রাজনীতি

নতুন কা-ারির খোঁজে বিএনপি : হতাশায় দলের তৃণমূল নেতাকর্মী

নুরুল ইসলাম সোহাগ
দুর্নীতির দায়ে ৫ বছরের দ- পেয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন কারাগারে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত এবং লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। কবে তিনি দেশে ফিরবেন তাও অনেকটা অনিশ্চিত। সম্প্রতি আবার জানা গেছে তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিকই নন; এমনকি তারেক পরিবারের কেউই বাংলাদেশের ভোটারও নন, সবাই বাংলাদেশি পাসপোর্ট পরিত্যাগ করে লন্ডনে বসবাস করছেনÑ এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির নতুন কা-ারি কে হবেন এবং নতুন কা-ারি নিয়োগ করতে গিয়ে বিএনপি কয় ভাগে বিভক্ত হবে, এসব নিয়ে চরম হতাশা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে মুচলেকা দিয়ে লন্ডনে যাওয়ার ১০ বছর পর প্রথমবারের মতো বিএনপি স্বীকার করল তাদের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে আসলে পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম বা রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। ১০ বছর ধরে চিকিৎসার ঘটনা নিয়ে সবসময় এমনকি আদালতের কাছেও এতদিন দলটি বলেছে, তারেক রহমান লন্ডনে চিকিৎসাধীন আছেন। রাজনৈতিক আশ্রয়ের তথ্য দিয়ে তারেক রহমানের বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রত্যাহারে সৃষ্ট রাজনৈতিক ব্যর্থতা সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও এর মধ্য দিয়ে নতুন সংকটে জড়িয়ে পড়ল বিএনপি। রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য পাসপোর্ট জমা দেয়ার কথা স্বীকারের মধ্য দিয়ে দলটির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ও দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাংলাদেশি নাগরিকত্বের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ল।
এদিকে তারেক রহমানের পাসপোর্ট প্রত্যাহারের ঘটনা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অনেকটা দায় স্বীকার করে বলেছেন, তারেক রহমান পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন! এবং তিনি সাময়িকভাবে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন!
১০ বছর ধরে লন্ডনে ‘চিকিৎসাধীন’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পরিত্যাগ করার ইস্যুতে কয়েকদিন ধরেই তোলপাড় চলছে। দেশের গ-ি ছাড়িয়ে বিদেশেও চলছে নানা আলোচনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দ-িত আসামি তারেক রহমানকে যেভাবেই হোক দেশে ফিরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে কথা বলেছি। যে অপরাধী সাজাপ্রাপ্ত, সে কী করে এখানে থাকে?
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক আশ্রয়ের তথ্য দিয়ে তারেক রহমানের বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রত্যাহারে সৃষ্ট রাজনৈতিক ব্যর্থতা সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও এর মধ্য দিয়ে নতুন সংকটে জড়িয়ে পড়ল বিএনপি। কারণ এর মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব থাকার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে যদি ৪ বছর আগে তারেক রহমান ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাসপোর্ট জমা দিয়ে থাকেন তাহলে কি বাংলাদেশের পাসপোর্ট ছাড়াই তারেক রহমান ২ বছর আগে সপরিবারে সৌদি আরব সফর করেছিলেন?
এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, তারেক রহমানের পক্ষের আইনজীবীগণ দীর্ঘদিন ধরে আদালতে মিথ্যাচার করে আসছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে প্যারোলে লন্ডন যান। যাওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি আদালতে হাজির হননি। তাকে তো আজীবনের জন্য প্যারোলে দেয়া হয়নি। সব সময় তার আইনজীবীগণ তাকে অসুস্থ বলে আসছেন। তিনি লন্ডনে অবস্থান করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনীতি করছেন। দলের নেতারা বলছেন তারেক রহমান লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন। আমাদের স্বরাষ্ট্র, আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত একত্রিত হয়ে আইনানুগ পদ্ধতিতে তাকে ফিরিয়ে আনা। ফিরিয়ে এনে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচারে সম্মুখীন করা।
এদিকে তারেক রহমানের জন্ম নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘চোরামি’ করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, মির্জা ফখরুল মিথ্যা কথা বলেছেন যে, জন্মসূত্রে তারেক রহমান বাংলাদেশি। চোরা তারেকের জন্ম করাচি। জন্ম নিয়েও চোরামি। খালিদ মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, মিথ্যা তথ্যের ওপর ভর করেই বিএনপির জন্ম। তাদের এক নেতা আগের দিন চ্যালেঞ্জ দিলেনÑ পাসপোর্ট দেখাতে। পরদিন আরেক নেতা এসে বললেন, পাসপোর্ট না থাকলে সমস্যা নেই। জন্মসূত্রে তারেক রহমান বাংলাদেশি। অথচ তারেক রহমানের জন্ম করাচিতে। তাই তারেক রহমান কোনোভাবেই জন্মসূত্রে বাংলাদেশি না।
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী আরো বলেন, নিজের নেতার জন্ম কোথায়, কবে জন্ম নিয়েছেনÑ মির্জা ফখরুল সাহেব তা জানেন না। অথবা জেনেশুনে মিথ্যাচার করছেন। যদি নিজের নেতার জন্ম সম্পর্কে তিনি না জানেন তাহলে ইতিহাস জেনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উচিত তারেক রহমান জন্মসূত্রে বাংলাদেশিÑ এমন বক্তব্য প্রত্যাহার করা। আর মিথ্যাচার করে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করার দায়ে বিএনপি মহাসচিবের প্রকাশ্যে জনগণের নিকট ক্ষমা চাওয়া উচিত। নাহলে তারেক রহমানের মতো মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বাংলাদেশে রাজনীতি করার নৈতিক অধিকার হারাবেন।
এদিকে তারেক রহমান বিতর্কে যখন রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত ঠিক তখন বিএনপিতে চলছে চরম শূন্যতা ও হাহাকার। তবে দলের তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন হলেও বিএনপির অনেক শীর্ষ নেতাই তলেতলে আছেন খোশ মেজাজে। তারা দলের শীর্ষ নেতার পদ দখল করার গোপন মিশনে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার খালেদা-তারেককে বাদ দিয়ে নতুন দল গড়ার স্বপ্নে কাজ করছেন।
খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান বিএনপির নেতৃত্ব থেকে আউট হয়ে যাওয়ার পর এখন দলটির মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, তাদের আগামীর নেতা কে? মোটকথা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে আসলে কে আসবে, কঠিন এ মুহূর্তে কে দলের হাল ধরবেনÑ তা ভেবে রীতিমতো শঙ্কিত বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তাই তারাও এখন আশঙ্কা করছেন, ‘এই যাত্রায় বিএনপির ভাঙন বোধ হয় আর ঠেকানো গেল না।’