সাহিত্য

ইবনে সালেহ মুনতাসিরের কবিতার বিষয় বৈচিত্র্য

জ্যোৎস্না তঞ্চঙ্গ্যা
ইবনে সালেহ মুনতাসিরের কবিতার বিষয় বৈচিত্র্য এক কথায় বলা যায় বহুব্যাপ্ত। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন। তিনি দেশ, কাল, সমাজ, অর্থনীতি সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রয়োগ করেছেন কবিতার চরণে চরণে। তার লেখনীতে আবেগ আছে, অনুভূতির অবারিত প্রকাশ রয়েছে, আবার তা মননশীলতায় ঋদ্ধ। তিনি বহুমুখী প্রতিভাধর ব্যক্তি হিসেবে কখনো কখনো মানব সভ্যতার ইতিহাসকে ছন্দবদ্ধ রচনায় তুলে ধরেছেন। তিনি শেষ পর্যন্ত এদেশের মৃত্তিকা সংলগ্ন পাঠকের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছেন সাবলীল ও মুখের ভাষা প্রয়োগ করে। কবিতা কেবল বোদ্ধা পাঠকের জন্য নয়, তা সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছাবে বলে কবি নিজেই প্রত্যাশা করেন। এজন্য তার শ্রম ও নিষ্ঠা চলে অবিরত। ইবনে সালেহ মুনতাসির সেই প্রচেষ্টা চালিয়েছেন কবিতার ব্যাপ্ত বিষয়ের পরিসরে।
ধর্মীয় অনুষঙ্গ : কবি ইবনে সালেহ মুনতাসির ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। মানুষের মঙ্গল কামনা করেন সর্বদা। কারণ তিনি একজন আধুনিক মানুষ। তিনি অসাম্প্রদায়িকও। তবে কবির বিশ^াস, ‘ঈমান আকিদা ছাড়া হয় না সুন্দর জীবন’। তবে তিনি নিজেই বাস্তব জীবনের প্রসঙ্গ টেনে সেই চেতনাকে প্রসারিত করেছেন এভাবেÑ ‘জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রজ্ঞায় রয়েছে আকিদা আর ঈমানি।’ এজন্যই তিনি লিখেছেন ধর্ম ও ধর্ম বিশ^াসের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে একাধিক কবিতা।
‘শব-ই-মিরাজ’ কবিতায় তিনি নবীজীর সাত আসমান দর্শনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। ‘পবিত্র আশুরা’ কবিতায় মহররমের ত্যাগের বাণী জীবনকে কতটা সুন্দর করে সে কথা বলেছেন। ‘ঈমানের পরীক্ষা নেয় আমাদের আশুরা পবিত্র, সত্য আর ন্যায় প্রতিষ্ঠায় খুঁজি আমরা মিত্র।’ কারবালার নৃশংসতার কথা অর্থাৎ ইতিহাসকে তুলে এনেছেন কবিতায়। ‘মাহে রমজান’ কবিতায় একইভাবে ধর্মীয় অনুশাসন ও তা মেনে চলার কথা বলেছেন। তবে এখানে তিনি বাঙালি জাতির অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা উল্লেখ করেছেন। ‘হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান,/সবাই মিলে এক সাথে থাকি।/নেই কোন দ্বিধা দ্বন্দ্ব/ ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের কাম্য।’
‘একদিন আমরা চলে যাবো’ একটি পারমার্থিক কবিতা। অধিবিদ্যায় স্নাত কবিতাগুলোতে তিনি যে পারমার্থিক জগতের কথা বলেছেন তাতে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা আছে, আছে পারলৌকিক জীবনের সারসত্য। সেখানে ইসলামের বিধান অনুসরণ করে সত্য সুন্দর জীবন ব্যবস্থায় আত্মসমর্পণ করার কথাও উঠে এসেছে। ‘জন্ম-মৃত্যু শাশ^ত নিয়ম চিন্তার বিষয়’ কবিতায় বিজ্ঞানভিত্তিক ভাবনা বা জাগতিকতার সঙ্গে আধ্যাত্মিক বিশ^াসের পৃথিবীর ভিন্নতা উপস্থাপিত হয়েছে। ‘মুসলিমরা পরকালের লাভ লোকসানটাকেই প্রাধান্য দেয়,/পরকাল ছেড়ে তারা দুনিয়াতে অর্জন না চায়।’ ‘আরে কোরআন হলো আল্লাহর বিধান’ মানব জাতির জন্য ইসলামের শাস্ত্রীয় গ্রন্থটির মর্যাদা সমুন্নত করে তুলেছেন এ কবিতায়। লিখেছেনÑ ‘মনের আকাশটাকে রাঙাবো কোরআনের বাণীতে,/উন্নত জীবন গড়বো মোরা কোরআনের কালিতে ॥’ ‘তুমি আল্লাহ মহান/ তুমি বড়ই মেহেরবান’-এর উপস্থাপনটি গানের চরণ বিন্যাসকে মনে করিয়ে দেবে। কবি এখানে সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাঁর নিজ হৃদয়ের আকুতি প্রকাশ করেছেন।
