প্রতিবেদন

এসএসসির ফল প্রকাশ : ৯ বছরের মধ্যে এবার বেশি সংখ্যক জিপিএ-৫ পাওয়ার রেকর্ডে উল্লসিত শিক্ষার্থী-অভিভাবক

নিজস্ব প্রতিবেদক
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেয়ার মধ্য দিয়ে ৬ মে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। ফলাফল গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, সমাজের সর্বস্তরে শান্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তোমাদের মতো আরো সোনার ছেলে প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী সমাজে শান্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাস করা এসএসসি ও সমমানের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘একদিন বাংলাদেশ বিশ্বে একটি উন্নত দেশ হিসেবে স্থান করে নিতে সক্ষম হবে; কেননা লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কখনো ব্যর্থ হতে পারে না।’ দারিদ্র্য এবং ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য শিক্ষার হার শতভাগে উন্নীত হওয়া জরুরি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামীতে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে বাংলাদেশের আরো অনেক সোনার ছেলের প্রয়োজন রয়েছে।
পরে ১০টি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান পৃথকভাবে স্ব স্ব শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলের কপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট হস্তান্তর করেন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা বিভাগ সংক্রান্ত প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। এ সময় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বরিশাল এবং বান্দরবান জেলা সংযুক্ত ছিল। প্রধানমন্ত্রী পরে জেলা দুটির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এ বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১০টি শিক্ষা বোর্ডের ২০ লাখ ২৬ হাজার ৫১৪ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ১০৪ শিক্ষার্থী পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জন। গত ৯ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। রেকর্ডসংখ্যক জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উল্লসিত মনোভাব দেখা গেছে।
এসএসসিতে ৮টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৭৯ দশমিক ৪০ শতাংশ, মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৭০ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
এবার এই পরীক্ষায় ১০টি শিক্ষাবোর্ডে গড় পাসের হার ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমেছে, তবে এবার জিপিএ-৫ এর সংখ্যা বেড়েছে। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৪ হাজার ৭৬১ জন। এবার পেয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জন। বেড়েছে ৫ হাজার ৮৬৮ জন। সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়নের কারণে সার্বিক পাসের হার কিছুটা কমেছে এবং সৃজনশীল পদ্ধতি রপ্ত করতে পারায় জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার বেশ বেড়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।
প্রতিবারের মতো এবারো শহরের স্কুলগুলো ভালো ফল করেছে। পিছিয়ে পড়েছে গ্রামের স্কুলগুলো। ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ভালো ফল করা স্কুলগুলোতে বাঁধ ভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে শিক্ষার্থীরা। বাদ্য বাজিয়ে, হাতে হাত রেখে নেচে-গেয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা। স্কুলের দেয়ালে দেয়ালে টাঙিয়ে দেয়া হয় ফলাফল। ওয়েবসাইটেও ফল প্রকাশ করা হয়। মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমেও পরীক্ষার ফল জানা গেছে। প্রায় সকলেই মোবাইল এসএমএস ও ওয়েবসাইট থেকে ফল সংগ্রহ করেন।
এবার ১০টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০ লাখ ২৬ হাজার ৫৭৪ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করে ১৫ লাখ ৭৬ হাজার ১০৪ জন। উত্তীর্ণদের মধ্যে ৭ লাখ ৮৪ হাজার ২৪৫ জন ছাত্র ও ৭ লাখ ৯১ হাজার ৮৫৯ জন ছাত্রী। দেশের ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এসএসসিতে এবার ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪২৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করে ১২ লাখ ৮৯ হাজার ৮০৫ জন। পাসের হার ৭৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৮৪৫ জন। মাদ্রাসা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ৮৬ হাজার ৯১৭ জন, পাস করেছে ২ লাখ ৩ হাজার ৩৮২ জন, পাসের হার ৭০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছে মোট ৩ হাজার ৩৭১ জন। কারিগরি বোর্ডে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৪ জন। পাস করেছে ৮২ হাজার ৯১৭ জন। পাসের হার ৭১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছে মোট ৪ হাজার ৪১৩ জন।
