কলাম

আমরা কেমন শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি?

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান
১৯৭১ সালে মহান মুুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রথম যে কথাটি বলেন সেটা হচ্ছে ‘আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা হবে একমুখী, উদার এবং উচ্চ মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ হওয়ার জন্য একটা শিক্ষা ব্যবস্থা; সেই শিক্ষা ব্যবস্থা হতে হবে বিজ্ঞানমনস্ক যার অর্থ মানুষ যেন কুসংস্কার, অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ থেকে বেরিয়ে এসে একটা মুক্ত পরিবেশ পায় এবং মুক্তভাবে চিন্তা করার সুযোগ পায়।’ সে জন্যই বঙ্গবন্ধু দেশের প্রথিতযশা বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদাকে দিয়ে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এর মূল উদ্দেশ ছিল একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা; সকলেই এক রকম শিক্ষা গ্রহণ করবে। এর মধ্য দিয়ে যেন কোনো শ্রেণি বৈষম্য তৈরি না হয়, ভেদাভেদ সৃষ্টি না হয়। মানুষে মানুষে যে হিংসা বিদ্বেষ, পরস্পরের প্রতি যে ঘৃণা এগুলো যাতে কোনোভাবে সৃষ্টি না হয় সেই জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা একমুখী করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। আমি মনে করি যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা এমন হওয়া উচিত যেখানে আমাদের মনুষ্যত্ব, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব এবং পরস্পরে মিলেমিশে এগিয়ে যাওয়ার যে স্বপ্নটা বঙ্গবন্ধু দেখতেন, সেটা যেন এই শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয়। আমি সে রকম একটা শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও কল্পনা করি বা এখন এটার জন্য কাজ করি।
তবে বর্তমানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে অনেকটাই হতাশ হতে হয়। বঙ্গবন্ধুর সেই আরদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি। কারণ এখন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে চরমভাবে বিভাজন, অন্তত ৮-১০ রকমের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের দেশে চালু আছেÑ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা, ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থা, সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা, আবার ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কয়েকভাগ, সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও ইংলিশ মিডিয়াম, বাংলা মিডিয়াম, ইংলিশ ভার্সন আর মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যেতো বিভাজনের অভাব নেই বহু রকমের মাদ্রাসা যেমন কওমি মাদ্রাসা, নূরানী মাদ্রাসা, হাফেজি মাদ্রাসা, মহিলা মাদ্রাসা, ক্যাডেট মাদ্রাসা, ইংলিশ মিডিয়াম মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা বিভিন্ন ত্বরিকার মাদ্রাসা। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন চরমভাবে বিভাজিত। অর্থাৎ যেখানে একটা শিক্ষা ব্যবস্থা জাতিকে একত্রিত করবে মনে ধ্যানে, চিন্তা-চেতনায়, যেখানে সবাইকে একদিকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তার পরিবর্তে আমরা এখন এই শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে একটা বিভাজিত জাতিতে পরিণত হয়েছি এবং সকল ব্যাপারে দেখা যায় আমরা সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী মত পোষণ করি। এটা বিভাজিত বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার ফল। আমি আশা করব যে আমাদের এই শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে যে বিভ্রান্তি রয়েছে; বাঙালির চিন্তাচেতনাগুলোকে বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য অন্তত প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যন্ত আমরা সবাই একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করব। যেমন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বাংলা ভাষা, আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষা, গণিত, সমাজ এবং বিজ্ঞান; এই মৌলিক যে বিষয়গুলো আছে সেগুলো আমরা সবাইকে একই রকম শিক্ষা দেব। আর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের বিষয়ভিত্তিক বিভাজন হতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রাথমিক পর্যায় থেকে আরম্ভ করে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সবার জন্য একইরকম শিক্ষা ব্যবস্থা হওয়া দরকার বলে আমি মনে করি।
