ফিচার

স্বাস্থ্যসেবায় দেশ-বিদেশে অনন্য নজির গড়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবাকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ‘২৬ এপ্রিল’ তারিখটি এবং ‘গিমাডাঙ্গা’ গ্রামটির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০০০ সালের ২৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের গিমাডাঙ্গা গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক উদ্বোধনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক সেবা কার্যক্রমের সূচনা করেন। স্বাস্থ্য বিভাগ ২০০৯ সাল থেকে ২৬ এপ্রিলকে ‘কমিউনিটি ক্লিনিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। একই সঙ্গে তৃণমূলের মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করে কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য একটি স্লোগানও ঘোষণা করে স্বাস্থ্য বিভাগ। স্লোগানটি হলো ‘শেখ হাসিনার অবদান কমিউনিটি ক্লিনিক বাঁচায় প্রাণ’। কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত। বিশ্বের অনেক দেশ কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রমকে রোল মডেল হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে নিজ দেশে তা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে প্রতি ৬ হাজার জনের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়। সে হিসাবে বর্তমানে সারাদেশে ১৩ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। গত ৯ বছরে (২০০৯-১৭) সারাদেশে প্রায় ৬৫ কোটির বেশি নারী, পুরুষ ও শিশু কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন ও চিকিৎসা সেবা নিয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন একটি কমিউনিটি ক্লিনিকে গড়ে ৩৮ সেবাগ্রহীতা যাচ্ছেন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি অনেক কমিউনিটি ক্লিনিকে গর্ভবতী মায়েদের স্বাভাবিক ডেলিভারি হচ্ছে। ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল, মাঝখানে ৫ বছর বাদ দিয়ে ১২ বছরে বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলে এখন কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা ১৩ হাজার ৮৬১টি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত পল্লী অঞ্চলের আপামর জনসাধারণের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের কাজ শুরু করে। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে ১০ হাজার ৭২৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ সম্পন্ন হয় এবং ৮ হাজারটি ক্লিনিক চালু হয়। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দেয়। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় ক্ষমতায় এসে বন্ধ হয়ে যাওয়া কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো আবার চালুর উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি ২০১১ হতে আগস্ট ২০১৭ পর্যন্ত আরো ৩ হাজার ১৩৮টি নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়। সব মিলে এ পর্যন্ত মোট ১৩ হাজার ৮৬১টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হয়েছে। প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ৩০ ধরনের জরুরি ওষুধ বিনামূল্যে দেয়া হয়। একেকটি ক্লিনিকের জন্য বছরে ওষুধের বাজেট প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের জন্য স্থানীয় জনগণ প্রতিটির জন্য ৫ শতক হারে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০০ একরের বেশি জমি দান করেছেন। এখন পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহে ১৩ হাজার ৭৮৪ জন হেলথকেয়ার প্রোভাইডার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যে সারাদেশে ১৭ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ সংক্রান্ত সরকারের ভিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। দেশজুড়ে কমিউনিটি ক্লিনিকের বিশাল এই নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নের অন্যতম কারিগর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ মোহী, পিএসসি সাপ্তাহিক ‘স্বদেশ খবর’কে জানালেন কিভাবে সম্ভব হয়েছে এই অগ্রযাত্রা। এম এ মোহীর মতে, কমিউনিটি ক্লিনিক বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার চিত্র পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। তৃণমূলের মানুষ সহজেই এই ক্লিনিকের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন। আধুনিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিশ্চিত হওয়ায় কমেছে মা ও নবজাতকের মৃত্যুহার। সারাদেশে স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত অবকাঠামো-স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি পল্লী অঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের দায়িত্বও পালন করছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ মোহী কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সুস্পষ্ট। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার প্রচেষ্টা আমাদের। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ মোহী বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পের স্থাপনা নির্মাণের দায়িত্ব পড়ে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ওপর। এই প্রতিষ্ঠানটি সারাদেশে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অর্থাৎ স্বাস্থ্যখাতে সরকারের ভিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নির্ধারিত সময়ে যথাযথ মান বজায় রেখে স্বাস্থ্য অবকাঠামো তথা স্থাপনার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করছে। যথাসময়ে দেশের পল্লী অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে নেপথ্যে থেকে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। ফলে নতুন যে ৩ হাজার ১৩৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলোর গঠনশৈলী হয়েছে মজবুত ও কার্যকর।’ এক প্রশ্নের জবাবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ মোহী বলেন, ‘সরকার প্রধান শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং অব্যাহত সমর্থন ও সহযোগিতার কারণে কমিউনিটি ক্লিনিকের নির্মাণ ও সংস্কার কাজ পরিচালনা করা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের জন্য অনেক সহজ হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এ ধরনের কর্মকা- পরিচালনা করা আদৌ সম্ভব হতো না।’