ঢাকা বোর্ড : এবার ঢাকা বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নেয়া ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪ লাখ ৩২ হাজার ২০১ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ২ লাখ ৬ হাজার ৮৯৭ জন ছাত্র এবং ২ লাখ ২৫ হাজার ৩০৪ জন ছাত্রী। পাসের হার ৮১ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
রাজশাহী বোর্ড : এ বোর্ডে পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮৬২ জন। উত্তীর্ণ হয় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬৫ জন। এর মধ্যে ৮৫ হাজার ৮২২ জন ছাত্র এবং ৮১ হাজার ৪৩ জন ছাত্রী। পাসের হার ৮৬ দশমিক ০৭ শতাংশ।
কুমিল্লা বোর্ড : কুমিল্লা বোর্ডে ১ লাখ ৮২ হাজার ৭১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয় ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৭ জন। এর মধ্যে ৬৬ হাজার ৩৭ জন ছাত্র এবং ৮০ হাজার ৮৬০ জন ছাত্রী। পাসের হার ৮০ দশমিক ৪০ শতাংশ।
যশোর বোর্ড : যশোর বোর্ডে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার ৬৯৯ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৬৮ হাজার ৮১৭ জন ছাত্র এবং ৭১ হাজার ৮৮২ জন ছাত্রী। পাসের হার ৭৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
চট্টগ্রাম বোর্ড : এ বোর্ডে ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ২ হাজার ৩৭ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৪৬ হাজার ৬০৮ জন ছাত্র এবং ৫৪ হাজার ৪২৯ জন ছাত্রী। পাসের হার ৭৫ দশমিক ৫০ শতাংশ।
বরিশাল বোর্ড : এ বোর্ডে ১ লাখ ৩ হাজার ১২৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৯ হাজার ৫২০ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৩৯ হাজার ৫১ জন ছাত্র এবং ৪০ হাজার ৪৬৯ জন ছাত্রী। পাসের হার ৭৭ দশমিক ১১ শতাংশ।
সিলেট বোর্ড : এ বোর্ডে ১ লাখ ৮ হাজার ৯২৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৬ হাজার ৭১০ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৩৪ হাজার ১৪৩ জন ছাত্র এবং ৪২ হাজার ৫৬৭ জন ছাত্রী। পাসের হার ৭০ দশমিক ৪২ শতাংশ।
দিনাজপুর বোর্ড : এ বোর্ডে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৬৪৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৭৬ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৭২ হাজার ৬১৬ জন ছাত্র এবং ৭২ হাজার ২৬০ জন ছাত্রী। পাসের হার ৭৭ দশমিক ৬২ শতাংশ।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড : এবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেয় ২ লাখ ৮৬ হাজার ৯১৭ জন পরীক্ষার্থী। উত্তীর্ণ হয় ২ লাখ ৩ হাজার ৩৮২ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ১ হাজার ৪৩৬ জন ছাত্র এবং ১ লাখ ১ হাজার ৯৪৬ জন ছাত্রী। পাসের হার ৭০ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড : এ বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৪ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ৮২ হাজার ৯১৭ জন উত্তীর্ণ হয়। এদের মধ্যে ৬১ হাজার ৮১৮ জন ছাত্র এবং ২১ হাজার ৯৯ জন ছাত্রী। পাসের হার ৭১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
বোর্ডওয়ারি জিপিএ-৫
এবার ঢাকা বোর্ডে ৪১ হাজার ৫৮৫ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এছাড়া রাজশাহী বোর্ডে ১৯ হাজার ৪৯৮, কুমিল্লা বোর্ডে ৬ হাজার ৮৬৫, দিনাজপুর বোর্ডে ১০ হাজার ৭৫৫, বরিশাল বোর্ডে ৩ হাজার ৪৬২, যশোর বোর্ডে ৯ হাজার ৩৯৫, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৮ হাজার ৯৪ এবং সিলেট বোর্ডে ৩ হাজার ১৯১ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
ভর্তি কার্যক্রম শুরু ১৩ মে
আগামী ১৩ মে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি আবেদন কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানা গেছে। আবেদনের শেষ সময় ২৪ মে। এবারো একজন শিক্ষার্থী কমপক্ষে ৫টি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির নীতিমালা চূড়ান্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীতিমালা অনুযায়ী এবার শতভাগ আসন মেধার ভিত্তিতে ভর্তি করা হবে।