সবার জন্য উচ্চশিক্ষা অত্যাবশ্যকীয় নয়, সবার জন্য উচ্চশিক্ষা কাম্যও নয়। যেটা দরকার, বর্তমানে আমাদের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি হচ্ছে কর্মক্ষম যুবশক্তি, এটাকে বলা হয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। এই সুযোগটা যদি আমরা গ্রহণ করতে চাই তাহলে আমাদের জনসংখ্যার তরুণ অংশকে দক্ষ শ্রমশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। কেবল ডিগ্রি অর্জনের জন্য উচ্চশিক্ষা নয়। সাধারণ শিক্ষায় যারা উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে, স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা বিএ ও এমএ পাস করছে তাদের এই শিক্ষা সমাজের বড় ধরনের কোনো কাজে আসছে এমনতো নয়। অনেককে দেখা যায় বিএ ও এমএ পাস করার পর এমন কাজ করছে যার জন্য বিএ, এমএ পাস করার প্রয়োজন ছিল না, এটার জন্য মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পাস হলেই চলত। সেজন্য আমাদের কিন্তু সম্পদের অপচয় হচ্ছে। যেটা আমাদের খুব বেশি করে দরকার সেটা হচ্ছে কারিগরি শিক্ষা এবং ভোকেশনাল ট্র্রেনিং। আমাদের শিল্প, কারখানা, ইন্ডাস্ট্রিতে, পরিবহনে, বিভিন্ন বিনিয়োগ সেক্টরে যেখানে যেখানে আমাদের উৎপাদনশীল কাজগুলো হচ্ছে, সেখানে এখনও দক্ষতা অর্জন করতে পারিনি, প্রোডাক্টিভিটির দিক থেকে আমরা (যদি গার্মেন্টস-এর কথাও বলি) ভিয়েতনাম বা আমাদের পার্শ্ববর্তী ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া এমনকি শ্রীলংকায়ও একজন শ্রমিকের যে পরিমাণ প্রোডাক্টিভিটি, আমাদের শ্রমিকের প্রোডাক্টিভিটির পরিমাণ তার তুলনায় অনেক কম। যার কারণে দেখা যাচ্ছে আমাদের শ্রমিক সংখ্যায় বেশি, কিন্তু অর্থনীতিতে তাদের অবদান নিয়োজিত শ্রমিক সংখ্যার বিচারে অন্যান্য দেশ থেকে অনেক কম।
আরেকটা দিক হচ্ছে বিদেশে আমরা প্রচুর পরিমাণে লোক পাঠাচ্ছি। কোটির অধিক লোক বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গিয়েছে। যেহেতু তারা দক্ষ জনশক্তি নয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা অদক্ষ শ্রমিকের কাজগুলো করে; যেখানে ফিলিপাইন মাত্র ১৫ লক্ষ লোক বছরে ৩৭ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, আমাদের ১ কোটি ১৫ লক্ষ লোক মাত্র ১৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয় করে। বিদেশে যাওয়ার আগে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সাধারণ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এগুলোর কোনো দাম নেই বিদেশে, মূলত এজন্যই কারিগরি শিক্ষাটা প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক করা উচিত। অর্থাৎ হাতে কলমে কাজ করার ওপর অবশ্যই জোর দিতে হবে। আমরা খুব সহজে এটা করতে পারি, যেমন আমরা মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথা বলি। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ট্র্যাডিশনালি চলে আসছে আজ থেকে ২০০-৩০০ বছর পূর্ব থেকে, চাইলেই রাতারাতি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বিলুপ্ত করতে পারব না এবং সেটা করার প্রয়োজনও নেই। মাদ্রাসা শিক্ষার একটা সুবিধা হচ্ছে অবকাঠামো ভালোভাবে আছে। মাদ্রাসাগুলো যেহেতু দান-খয়রাত এবং বিভিন্ন রকমের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে তৈরি হয় সেহেতু ভবনের দিক থেকে হোক, জমিনের পরিমাণের দিক থেকে বেশিরভাগ মাদ্রাসা সুপ্রতিষ্ঠিত, এই অর্থে এগুলোর অবকাঠামো আছে, ভবন আছে। মাদ্রাসা শিক্ষায় যারা আছে তাদেরকেও তো খেতে হয়; পরকালে হয়ত অনেক বেশি সুযোগ পাবে, তারা বেহেশতেও যাবে হয়ত, কিন্তু দুনিয়াতে তো তাদের খেয়ে-পরে ভালোভাবে বসবাস করতে হবে। সেইজন্যই আমি মনে করি আমাদের মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে যারা যারা আগ্রহী হবে, সেগুলোকে কারিগরি মাদ্রাসায় রূপান্তর করা যেতে পারে। আমাদের দেশে ইসলামি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে গাজীপুরে, কিন্তু কারিগরি মাদ্রাসা নেই। কারিগরি মাদ্রাসায়ও হাদিস-কোরআন যাই পড়ানো হচ্ছে সবই পড়ানো হবে। যে মাদ্রাসাগুলো কারিগরি মাদ্রাসারূপে আত্মপ্রকাশ করতে আগ্রহী তাদেরকে হাদিস, কোরআন পড়ানোর পাশাপাশি ২-১টা ভোকেশনাল কোর্স করানো হলে তারা আরবি শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি জ্ঞানে দক্ষ হয়ে উঠবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে তারা সম্পূর্ণরূপে দক্ষতার সঙ্গে কর্মের উপযোগী হয়ে উঠবে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের ভাষা হচ্ছে আরবি। আর মাদ্রাসার ছাত্ররা যাতে আরবি ভাষায় কথা বলতে পারে সেজন্যও তাদের আলাদাভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কারণ হাদিস-কোরআন পড়া এক জিনিস আর আরবিতে দৈনন্দিন জীবনের কথাবার্তাগুলো বলতে পারা আরেক জিনিস। কর্ম এবং ভাষা এই দুইয়ের সমন্বয়ে মধ্যপাচ্যে যে লক্ষ লক্ষ দক্ষ শ্রমিক প্রয়োজন হয় সেখানে তারা অধিকতর সুযোগ পাবে।

২.
