে দোষ নেই, বললেই দোষ! নিজের কাজ নিজে করতে না পারলে তো অপরে করবেই। যাকে বলে আউটসোর্সিং। এও একরকম চিনিরোগ। মানে কর্মে অনীহা। জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও ইদানীং এহেন আউটসোর্সিংয়ের বড্ড প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। কিছু হলেই অমনি বাড়তি লোক লাগানোর প্রবণতা। অথচ প্রাচীন ভারতের চাণক্য প-িত স্পষ্ট বলে গেছেন, ভাড়াটে সৈনিক দিয়ে কখনো যুদ্ধে জেতা যায় না। সে লড়াই করবে স্রেফ অর্থ বা স্বার্থের জন্য। নিজ গরজে নয়। দেশ বা দেশের মানুষকে তো সে নিজের বলে ভাববে না! ডায়াবেটিক প্রেমে যেমন জোশ থাকে না, এই জাতীয় যুদ্ধেও তেমনি কোনো বল পাওয়া যায় না। জাস্ট করতে হয় তাই করা। উনো ভাতে দুনো বল। অনেকটা সেইরকম।
দেশ এগোচ্ছে বেশ কথা। কিন্তু দেশ যে অপ্রেমে সয়লাব তার কী হবে! অপ্রেম বুঝলেন না! জোর করে নারীর সম্ভ্রমহানি। প্রেমের নামে উৎকেন্দ্রিক আচরণ। দু’শ্রেণির মানুষ এখন খুব দেখা যায়। এক হলো দর্শক মানে ঠুঁটো জগন্নাথ, আরেক দল ধর্ষক। এই নীরব দর্শক আর ধর্ষকের জ্বালাতনে জীবন আমাদের ওষ্ঠাগত। যখন তখন প্রাণবায়ু নির্গত হবে আর কি!
আবার ওপরে যাই। সেই চিনিবিহীন ডায়াবেটিক প্রেম। প্রেম নাকি স্বর্গ থেকে আসে। তাই বলা হয়, লাভ ইজ হেভেন। কিন্তু এর পরিণতি কী হয় একবার ভেবে দেখেছেন! প্রেমের বিয়েতে খুব সুখ-সমৃদ্ধি জোটে এমনটি অবশ্যই শোনা যায় না। বরং উল্টোটা হয়। কেউ কাউকে মানে না। শেষে দুজনেই সমানে বৈচিত্র্য খোঁজে। প্রকৃতি তো শূন্যতা সহ্য করে না। তাই ঘরোয়া বৈরাগ্যে বাইরে থেকে প্রেম আসে। সে বসের সাথে হোক বা সহকর্মী। সেখানেও সেই স্বার্থের দ্বন্দ্ব। সেখানে থাকে ভয় আর সম্ভ্রম খোয়ানোর আশঙ্কা। তাই মন দিয়ে প্রেমটা ঠিক করা যায় না। তখন প্রেম জমতে জমতেও জমে না।
একটা কথা আছে জানেন তো, অকালের কাঁঠালে মিঠা নেই। বিপ্রতীপ সম্পর্কেও তাই আস্বাদ পাওয়া যায় না। জলের চেয়ে জ্বলে বেশি। চিনিহীন ভালোবাসা আর কতটা কী দেয় বলুন তো। সম্প্রতি এমন এক সম্পর্কের জেরে অকালে ঝরে গেল সম্ভাবনাময় এক তরুণের জীবন। ওই যে, অসঙ্গত ও অগ্রহণযোগ্য প্রেম। সেখানে অবশ্য চিনির কমতি ছিল না কোনো। বিয়ের পূর্বের সম্পর্ক যখন স্বামী বেচারা টের পায়, তখন তার মাথার ওপরে ছাদ ভেঙে পড়ে। আর যাই হোক, অবিশ^স্ত বউ নিয়ে তো আর ঘর করা যায় না। তাই সে তক্কে তক্কে থাকে। সুযোগ খোঁজে সেই প্রেমিক আর স্ত্রীকে হাতেনাতে ধরবে বলে। ধরেও একসময়, তবে তাতে হিতে বিপরীত হয়। ভেঙে যায় সংসার, আর ঝরে যায় একটি জীবন। তাই বলি কী, ডায়াবেটিক আর সিনথেটিক প্রেম থেকে বিরত থাকুন। সুস্থ স্বাভাবিক জীবনেই সুখের সন্ধান মেলে। গলি-ঘুপচিতে নয়।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও রম্যলেখক