ফিচার

শবে বরাতের ফজিলত

শাহ মাহমূদ হাসান
শবে বরাতের রাতে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের দ্বার ব্যাপকভাবে অবারিত করা হলেও মুশরিক এবং হিংসুক ব্যক্তি রহমত ও সাধারণ ক্ষমা থেকেও বঞ্চিত থাকে। এ ব্যাপারে নবী করিম (সা.) আরও এরশাদ করেন, শাবানের মধ্যবর্তী রাত তথা শবে বরাতে আল্লাহতায়ালা সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক লোক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫৬৬৫)
মাহে শাবান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি মাস। আর শবেবরাত তথা ১৪ শাবান দিবাগত রাত অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। নবী করিম (সা.) এ রাতটিকে লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান অর্থাৎ শাবানের মধ্যবর্তী রাত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে আমাদের সমাজে এ রাত নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একটি দল এ রাতকে আলোকসজ্জা, আতশবাজি, হালুয়া-রুটির উপলক্ষ বানিয়ে নিয়েছে। অবশ্য এর সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। আর একটি দল উপরোক্ত কর্মকা-ের বিরোধিতা করতে গিয়ে শবেবরাতের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসেছে এবং তারা এ রাতের কোনো বৈশিষ্ট্যই মানে না; বরং এ রাতের সব কিছুকেই বেদাত বলে চালিয়ে দেয়। বাস্তবে এ দলটিও সঠিক অবস্থানে নেই। কারণ শবে বরাতের অনেক ফজিলত ও আমলের ব্যাপারে প্রিয় নবী (সা.) উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন।
নবী করিম (সা.)-এর কাছে শাবান মাসের মর্যাদা এত অধিক যে, যখন তিনি রজব ও শাবান মাসে উপনীত হতেন, তখন এই দুই মাসের বরকত প্রাপ্তি ও রমজানকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্যে আল্লাহর কাছে এই বলে প্রার্থনা করতেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান ওয়া বাল্লিগনা রামাদান’ অর্থাৎ হে আল্লাহ, আপনি রজব ও শাবান মাসে আমাদের বরকত দান করুন এবং আমাদের হায়াতকে রমজান পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেন।
নাসাঈ শরিফের বর্ণনায় এসেছে, নবী করিম (সা.) শাবান মাসের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এ মাস সম্পর্কে লোকেরা গাফেল থাকে। অথচ এ মাসে বান্দার আমল আল্লাহতায়ালার মহান দরবারে পেশ করা হয়। আমার আমল যখন পেশ করা হয়, তখন রোজা অবস্থায় থাকা আমি পছন্দ করি।’ তাই তিনি শাবান মাসজুড়েই রোজা রাখতেন। তিরমিজি শরিফের বর্ণনায় এসেছে, হজরত উম্মে সালমা (রা.) বলেন, আমি নবী করিম (সা.)কে শাবান ও রমজান ছাড়া দুই মাস একাধারে রোজা রাখতে দেখিনি।
রাসূলে করিম (সা.) বরাতের রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে নবী করিম (সা.) উঠে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এত দীর্ঘ সময় ধরে সিজদা করলেন যে, আমার ভয় হলো তিনি হয়ত মারাই গেছেন। এ চিন্তা করে আমি বিছানা ছেড়ে উঠে রাসূল (সা.)-এর বৃদ্ধাঙুলি নাড়া দিই, তাঁর নড়াচড়ার কারণে আমার বিশ্বাস হলো তিনি জীবিত আছেন। তারপর নিজ বিছানায় ফিরে এলাম। এরপর তিনি সিজদা থেকে মাথা উঠালেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে বললেন, হে আয়েশা! তোমার কি ধারণা হয়েছে যে, নবী তোমার সঙ্গে সীমা লঙ্ঘন করেছে?
আমি বলি, জি না, হে রাসূল! তবে আপনার দীর্ঘ সময় ধরে সিজদার কারণে আমার মনে হয়েছে আপনি হয়ত মৃত্যুবরণ করেছেন। এরপর নবী করিম (সা.) বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি জান, আজকের এ রাতটি কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এ বিষয়ে অধিক জ্ঞাত। নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন, এ রাতটি শাবানের মধ্যবর্তী রাত। এ রাতে আল্লাহতায়ালা নিজ বান্দাদের প্রতি বিশেষ করুণা বর্ষণ করেন, অনুগ্রহ প্রার্থীদের দয়া করেন। তবে হিংসুকরা তার দয়া ও অনুগ্রহ প্রাপ্ত হয় না। (বায়হাকি : ৩৮৩৫)
সুতরাং যখন কোনো বিশেষ সময়ের ব্যাপারে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে এরকম রহমত ও মাগফিরাতের আশ্বাস থাকে, তখন সেই সময় নেক আমলের ব্যাপারে যতœবান হয়ে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত পাওয়ার জন্য সচেষ্ট হওয়া উচিত।
নবী করিম (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহপাক শাবানের ১৫ তারিখ রাতে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন। অতঃপর তিনি বনি কালবের মেষের গায়ে যত পশম রয়েছে তার চেয়ে বেশি সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করেন। (তিরমিজি : ৭৩৯)
তাই এ রাতে অতি আবেগতাড়িত হয়ে অতিরঞ্জিত করার যেমনি কোনো সুযোগ নেই, তেমনি কোনো অজুহাতেই এ রাতে গাফেল থাকা বিবেকবান ঈমানদারের কাজ নয়। বরং শবেবরাত ও শবেকদরের মতো নেকের মৌসুমগুলোকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর রেজামন্দি হাসিল করাই মোমিনের একান্ত কর্তব্য।
লেখক : পশ্চিম আফ্রিকার মালি প্রবাসী