প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে আমাদের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন কতটুকু? আমি বলবো আমাদের উচ্চশিক্ষার অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। কারণ আমাদের যে সমস্যা রয়েছে এগুলো আমাদেরই সমাধান করতে হবে। সমাধান করতে গেলে আমাদের গবেষণা করতে হবে। আমাদের কৃষি, শিল্পের উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমাদের মানবিক সম্পর্কের জায়গাগুলোতে উৎকর্ষ সাধন করতে হবে, সেইজন্য উচ্চশিক্ষায়ও আমাদের অংশগ্রহণ করতে হবে। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় আমাদের ভাষা বিষয়ক একটা বিরাট সমস্যা রয়ে গেছে। কারণ আমাদের উচ্চশিক্ষার পাঠ্যবইগুলো এখনও আমরা বাংলায় করতে পারিনি, এগুলোর বেশিরভাগই এখনও ইংরেজিতে রয়েছে। আর সেই ইংরেজি বইগুলো পড়ানোর জন্য ইংরেজিতে যে ভাষাজ্ঞান থাকার প্রয়োজন রয়েছে তা যথেষ্ট নয়, প্রসঙ্গত আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ভর্তি করাই তখন দেখা যায় যে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে আসে না, যতটুকু প্রয়োজন তা থাকে না। বাংলা ভাষায় বইয়ের পরিমাণেও সংকট রয়েছে। আবার একসাথে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কারণে শিক্ষকের সংকট রয়েছে। আমাদের বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কম থাকার কারণে; যেখানে বাজেটের ২০-২৫ শতাংশ খরচ করা দরকার শিক্ষাখাতে সেখানে এখনও ১০ শতাংশের ওপরে বরাদ্দ দেয়া যাচ্ছে না। বাজেটের স্বল্পতার কারণে গবেষণা করার জন্য প্রয়োজনীয় যেসব ল্যাবরেটরি দরকার তাও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। এই কারণে আমাদের উচ্চশিক্ষার পরিমাণগত দিক আপাতত আর বাড়ানোর দরকার নেই বলে আমি মনে করি। এটা এখন যে পর্যায়ে আছে, এখানেই সীমিত করা উচিত। উচ্চশিক্ষাটা যারা অত্যন্ত মেধাবী, গবেষণা করবে তাদের মধ্যে সীমিত করা উচিত। শিক্ষক স্বল্পতা এটা আরেকটা সংকট। একইসঙ্গে আমি বলব শিক্ষক সংকটের সঙ্গে সঙ্গে ভালো শিক্ষকের অভাব দেখা দিয়েছে। ভালো শিক্ষক এই অর্থে আমি বলব শিক্ষাকে ধ্যান, জ্ঞান, শিক্ষাকে একটা প্রফেশনাল হিসেবে নেয়া শিক্ষকের সংখ্যা কম। কারণ অনেকেই আছেন যে অন্য কোনো চাকরি না পেয়ে এই প্রফেশনে এসেছেন। একসময় এই শিক্ষকতা পেশাটা মোটেও আকর্ষণীয় ছিল না; কারণ বেতন কম ছিল আর সুযোগ-সুবিধাও কম ছিল। মেধাবীদের এ পেশায় আকর্ষণ করা যাচ্ছিল না। তারপরও যারা নিবেদিত, মানুষের সেবা করতে চায়, এই শিক্ষকতায় পছন্দ করে আসত, বেতন যাই পেত তা নিয়েই তারা সন্তুষ্ট থাকত। এক সময় আমরাই আন্দোলন করেছি শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় করতে হবে, এ পেশায় মেধাবীদের নিয়ে আসতে হবে। এখন দেখা যাচ্ছে যে এটাকে আকর্ষণীয় করতে গিয়ে লোভনীয় করে ফেলেছি। মেধাবীদের আকর্ষণ করতে গিয়ে এই প্রফেশনে মেধাবীদের সঙ্গে সঙ্গে লোভী লোক চলে এসেছে। আর লোভী লোক আসার কারণে দেখা যাচ্ছে প্রশ্ন বিক্রি থেকে আরম্ভ করে, সারাদিন কোচিং-টিউশনি, স্কুলে না পড়িয়ে এগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অতএব আমাদের এই শিক্ষকদের ভূমিকাটা যেটা আছে, এটার মধ্যে একটা পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষকরা হবে মানুষ গড়ার কারিগর এবং শিক্ষকরা যারা এই পেশায় এসেছেন তারা পছন্দ করেই এসেছেন, সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদের জীবনকে গড়ে দেয়ার জন্য সারাক্ষণ তাকে নিবেদিত হতে হবে। অন্য দিকে নিজের জীবন গড়ার জন্য প্রশ্ন্ বিক্রি কিংবা কোচিং এইসব কাজের সাথে সম্পৃক্ততা কখনই একজন শিক্ষকের জন্য কাম্য নয়। এজন্য শিক্ষক নিয়োগের সময় মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের পেশার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিটি জেনেই নিয়োগ দিতে হবে।

৩.
