অর্থনীতি

বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য খুলে গেল আরব আমিরাতের শ্রমবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার আবারো পুরোদমে খুলছে। প্রাথমিকভাবে ১৯ ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশি কর্মী নেবে দেশটি। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। ১৮ এপ্রিল সংযুক্ত আরব-আমিরাতের দুবাইয়ে দেশটির মিনিস্ট্রি অব হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড এমিরেটাইজেশন-এর আন্ডার সেক্রেটারি সাইফ আহমেদ আল সুআইদি ও বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার নিজ নিজ দেশের পক্ষে এমওইউতে সই করেন। সৌদি আরবের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী ২০১২ সালে ২ লাখ ১৫ হাজার কর্মী দেশটিতে যায়। এরপর থেকে নানা কারণে দেশটিতে কর্মী প্রেরণ কমতে থাকে। ২০১৩ সালে ১৪ হাজার, ২০১৪ সালে ২৪ হাজার, ২০১৫ সালে ২৫ হাজার, ২০১৬ সালে ৮ হাজার, ২০১৭ সালে ৪ হাজার এবং চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মাত্র ৬০৫ জন কর্মী গেছেন আরব আমিরাতে। উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৩ লাখের অধিক বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে।
শ্রম অভিবাসন বিশ্লেষক মোহাম্মদ আবদুল হালিম এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, আরব আমিরাত আমাদের ট্রাডিশনাল শ্রমবাজার। কয়েক বছর ধরে ওই দেশে কর্মী প্রেরণ সীমিত ছিল। নতুন সমঝোতা স্মারক সইয়ের ফলে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে। ফলে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথ সুগম হবে। এখন অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী পাঠানো আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বিগত কয়েক মাসের আলাপ-আলোচনা ও সরকারের নানামুখী প্রচেষ্টার পর এই এমওইউ চূড়ান্ত করা হয়। উভয় দেশের আগ্রহ ও সম্মতির ভিত্তিতে এটি সই হয়েছে। এ সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনিস্ট্রি অব হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড এমিরেটাইজেশন-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী নাসের আল হামলি উপস্থিত ছিলেন।
এমওইউতে বাংলাদেশ থেকে ১৯টি ক্যাটাগরির কর্মী নিয়োগের বিধান, পদ্ধতি, রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি ও উভয় দেশের সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য, কর্মীদের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা, এমপ্লয়ারদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, নিয়োগ চুক্তির বিধান ও পৃথক একটি বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ইত্যাদি উল্লেখ রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে এ সকল কর্মীর স্বার্থ রক্ষার্থে ২০১৭ সালে কার্যকর হওয়া আইনের আলোকে সমঝোতা স্মারকটিতে শ্রমিক, মালিক ও উভয় দেশের সরকারের দায়িত্ব বর্ণিত হয়েছে। নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল শ্রম অভিবাসনের লক্ষ্য অর্জনের বিষয়সমূহ বিবেচনায় রেখে সমঝোতা স্মারকটি সই করা হয়। সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবায়নের জন্য উভয় দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি জয়েন্ট কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