‘ও খোদা প্রেমের সুধা/আরকান্দাইসনারে’ এটিও সৃষ্টিকর্তার আরাধনায় নিবেদিত চরণগুচ্ছ। গানের সুরে উপস্থাপিত চরণগুলো সহজেই পাঠককে আকৃষ্ট করবে। কবির পারমার্থিক ভাবনায় ভোগ নয় ত্যাগই গুরুত্ব পেয়েছে সর্বাধিক। এজন্য ‘ভোগে আনে ধন আর পাপ’ লিখে তিনি দেখিয়েছেনÑ ‘ত্যাগে আনে গরিবি আর পুণ্য তাপ।’…‘ধর্ম কর্ম আনে সুখ শান্তিময়তা’। ধর্ম পালনে মানুষের নৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ হয় তাও এই কবিতায় ব্যক্ত হতে দেখি আমরা। যেহেতু কবির কবিতার নামই ‘মানুষ আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি’। সেহেতু তিনি মানুষের সক্ষমতাকে মহীয়ান করেছেন। লিখেছেনÑ ‘মানুষ আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি করে দুনিয়ার স্রষ্টার প্রতিনিধিত্ব’। কবির পারমার্থিক কবিতায় স্রষ্টার কাছে কবির প্রার্থনা, অনুরোধ ও কাতরতা ব্যক্ত হয়েছে। ‘প্রভু মোরে করো দান’ এ ধরনের কবিতা। ‘বিদায় হজ’ কবিতায় ইসলামের ইতিহাস মহিমান্বিত হয়েছে। নবীজীর বিদায় হজের বাণীর চিরায়ত রূপটি তুলে ধরেছেন ইবনে সালেহ মুনতাসির। যেখানে ব্যক্ত হয়েছেÑ গণতন্ত্রের কথা, স্বাধীনতার কথা, মানবতার কথা। তার মতে, ‘বিদায় হজের ভাষণ মহামুক্তির মহাভাষণ।’
কবির ধর্মীয় অনুষঙ্গবাহিত কবিতাগুলোতে পরকালের জীবনের সুখ-শান্তি অন্বেষণ মুখ্য হয়ে উঠেছে। কিভাবে পৃথিবীর মানুষের জীবনে অশান্তি-অকল্যাণ দূর হবে, কিভাবে বিভিন্ন মত ও পথের দ্বন্দ্ব দূর হবে তার কথাও ঘুরে ফিরে এসেছে কবির কবিতায়। শান্তির জন্য কবির মতে, ‘ব্যক্তি আর জাতিগত ত্যাগের মহিমায় হতে হবে সমুজ্জ্বল সবি।’ তিনি এক্ষেত্রে কেবল ধর্মীয় প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন না। তিনি দেশের অর্থনীতি, মুদ্রানীতির কথা বলেছেন। বাজার ব্যবস্থা ও ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়েও আলোকপাত করেছেন। অর্থাৎ ধর্মীয় কবিতায় বাস্তব সংকটগুলোও চিহ্নিত করেছেন কবি।
কবিতায় দেশের কথা
ইবনে সালেহ মুনতাসিরের কবিতায় সবচেয়ে বেশি এসেছে বাংলাদেশের কথা। বিশেষত এদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, মানবসম্পদ সূচকের উন্নতি, ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার এবং বিশ^ নেতৃবৃন্দের অভিনন্দন সবই উপস্থাপন করেছেন কবিতায়। এসব ক্ষেত্রে কবিতায় বিবরণ প্রাধান্য পেয়েছে। তবে কবির আবেগ- অনুভূতির প্রকাশ অলক্ষ্যে থাকেনি।
‘বিশ্ব উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ’ কবিতায় আছে ‘দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা বাংলাদেশের উন্নত দেশের কাতারে আরোহণের চিত্র। ‘দেশের যতোসব অবদান নর-নারীদের কল্যাণ’ কবিতায় নারী-পুরুষ উভয়ের অবদানের কথা তুলে ধরেছেন। জেন্ডার বৈষম্যের অবসান চেয়েছেন এবং নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলেছেন। দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে নারী সমাজের অবদানকে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন এভাবেÑ ‘নারীরা আজ অন্তঃপুরে নয়, নারীরা আজ সর্বত্র এ পারা,/দেশ-জাতির সকল কর্মকা-ে সম্পৃক্ত থাকবে তারা।’