আমাদের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতির ভুল-ত্রুটি নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। তাই আমি মনে করি আমাদের যে পরীক্ষা পদ্ধতি এটার মধ্যে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন শুরু হয়েছে, ইতোমধ্যে সরকার ওই দিকেই যাচ্ছে। এমসিকিউ সিস্টেম বাতিল হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। কারণ প্রাইমারি স্কুল পর্যায়ে আর এটা থাকছে না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমসিকিউ পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কারণ একটা ছাত্র যেটা পড়ল সতিই সত্যিই সেটা হৃদয়ে ধারণ করল কি না, প্রায়োগিকভাবে কাজে সেটা ব্যবহার করতে পারবে কি না এই পরীক্ষা পদ্ধতিতে এটা স্পষ্ট নয়।
এজন্যই আমাদের বাস্তবধর্মী পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করার মাধ্যমে, কেবল মুখস্থ করে লিখে অতিরিক্ত নাম্বার পাওয়ার যে পরীক্ষা পদ্ধতি এটার মধ্যে একটা পরিবর্তন আমাদের আনতে হবে। আবার কোনো অবস্থায় সৃজনশীল পদ্ধতি থেকে পিছিয়ে যাওয়া যাবে না। সৃজনশীলতার সমস্যা হচ্ছে যারা এখন অভিভাবক তারা সৃজনশীল পদ্ধতিতে পড়েননি, যার কারণে বাচ্চাদের তারা পড়াতে পারছেন না, না পড়াতে পারার কারণে সারাক্ষণ কোচিং সেন্টার, টিউশনে নিয়ে যাচ্ছেন। তাই বলে এই পদ্ধতি আবার বাতিল করা যাবে না। কারণ বর্তমানে যারা এখন সৃজনশীল পদ্ধতিতে পড়াশুনা করছে তারা এক সময়ে অভিভাবক হবে, যখন তাদের বাচ্চাদের পড়াতে পারবে তখন তাদের এই পদ্ধতি নিয়ে কোনো সমস্যাই থাকবে না। আর এই পদ্ধতিটা বর্তমান সরকারের অনেক বড় একটা উদ্যোগ, এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একদিন সফলতা ভোগ করবে। সৃজনশীল পদ্ধতির মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের ভিতর নতুন কিছু সৃষ্টি শক্তির মোহ তৈরি হবে।

৪.
উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন ও গবেষণাকর্ম ও এর পরিধি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে আমি মনে করি উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে উদ্ভাবন এবং গবেষণায় অধিক পরিমাণে গুরুত্বারোপ করতে হবে। আমাদের যারা মাস্টার্স লেভেলে পড়াশুনা করছে অর্থাৎ যারা স্নাতক পর্যায়ে সফলতার সঙ্গে পাস করে মাস্টার্সে পড়ে তাদের অবশ্যই বিভিন্ন ধরনের গবেষণা এবং উদ্ভাবনী শক্তির স্বাক্ষর রাখতে হবে। অন্যান্যরাও তাদের দেখে উদ্বুদ্ধ হবে, লাভবান হবে। এই ধরনের কাজে সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ গবেষণা ও উদ্ভাবনী কর্মের জন্য সরকারকে আলাদা করে স্বীকৃতি ও প্রণোদনা দিতে হবে। কারণ দেখা যায় যে একজন লোক যদি একটা গবেষণা শুরু করে তখন তার ল্যাবের অসুবিধা, আনুষঙ্গিক যন্ত্র-যন্ত্রাংশ, কেমিক্যাল এবং গবেষণাসামগ্রী কিনতে যে অর্থ লাগে নিজ উদ্যোগে সম্পূর্ণ জোগান দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না। এখন অবশ্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, ইউজিসি থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন সংস্থা গবেষণার জন্য বরাদ্দ দিয়ে থাকে। অতীতের তুলনায় বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত হয়নি। বর্তমানে আমার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রকল্প প্রচুর পরিমাণে বেড়েছে, প্রায় ১৫০টির মতো গবেষণা প্রকল্পে ছাত্র-শিক্ষক সংশ্লিষ্ট রয়েছেন।

৫.