এমওইউ স্বাক্ষরের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আজহারুল হক, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. সুজায়েত উল্লাহ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক তারেক আহমেদ এবং দুবাইয়ে নিযুক্ত কনসাল জেনারেল এস বদিরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে রাজধানীর ইস্কাটনের প্রবাসী কল্যাণ ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, ১৯ ক্যাটাগরিতে লোক নেয়ার বিষয়ে যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, তার অধীনে দুই দেশকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হবে। আর এই কমিটি ঠিক করবে কিভাবে কত টাকা খরচে লোক যাবে। অভিবাসন ব্যয় (মাইগ্রেশন কস্ট), মেডিকেল থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয় যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি ঠিক করবে। এই বাজারে সিন্ডিকেট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণে এখানে কোনো জনশক্তি রপ্তানিকারকের ভূমিকা থাকবে না। দুই দেশের মধ্যে গঠিত কমিটিই সব কিছু দেখবে। তবে জনশক্তি পাঠাতে যদি ওয়ার্কিং কমিটি মনে করে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের দরকার সে ক্ষেত্রে তাদের এখানে সংযুক্ত করা হতে পারে।
নূরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, আমরা আশা করছি আগামী ৩ মাসের মধ্যে এই ১৯ ক্যাটাগরিতে কর্মী পাঠাতে পারব। তবে কোন কোন এজেন্সিকে এ দায়িত্ব দেয়া হবে সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আমাদের কর্মী কিন্তু সব সময়ই যাচ্ছে। কিন্তু নতুন ১৯ ক্যাটাগরিতে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে এমওইউ সই হয়েছে। আমি সবাইকে বলবো এই ১৯ ক্যাটাগরিতে আমিরাতে যাওয়ার জন্য কেউ যেন কাউকে টাকা না দেন। ১৯ ক্যাটাগরির সবই গৃহকর্মী। গৃহকর্মীরা অনেকটা বিনা টাকায় দেশটিতে যাচ্ছেন। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কর্মী নিয়োগ এখন থেকেই কার্যকর হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মানবসম্পদ ও এমিরাটাইজেশন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে কর্মী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, ‘তদবির সেন্টার’ অর্থাৎ ‘ম্যানেজমেন্ট সেন্টারের’ মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ করা হবে। ‘তদবির সেন্টারটি’ ইউএই সরকারের মানবসম্পদ ও এমিরাটাইজেশন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে সরাসরি কাজ করবে। এ কাজে ওই দেশের অন্য কোনো রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির কোনো ভূমিকা থাকবে না। তারা যদি মনে করে এজেন্সি দিয়ে কর্মী নিয়োগ করবে তাহলেই কেবল সম্ভব। অন্যথায় কোনো জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এখানে কাজ করার সুযোগ পাবে না। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, কর্মীরা যাবে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। যদি চাহিদা বেশি থাকে তাহলে আমরা জনশক্তি রপ্তানিকারক নিয়োগ করব। কিন্তু এসব কিছুই হবে দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্তে। চুক্তির আলোকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই যেতে পারবেন।
সংবাদ সম্মেলনে সচিব নমিতা হালদার বলেন, আমিরাতের শ্রমবাজার খোলার আলোচনায় বারবার সামনে নিয়ে এসেছে আমাদের দুর্বলতাগুলো। তারা বারবার বলার চেষ্টা করেছে কোনো অপরাধী যেন দেশটিতে না যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে যে ১৯টি ক্যাটাগরিতে কর্মী যাবেন সেগুলো হচ্ছে হাউজমেড (গৃহকর্মী), প্রাইভেট সেইলর (ব্যক্তি মালিকানাধীন জাহাজের নাবিক), ওয়াচম্যান অ্যান্ড সিকিউরিটি গার্ড (নিরাপত্তাকর্মী), হাউজ হোল্ড শেফার্ড (রাখাল), ফ্যামিলি চোফার (গাড়ি চালক), পার্কিং ভ্যালে ওয়ার্কার্স (গাড়ি পার্কিংয়ের কর্মী), হাউজ হোল্ড হর্স গ্রুমার (ঘোড়া পালার সহিস), হাউজ ফ্যালকন কেয়ারটেকার অ্যান্ড ট্রেইনার (বাজপাখি পালক), ডমেসটিক লেবার, হাউজ কিপার, প্রাইভেট কোচ, বেবি সিটার (শিশু পরিচর্যাকারী), হাউজ হোল্ড ফার্মার (কৃষি কর্মী), গার্ডেনার, প্রাইভেট নার্স (ব্যক্তিগত সেবিকা, প্রাইভেট পিআরও (ব্যক্তিগত সহকারী), প্রাইভেট এগ্রিকালচার ইঞ্জিনিয়ার (কৃষিবিদ) এবং কুক।