প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক মহড়ার সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় সৌদি সামরিক মহড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ইসলামি সামরিক জোট কেন্দ্রের সামরিক মহড়াতে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৬ এপ্রিল সৌদি আরব সফর করেন। সৌদি আরবের বাদশাহ ও দুই পবিত্র মসজিদের হেফাজতকারী সালমান বিন আবদুল আজিজ আল-সৌদের আমন্ত্রণে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন এক বিশাল যৌথ সামরিক মহড়ার সমাপনী কুচকাওয়াজে যোগ দেন শেখ হাসিনা। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ আল-জুবাইলে ‘গালফ শিল্ড-১’ শীর্ষক এই কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। কুচকাওয়াজে বাংলাদেশসহ ২৪টি দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও শান্তি রক্ষায় বন্ধু দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সমন্বয় ও সহযোগিতায় সৌদি আরব মাসব্যাপী এ সামরিক মহড়ার আয়োজন করে।
বাদশা সালমান বিন আবদুল আজিজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বন্ধু দেশগুলোর বেশ কয়েকজন নেতাকে নিয়ে মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত এই সামরিক মহড়ার সমাপনী অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় সৌদি সামরিক মহড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সামরিক মহড়ার মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ আল সুবাইয়ে জানান, ২৪টি দেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর অংশগ্রহণে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই মহড়ার আয়োজন করেছে। এই মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাংলাদেশ, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, মিসর, জর্ডান, সুদান, মৌরিতানিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, শাদ, জিবুতি, নাইজার, কমরোস, আফগানিস্তান, ওমান, গায়ানা, তুরস্ক ও বুরকিনা ফাসো যোগ দিয়েছে। গত ১৮ মার্চ এই মহড়া শুরু হয়। মহড়ায় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ১৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। আবদুল্লাহ আল সুবাইয়ে আরো জানান, প্রচলিত ও অপ্রচলিত এই দুই ধরনের সামরিক অভিযান নিয়ে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় হুমকি সৃষ্টি করতে পারে এমন বৈরী কর্মকা- প্রতিরোধে যৌথ সামরিক যুদ্ধাভিযান পরিকল্পনার ধারণা কার্যকর করা হচ্ছে এই মহড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
সামরিক বিশ্লেষকরা অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা ও এতে ব্যবহৃত অস্ত্রের গুণগত মানের নিরিখে এটিকে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বৃহত্তম সামরিক মহড়া হিসেবে গণ্য করছেন।
উল্লেখ্য, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী লড়াইয়ে ৩৪টি মুসলিম প্রধান দেশ নিয়ে ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে নতুন একটি সামরিক জোট গঠনের ঘোষণা দেয় সৌদি আরব। সৌদি বাদশাহর আহ্বানে তখন ওই জোটে যোগ দেয় বাংলাদেশ। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ বাংলাদেশসহ আরো ৩৩টি দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ‘ইসলামি সামরিক জোট কেন্দ্র’ গঠন করেন। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে এই সামরিক জোট কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির প্রেক্ষিতে সৌদি বাদশাহ সালমানের অনুরোধে বাংলাদেশ এই সামরিক জোট কেন্দ্রে অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশের সঙ্গে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে জানানো হয়, ইসলামি সামরিক জোট কেন্দ্রের ভূমিকা হবে সমন্বিত প্রচেষ্টা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা প্রদান করা। জঙ্গিবাদ মতাদর্শ দমনে সহযোগিতার মধ্যে থাকবে সরঞ্জাম ও তথ্য-উপাত্ত আদান-প্রদান। এই জোট ইরাক, সিরিয়া, মিসর আর আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। এখন ইসলামিক দেশগুলো জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে লড়ছে। কিন্তু এই জোটের মাধ্যমে দেশগুলো একত্রে, একসঙ্গে লড়াই করবে।
এই জোটে যোগদানের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সেসময় বলেছিলেন, ‘সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে এই জোটে যোগ দিতে অনুরোধ করেছিলেন। এই অনুরোধের প্রেক্ষিতে সামরিক জোটে যোগদানে বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছে। এটি একটি নতুন ধরনের পদক্ষেপ। আমরা সৌদি আরবকে জানিয়ে দিই এই জোটের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হলে বাংলাদেশ খুশিই হবে। শাহরিয়ার বলেন, এই জোটের উদ্দেশ্য আইএস’র মতো সংগঠনের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান নয় বরং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তথ্য ও অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান। সাধারণত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা রয়েছে। এ কারণে অনেক সময় সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। এই জোট এখন এই কাজটি আরো সমন্বিত ও কার্যকরভাবে করবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, এই সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার ফলে সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক অতীতের তুলনায় অনেক দৃঢ় ও মজবুত হয়েছে; যা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশ ছাড়া বাকি দেশগুলো হলোÑ বাহরাইন, বেনিন, শাদ, কোমোরোস, আইভরি কোস্ট, জিবুতি, মিসর, গ্যাবন, গায়েনা, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মালি, মরক্কো, মৌরিতানিয়া, নাইজার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, কাতার, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, সুদান, টোগো, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, আরব আমিরাত এবং ইয়েমেন।