স্বদেশ নিয়ে ইবনে সালেহ মুনতাসিরের আবেগ শতধারায় প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন কবিতায়। ‘হে বাংলাদেশ তুমি আমাদের সাত রাজার ধন’ কবিতাটি তার মধ্যে অন্যতম। যে সংগ্রামের রক্তস্নাত পথ বেয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে তা অভূতপূর্ব। এজন্য কবির দৃঢ় প্রতিজ্ঞাÑ ‘আসুক যতো আঘাত ষড়যন্ত্র নীল-নকশা করবো মোরা প্রত্যাখ্যাত’। অন্য একটি কবিতার এজন্যই তিনি নাম দিয়েছেনÑ ‘হে বাংলাদেশ তুমি মোদের করেছ মহান’। সেখানে তার সুচিন্তিত অভিমতÑ ‘এগিয়ে চলেছ তুমি বিজয়ীর বেশে বিশ্ব নেতৃত্বের বাসনায়,/সারাবিশ্ব খুঁজে বেড়ায় তোমায় বিনিয়োগের শেষ ঠিকানায়।’
স্বদেশ বিষয়ক কবিতায় কবি দেশের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে ভেবেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। ‘দেশ ও দশের অভিভাবক মহামান্য প্রেসিডেন্ট’ কবিতায় তিনি রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছেন এভাবেÑ ‘মহামান্য প্রেসিডেন্ট আপনি হলেন দেশের পিতা।’ অন্যদিকে কবি লিখেছেনÑ ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশ ও জাতির মন্ত্রণালয় প্রধান’। কেবল রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান নয় দেশ পরিচালনায় নিয়োজিত নীতিনির্ধারক সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কথা কবিতায় লিখেছেন।
ইবনে সালেহ মুনতাসির স্বদেশের কথা বলার সময় এখানকার প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট দুর্যোগ নিয়ে কথা বলেছেন। ‘বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম’ কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এদেশের ভূমিকম্পপ্রবণতার হাল-হকিকত। একটি অংশ উল্লেখ করা যেতে পারেÑ
‘ভারতীয় প্লেটটি ছুটে গেলো সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প হবে
বেঙ্গল বেসিন শুকালে ভূ স্তর ফাঁপা হয়ে ভূ-ধস হবে নির্বিবাদে।
ভূমিকম্প ভূ-ধসে বাংলাদেশের দালানগুলো যাবে পড়ে,
মানুষ সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবার উপরে।’

সমকালীন সামাজিক সংকট ও অবক্ষয় চিত্রণ
‘মৃত্যুর মিছিলের শেষ নেই’ কবিতা আসলে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্রণ। সহিংসতা আর সন্ত্রাসের বলি মানুষের জীবন এখানে সংকটাপন্নÑ কবি এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আমাদের চেতনায় নাড়া দেয়ার জন্য বারবার উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন। রাজনীতি আর নির্বাচনের ডামাডোলে তৃণমূল মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে তারও চিত্র রয়েছে অনেক কবিতায়।
