আন্তর্জাতিক

শান্তির পথে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া : স্বস্তিতে বিশ্ববাসী

স্বদেশ খবর ডেস্ক
যুদ্ধ বাদ দিয়ে শান্তির পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া। কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধ অবসানের ঘোষণা দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন। দুই কোরিয়া সীমান্তের ‘ডিমিলিটারাইজড জোন’ বা সেনামুক্ত অঞ্চলের গ্রাম পানমুনজমের ‘পিস হাউজ’-এ ২৭ এপ্রিল দুই শীর্ষ নেতা ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হওয়ার পর এই যৌথ ঘোষণা দেন। একইসঙ্গে কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করতে সম্মত হয়েছেন কিম জং উন। তবে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ কোন প্রক্রিয়ায় হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি। তবে দুই নেতার যুদ্ধ অবসানের ঘোষণায় দুই দেশের জনগণ আবারো দুই কোরিয়ার এক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
১৯৫৩ সালের পর কিম জং উন প্রথম উত্তর কোরীয় নেতা হিসেবে দুই দেশের সীমান্তের সেনামুক্ত রেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ায় পা রাখেন। কিম সীমান্তে পৌঁছলে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট তাকে স্বাগত জানান। দুই নেতা সেখানে হাতে হাত মেলান। সে সময় দুই জনকেই বেশ আন্তরিক এবং হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। এরপর সেনামুক্ত এলাকা পানমুনজমের ‘পিস হাউজ’-এ তারা বৈঠকে বসেন।
দুই কোরিয়ার ঐতিহাসিক বৈঠক ও সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু পরীক্ষার এক অগ্নি বছরের পর ঐতিহাসিক বৈঠক হয়েছে। তিনি টুইট করে বলেন, ভালো কিছু হচ্ছে, কিন্তু সেটা সময়ই বলবে! তবে যুক্তরাষ্ট্রের গর্ব বোধ করা উচিত। প্রতিবেশী চীন দুই দেশের রাজনৈতিক প্রত্যয়ের প্রশংসা করেছে।
দক্ষিণ কোরীয় অংশে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে গার্ড অব অনারের পর দুই কোরীয় নেতা বৈঠকে বসেন। সীমান্তবর্তী গ্রাম পানমুনজমের ‘পিস হাউজ’-এ হেঁটে যান দুই নেতা। এটি দুই দেশের মধ্যবর্তী অসামরিক এলাকার একটি সামরিক কমপাউন্ড। এরপর কিম জং উন প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইনকে কিছু সময়ের জন্য উত্তর কোরিয়া সীমান্তে ঢোকার আমন্ত্রণ জানান। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মুন প্রবেশ করেন সেখানে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার সীমান্তে মুনের প্রবেশের বিষয়টি প্রেসিডেন্টের কার্যতালিকায় ছিল না।
বৈঠকের প্রথম পর্ব শেষে দুই নেতা মধ্যাহ্নভোজের জন্য আলাদা হয়ে যান। কিম কালো লিমোজিন গাড়িতে করে ফিরে আসেন উত্তর কোরিয়ার সীমানার মধ্যে। বিকেলে তিনি আবারো যান দক্ষিণ কোরিয়ায়। এরপর দুই নেতা দুই দেশের মাটি ও পানি দিয়ে সীমান্তে একটি পাইন গাছের চারা রোপণ করেন। ‘পানমুনজম ডিক্লারেশন ফর পিস, প্রোসপারিটি অ্যান্ড ইউনিফিকেশন অন দ্য কোরিয়ান পেনিনসুলা’ শীর্ষক যৌথ ঘোষণায় সই করেন কিম জং উন এবং মুন জায়ে-ইন। এরপর দুই নেতা করতালি দেন। তারা একে অপরকে আলিঙ্গন করেন। দিনব্যাপী বৈঠকের মধ্যে দুই নেতা প্রায় আধা ঘণ্টা একান্তে বৈঠক করেন। যৌথ ঘোষণার পর দুই নেতা দক্ষিণ কোরীয় অংশে ভোজসভায় যোগ দেন। বৈঠকে অংশ নিতে কিমের সঙ্গে তার বোন কিম ইয়ো-জংসহ ৯ জন কর্মকর্তা দক্ষিণ কোরিয়ার অংশে যান।
