ফিচার

মাদকের গ্রাস থেকে যেভাবে দূরে রাখবেন আপনার সন্তানকে

যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ
মাদকের কারণে বেড়ে যাচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়, ক্ষয়ে যাচ্ছে নৈতিক মূল্যবোধ। ভেঙে পড়ছে পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস। পরিবার ও সমাজে তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা। মাদকাসক্তের কারণে বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা, বাড়ছে নারী নির্যাতন ও বিবাহ বিচ্ছেদ, বাড়ছে আত্মহননও।

আপনার সন্তান মাদকাসক্ত নয়তো?
সন্তান মাদকাসক্ত কি না কিভাবে বুঝবেন এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী ডা. মোহিত কামাল বলেন, পরিবারের কেউ মাদকাসক্ত হলে এটা সহজেই বোঝা যাবে। তার আচরণই এটা বলে দেবে। এক্ষেত্রে খোঁজ রাখুন, সে কোথায় যায়, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করে। গভীর রাতে বাসায় ফিরছে নাতো? সবার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ না করলে তাকে জিজ্ঞেস করুন। মন খারাপের কারণ জানতে চান। সন্তানকে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফিস দিচ্ছেন, কিন্তু জমা দিচ্ছে না। পরীক্ষার রেজাল্টও বলছে না। সে যে কাজগুলো করে তা লুকাতে চেষ্টা করে। এমনভাবে সুন্দর কথায়, যুক্তি-উপমায় মুগ্ধ করে ফেলবে যে আপনি বুঝতেই পারবেন না সে মিথ্যা বলছে। আপনার সন্তান যদি আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে টাকা দাবি করে সেক্ষেত্রে যাচাই করুন আসলে তার কতটুকু অর্থের প্রয়োজন। সন্তান বাসার কোনোকিছু গোপনে সরিয়ে বা চুরি করছে কি না খেয়াল রাখুন। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় বাসার বাইরে থাকলে তার বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে খোঁজখবর নিন।

সন্তান বড় হোক পারিবারিক পরিবেশে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলামের মতে, শিশুদের প্রথম পাঠশালা হলো পরিবার। আর পারিবারিক বন্ধন-অনুশাসন যত মজবুত হবে আপনার সন্তান ততই সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। শিশুকাল থেকে সন্তানের মধ্যে ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যের বীজ রোপণ করতে হবে। মা-বাবার উচিত শিশুর ব্যক্তিত্ব এমনভাবে গড়ে উঠতে সহায়তা করা যেন সে আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মবিশ্বাসী হতে পারে। এজন্য শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। শ্লেষাত্মক বাক্য ব্যবহার না করে, সমালোচনা না করে যৌক্তিক বিষয়ে হ্যাঁ বলার অভ্যাস করতে হবে। পাশাপাশি শিশুর ভালো কাজে অবশ্যই প্রশংসা করে উৎসাহ দিতে হবে। অনাকাক্সিক্ষত আচরণে যথাসম্ভব মনোযোগ না দেয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের শিশুরা অশুভ আহ্বানকারীকে ভবিষ্যতে না বলতে পারবে। নিজেকে মাদকমুক্ত রাখতে পারবে। পরিবারের সন্তানের সামনে বাবা-মাকে ঝগড়া থেকে দূরে থাকতে হবে। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই বই পড়া, ছবি আঁকাসহ সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দিতে হবে। শিশু বয়সে কোনো ভুল করলে তাকে ধমক না দিয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে। একটু বড় হলে স্কুলে কোন ধরনের বন্ধু হচ্ছে সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে তার ক্লাসের বন্ধুদের নিয়ে আলোচনা করুন ও মজার ঘটনা জানুন। এ বয়সেই তার সঙ্গে সম্পর্কটা বন্ধুত্বপূর্ণ করুন। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরাই বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এ বয়সটাতে বাবা-মাকে সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে। পারিবারিক কিছু নিয়মকানুন তৈরি করতে পারেন; যেমন সন্ধ্যার পর পরিবারের সব সদস্য বাসায় অবস্থান করবে, একসঙ্গে খেতে বসা, সপ্তাহে অন্তত দু-একদিন পরিবারের সবাই মিলে বাইরে কোথাও খেতে, ঘুরতে বা সিনেমা দেখতে পারেন, বাসায়ও ঘরোয়া খেলাগুলো হতে পারে। পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ হলে তাকে বকাবকি না করে রেজাল্ট খারাপের কারণটা বের করুন, সন্তানকে বুঝিয়ে ভালো করে অধ্যয়ন করতে বলুন। সর্বোপরি পরিবারই হোক সুন্দর ব্যক্তিত্বের কাঠামো গড়ে তোলা ও পরিচর্যার কেন্দ্রস্থল।

কী করবেন সন্তান যদি মাদকাসক্ত হয়েই যায়
বাবা-মায়ের সতর্কতার অভাব বা খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে আপনার সন্তান যদি মাদকাসক্ত হয়েই যায় তাহলে ঘাবড়ে না গিয়ে সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন, সন্তানকে সময় দিন। এ ব্যাপারে মনোবিজ্ঞানী ডা. মোহিত কামাল বলেন, আসক্ত সন্তানের অভিভাবক বিশেষত বাবা বা মায়ের কারণে কখনও কখনও সমস্যাটি আরও মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। স্নেহাতিশয্যে মা বা বাবা সন্তানের এই দুষ্কর্মের কথাটি যতদিন সম্ভব পরিবারের অন্য অভিভাবকদের কাছে গোপন রাখার চেষ্টা করেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব সন্তানের অনেক অযৌক্তিক দাবি (টাকা-পয়সা ও অন্যান্য) একদিকে পূরণ করে চলেন, অন্যদিকে নানাভাবে সন্তানের প্রতি নজর রাখতে বা বুঝিয়ে শুনিয়ে সন্তানকে মাদক গ্রহণ থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করেন। অবশেষে প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হয়ে যায় তখনই বিষয়টি পরিবারের অন্য অভিভাবকদের গোচরে আসে। কিন্তু ততদিনে সন্তান মাদক গ্রহণে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে যায় যে তাকে মাদকমুক্ত করা অনেকাংশে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং মাদক গ্রহণের ব্যাপারে যতদ্রুত সম্ভব নিশ্চিত হওয়া এবং অভিভাবকদের যথোচিত প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এ সমস্যা মোকাবিলায় দৃঢ় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
অতএব মা-বাবা ও অভিভাবক সবাই মিলেই সমস্যাটির সমাধানে প্রথম থেকেই আন্তরিক প্রয়াস চালাবেন। মাদকাসক্ত সন্তানকে কিভাবে দেখাশুনা করবেন এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক জোবেদা খাতুন বলেন, সন্তান মাদকাসক্ত হলে তার প্রতি আরও আন্তরিক ও মনোযোগী হতে হবে। অনেকের মধ্যে দেখা যায় সন্তান মাদকাসক্ত হলে তাকে ঘরে বেঁধে রাখেন, তার মোবাইল কেড়ে নেন, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাকে পুরোপুরি দুনিয়া থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দেন। এসব করলে সন্তান আরও বেশি বখে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যেকোনো ঘৃণ্য কাজ করতে পারে। তাই সন্তানকে আস্তে আস্তে আয়ত্বে আনুন। তার প্রয়োজনীয় টুকুই তাকে দিন। নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যান। মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো সন্তানের সামনে তুলে ধরুন। পারিবারিক আনন্দে তাকে শামিল করুন এবং অবশ্যই লোকলজ্জা না করে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হোন।