‘দেশে অস্থিরতা জনমনে অস্বস্তি সুখ শান্তি নাই’ কবিতায় একইভাবে জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে কথা বলেছেন কবি। এ ধরনের বাস্তবতা কবিতার ছন্দে রূপ দানের ক্ষেত্রে শব্দ চয়ন ও প্রতীক-চিত্রকল্প নির্মাণ খুব একটা সহজ কাজ নয়। সেই কঠিন কাজটি কবিতার চরণে তুলে ধরেছেন ইবনে সালেহ মুনতাসির। এজন্য তার কবিতা কেবল ‘স্লোগানসর্বস্ব’ হয়ে থাকেনি। ‘বদলেছে যুগ বদলেছে সময় চিন্তা চেতনা’ কবিতায় তিনি বদলে যাওয়া পৃথিবীর কথা বলেছেন। ‘বইছে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে চাওয়া পাওয়ার পরিবর্তন’। তরুণ প্রজন্মকে দেশের মধ্যে ধরে রাখার জন্য পরিবর্তনের ছোঁয়ার পরশে আগলে রাখতে হবে। সমকালীন অবক্ষয়ের একটি চমৎকার চিত্র রয়েছে ‘মোবাইল, ওয়েবসাইট এটিএম বুথ হ্যাকিং হচ্ছে’ নামের কবিতায়। হ্যাকাররা এনক্রিপশন কোড ভেঙে হ্যাকিং করছে কিভাবেÑ সেই পরিস্থিতি বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে তার ফলে সৃষ্ট ক্ষতির খতিয়ান দিয়েছেন কবি। লিখেছেনÑ ‘অপ্রতিরোধ্য গতিতে হানা দিচ্ছে বিশ্বের দেশে দেশে, অন্ধকার অপরাধ জগতের সাথে জড়িয়ে পড়ছে বিশ^ প্রতিবেশে।’ সমাধানও দিয়েছেন কবিতায়। এজন্য দরকার প্রযুক্তিগত সমস্যা ও অঘটনের জন্য সবাইকে প্রস্তুত করা। দেশকে নিশ্চয়তা দিয়ে শঙ্কামুক্ত রাখা।
‘সারাবিশ্ব আজ সন্ত্রস্ত সন্ত্রাসবাদের বিস্তারে’ একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও সমকালীন সংকটের কবিতা। সূচনায় ইবনে সালেহ মুনতাসির কবিতাটির থিম লিখেছেন এভাবেÑ ‘গণতান্ত্রিক স্বাধীন ক্ষমতাধর বিশ্বসমাজের ফোরাম হিসেবে জাতিসংঘকে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। গণতন্ত্র স্বাধীনতা সাম্য সংহতি মানবতা ন্যায়পরায়ণতার অভাবে বর্তমান বিশ্ব নেতৃত্বে বহুধা ধারায় মতে আদর্শে সংস্কৃতিতে ধর্মের মৌলিকত্বে অনেক ফারাক সৃষ্টি হওয়ায় আজকের বিশ্ব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সর্বগ্রাসী সমস্যার জন্য সকল দেশের সকল জাতিসত্তার ধর্মের মানুষের সুযোগ ও আলোচনার ফোরাম প্রয়োজন। প্রয়োজন নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ।’ অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদের বিস্তার, তার কারণ এবং সেখান থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় বাতলে দিয়েছেন কবি। এই কবিতা থেকে কবির বৈশি^ক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কবি বলতে চেয়েছেন, মানুষে মানুষে বিভেদ এবং রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে দ্বন্দ্ব-সংঘাত আমাদের নিরাপত্তাহীন পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এখান থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন জাতিসংঘের বলিষ্ঠ ভূমিকা এবং মানবতাকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেয়া।
আমাদের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা নিয়েও কবিতা লিখেছেন ইবনে সালেহ মুনতাসির। ‘গাড়ি হলো আজ বড় বিস্ফোরক’ এরকম একটি কবিতা যেখানে গ্যাস চালিত আনফিট গাড়ি আমাদের কিভাবে মৃত্যু ঝুঁকিতে ফেলছে তার বর্ণনা রয়েছে। কবির মতে, ‘মরার আগে সবাই স্বাভাবিক মৃত্যু চায়,/জনগণের জীবন-মরণ সমস্যায় উপায়ে যায়।’
প্রকৃতি ও প্রেম ভাবনা