দুই কোরিয়ার যৌথ ঘোষণার বিষয়ে বলা হয়েছে, ১৯৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধ থামাতে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল তা এ বছরই শান্তি চুক্তিতে বদলে দিতে দুই নেতা সম্মত হয়েছেন। দুই নেতা আনুষ্ঠানিকভাবেও বলেন, কোরীয় উপদ্বীপে আর কোনো যুদ্ধ হবে না। ১৯৫০ সালে দুই কোরিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে যখন উত্তর কোরিয়ার সেনারা দক্ষিণে আগ্রাসন শুরু করে। ৩ বছর পর ১৯৫৩ সালে যুদ্ধ বন্ধ হয় একটি যুদ্ধ-বিরতি চুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দুই কোরিয়ার মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি হয়নি। যে কারণে দুই কোরিয়া এখনো যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে বলা চলে।
যৌথ ঘোষণায় পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্য কিভাবে অর্জিত হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। অনেক বিশ্লেষক এখনো এ ব্যাপারে উত্তর কোরিয়ার আগ্রহ নিয়ে সন্দিহান। কারণ অতীতে এ ধরনের চুক্তিতে পরমাণু কার্যক্রম বন্ধ ও বৈরিতা নিরসনের অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে উত্তর কোরিয়া পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালালে চুক্তি ভেস্তে যায়। দুই দেশের মধ্যে শত্রুতাপূর্ণ কর্মকা- বন্ধে সম্মত হয়েছেন দুই দেশের নেতা। সেনামুক্ত অঞ্চল যা কি না দুই কোরিয়াকে বিভক্ত করেছে তাকে শান্তি অঞ্চল-এ পরিণত করতে সম্মত হয়েছেন তারা। সামরিক উত্তেজনা কমাতে অস্ত্র সীমিতকরণে সম্মতি দিয়েছেন কিম এবং মুন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে নিয়ে চার দেশীয় আলোচনায় যুক্ত হতে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন তারা। যুদ্ধের কারণে বিচ্ছিন্ন পরিবারের সদস্যদের পুনঃএকত্রীকরণ, সীমান্তজুড়ে রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং খেলাধুলার ক্ষেত্রে আবারো যৌথ অংশগ্রহণের বিষয়ে তারা সম্মত হয়েছেন। এসব লক্ষ্য অর্জনে দুই দেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা ও সহযোগিতা নিতে সম্মত হয়েছেন।
আলাদাভাবে দেয়া বক্তব্যে দুই নেতা কোরীয় উপদ্বীপের জন্য নতুন যুগের সূচনা করার ঘোষণা দেন। গণমাধ্যমের সামনে কিম উন বলেন, ‘দুই কোরিয়া এক দেশে পুনর্মিলিত হবে। আমরা আবারো এক হতে চলেছি। কারণ আমাদের রয়েছে অভিন্ন ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতি। আমাদের একই রক্ত। আমরা যখন নতুন এক ভবিষ্যৎ অর্জন করবো তখন আমরা খুশি মনেই অতীতের দিকে তাকাবো।’ তিনি বলেন, এই অঞ্চলে দুর্ভাগ্যজনক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন আর না হয় তা নিশ্চিত করতে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। সামনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, দুর্ভোগ এবং হতাশা থাকতে পারে, কিন্তু কষ্ট ছাড়া কোনো বিজয় অর্জিত হয় না।
এক দশকের বেশি সময় পর দুই কোরিয়ার শীর্ষ নেতাদের মধ্যে এই বৈঠক হয়েছে। কোরীয় উপদ্বীপে সম্ভাব্য শান্তি প্রতিষ্ঠায় এটিকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পানমুনজমের পিস হাউজে বৈঠকের আগে কিম জং উন বলেন, দুই কোরিয়ার সম্মেলন সম্পর্ক, সমৃদ্ধি এবং শান্তির ক্ষেত্রে নতুন ইতিহাস তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রসঙ্গত, দুই কোরিয়ার এই সম্মেলন এবং জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে আলোচনা সামনে রেখে কিম জং উন ইতোমধ্যে পারমাণবিক এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। কিমের এই ঘোষণা স্বস্তি দিয়েছে বিশ্ববাসীকে। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ নেতাদের এই বৈঠককে শান্তির পথে অগ্রগতি বলছেন বিশ্ববাসী।