শিক্ষার মানোন্নয়নে আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় স্টেক হোল্ডারদের দায়িত্ব ও ভূমিকা সংক্রান্ত বিষয়েও কিছুটা সংস্কার আনতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার স্টেক হোল্ডার হচ্ছে সরকার বা সরকারি সংস্থা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি; আরেক পক্ষ হচ্ছে যারা নিয়োগ দিয়ে থাকে, রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যারা কর্মসংস্থান করে দেয় আমাদের ছাত্রছাত্রীদের। এ জায়গাগুলোতেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ১৩৫টির মতো। ছাত্রছাত্রীদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়ার উপকরণ এবং গবেষণাগার পর্যাপ্ত পরিমাণ সুযোগ প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। সেই জন্য যারা নিয়োগ দিয়ে থাকেন, অর্থাৎ স্টেক হোল্ডার যেমন ব্যবসায়ী, ব্যাংক মালিক, শিল্পপতি, ইন্স্যুরেন্স বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান, তাদেরকে আমাদের ছাত্রদেরকে (স্নাতকোত্তর কিংবা স্নাতক শেষ পর্যায়) ফিল্ড এক্সপেরিয়েন্স বা বাস্তব অভিজ্ঞতা নেয়ার জন্য ইন্টার্নশিপের সুযোগ করে দিতে হবে। আর আমাদের দেশের প্রচুর ছাত্রছাত্রী রয়েছে যারা মেধাবী। উচ্চশিক্ষার জন্য সুযোগ পায় কিন্তু আর্থিক অনটনের জন্য অনেক সময় ভালোভাবে পড়াশুনা করতে পারে না; টিউশনি করে চলে অথবা খুব অর্থকষ্টে থাকে। এ ধরনের ছাত্রছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত স্কলারশিপের ব্যবস্থা করতে হবে। আর একইসঙ্গে দেশে যেসব সরকারি সংস্থা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোতে তাদের জন্য খ-কালীন চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, যে লেভেলেরই শিক্ষিত হোক, স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর পাস করুক না কেন সবার জন্য সরকারের পক্ষে চাকরি দেয়া সম্ভব নয়। আর সবাই চাকরি পাবেও না। সেজন্য সবাইকে বিভিন্ন কাজে নামাতে হবে। এই কাজটা হয়ত বা তার পড়াশুনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নাও হতে পারে। হয়ত গাড়ি চালনা থেকে আরম্ভ করে রেস্টুরেন্ট চালনা, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৃষি ফার্ম , মুরগি ফার্ম, মৎস্য চাষ ইত্যাদি কর্মে আমাদের শিক্ষিত সন্তানদের এগিয়ে আসতে হবে। এই কাজগুলো বর্তমানে যারা করে থাকেন তারা বেশিরভাগই স্বল্পশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত, এই কারণে তাদের প্রোডাক্টিভিটি অনেক কম, এ সকল ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষিত ছেলেরা এগিয়ে এলে তাদের জন্য কৃষিতে, ছোট ব্যবসায়, সেবা খাতসহ এই ধরনের অসংখ্য পেশা রয়েছে। পেশাগুলো অনেক লাভজনক হবে। এভাবেই তারা আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে এবং উদ্যোক্তা হয়ে অনেকের কর্মসংস্থানের জোগান দিতে পারবে, যার মাধ্যমে বেকার সমস্যা লাঘব হবে। আর আমাদের এভাবেই এগিয়ে যেতে হবে। কারণ প্রতি বছর প্রায় দশ লক্ষাধিক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ছাত্রছাত্রী পাস করে বের হয়। এই বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর কর্মসংস্থান করে দেয়া সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমি বলতে চাই আমাদেরকে অফিসে নয় বিভিন্ন কাজে যেতে হবে; আর সব কাজকেই আমরা যদি কাজ হিসেবে গ্রহণ করি তাহলে বেকার সমস্যা দূর হবে। এজন্য সকল পেশার সম্মান একইরকম হতে হবে এবং এর জন্য আমাদের সকলের মানসিকতার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়