ইবনে সালেহ মুনতাসির কিশোরগঞ্জের হাওরের সন্তান। এজন্য তার কবিতায় হাওর ও হাওরবাসীর কথা এসেছে প্রকৃতি বিষয়ক কবিতার ভেতর। অবশ্য তিনি দেশ-জাতি-অর্থনীতি নিয়ে বিপুল সংখ্যক কবিতা লিখেছেন। এজন্য মনে হতে পারে তিনি প্রেম ও প্রকৃতি বিষয়ক কবিতা সৃজনে উৎসাহী নন। কিন্তু তার কবিতা পাঠ করলে আমরা দেখতে পাই তিনি দেশের কবি, সেই দেশকে কেন্দ্র করে প্রকৃতির কবি এবং তিনি যেহেতু মানুষের কবি তাই মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ প্রেমের বিষয়ে তাঁর উচ্চারণ অবারিত। একটি কবিতায় তিনি প্রকৃতি সম্পর্কে মূল থিম প্রকাশ করেছেন এভাবেÑ ‘প্রকৃতির আইন অমোঘ আর শাশ^ত প্রকৃতির নিয়মের ব্যত্যয় ব্যতিচার ঘটলেই প্রতিশোধ প্রতিকার প্রত্যাঘাত বিরোধী প্রতিক্রিয়া সংঘটিত হয়। মানুষ তার বিপদাপদ নিজেরাই ডেকে এনেছে। মনুষ্যসৃষ্ট প্রকৃতিবিরোধী সকল অনাসৃষ্টিই মানুষের ধ্বংস ডেকে এনেছে। রোগবালাই রোগজীবাণু ভাইরাস আর্সেনিক ফরমালিন হাইড্রোজ সার অ্যালালিন কীট নামক পেস্টিসাইড হার্বিসাইড ভারীধাতু ক্যাডাসিয়াম পারদ ঘটিত… নদ-নদীর পানি, বায়ুদূষণ মাছ-মাংস সবজি ফলমুল ওষুধ দূষণে মানুষ, মাছ হিমশিম খাচ্ছে। নির্বিবাদে মারা যাচ্ছে নতুন নতুন অসুখ-বিসুখ সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে। আর্সেনিক উঠে আসছে। পানির স্তর নিচে যাচ্ছে। ভূমি ধস ভূমিকম্প অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি খরা বন্যা প্লাবন ঝড় জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ অতি বৃষ্টি বাড়ছে। নির্বিচারে কলকারখানা গড়ে ওঠায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওজোন স্তর কমে যাচ্ছে, বরফ গলে যাচ্ছে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি আছে। বন উজাড় করে প্রাণহানি ঘটাচ্ছে। প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। নিউটনের গতিশক্তি প্রকৃতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বটে।’ প্রকৃতি সম্পর্কে কবির প্রত্যয় প্রকাশিত হয়েছে তার বিভিন্ন কবিতায়। তিনি সুন্দরবন নিয়ে কবিতা লিখেছেন, অন্যদিকে দিয়েছেন পার্বত্য এলাকার ভূ-প্রকৃতির বর্ণনা। তিনি কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে ভেবেছেন। দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনে সাধারণ মানুষকে কবিতার চরণে স্থান দিয়েছেন।
শেষ কথা
মূলত ইবনে সালেহ মুনতাসিরের সক্রিয় ও সৃজনশীল চেতনা মানুষের জন্য যা কিছু মঙ্গলজনক তার বিস্তৃত বিবরণ দিতে উৎসাহী। বিভিন্ন কবিতার মাধ্যমে সেই চেতনাই আত্মপ্রকাশ করেছে। ‘মরিতে চাহিনা দুনিয়ায়’ এজন্য দুনিয়ার মায়াভরা রূপে মুগ্ধ কবি। এই লৌকিক জীবনের প্রতি তার মমত্বের কারণ বলে গিয়েছেন একটির পর একটি পঙক্তিতে। আত্মজীবনীমূলক ‘মহান দাতা’ কবিতায় কবি ‘নিকলী নগর বড় বাড়ি’র একজনের উদার মানসিকতার পরিচয় ব্যক্ত করেছেন। জনসেবা যার একমাত্র কাজ। মানুষের মঙ্গল চিন্তা যার অভিনিবেশ। জীবনের ইতিবাচক দিক নিয়ে সরব এই কবি যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন মানুষের কথা বলবেন, দেশের কথা, দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়ন নিয়ে ভাববেনÑ এটাই ইবনে সালেহ মুনতাসির কবিসত্তার মুখ্য বৈশিষ্ট্য।
লেখক : সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, সিলেট