রাজনীতি

খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান কেন্দ্রিক কর্মকা- নিয়ে ব্যস্ত বিএনপি : উপেক্ষিত গণমানুষের রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বিএনপির রাজনীতি এখন কেবল খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান কেন্দ্রিক আবর্তিত হচ্ছে। তাদের সমস্ত চাওয়া-পাওয়া এই দুজনকে ঘিরেই। দলটির সমর্থক ও তৃণমূলের নেতাকর্মী এবং গণমানুষেরও যে চাওয়া-পাওয়া, দাবি-দাওয়া থাকতে পারে তা সম্পূর্ণই অনুপস্থিত বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মকা-ে। দুর্নীতির দায়ে ৫ বছরের দ- পেয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এখন কারাগারে। দলের দ্বিতীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত এবং লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি কোনো কালে দেশে ফিরতে পারবেন কি না তাও অনেকটা অনিশ্চিত। এখন আবার জানা গেছে তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিকই নন। বাংলাদেশি নাগরিকত্ব তিনি স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিয়েছেন ব্রিটিশ সরকারের কাছে। তারেক রহমান বাংলাদেশের ভোটারও নন; এমনকি তার পরিবারের কেউই বাংলাদেশের ভোটার নন, সবাই বাংলাদেশি পাসপোর্ট পরিত্যাগ করে লন্ডনে বসবাস করছেনÑ এই প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কী হবে এবং তাদের অবর্তমানে বিএনপি কয় ভাগে বিভক্ত হবে, এসব নিয়ে যেমন চরম হতাশা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তেমনি সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, গণমানুষের রাজনীতিকে উপেক্ষা করে এই দলটি বাংলাদেশে কতদিন রাজনীতি করতে পারবে!
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে মুচলেকা দিয়ে লন্ডনে যাওয়ার ১০ বছর পর প্রথমবারের মতো বিএনপি স্বীকার করল তাদের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে আসলে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। বিগত ১০ বছর ধরে সবসময়, এমনকি আদালতের কাছেও এতদিন দলটি বলেছে, তারেক রহমান লন্ডনে চিকিৎসাধীন আছেন। রাজনৈতিক আশ্রয়ের তথ্য দিয়ে তারেক রহমানের বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রত্যাহারে সৃষ্ট রাজনৈতিক ব্যর্থতা সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও এর মধ্য দিয়ে নতুন সংকটে জড়িয়ে পড়ল বিএনপি। রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য পাসপোর্ট জমা দেয়ার কথা স্বীকারের মধ্য দিয়ে দলটির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ও দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাংলাদেশি নাগরিকত্বের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ল। এদিকে তারেক রহমানের পাসপোর্ট প্রত্যাহারের ঘটনা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অনেকটা দায় স্বীকার করে বলেছেন, তারেক রহমান পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন! এবং তিনি সাময়িকভাবে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দ-িত আসামি তারেক রহমানকে যেভাবেই হোক দেশে ফিরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে কথা বলেছি। যে অপরাধী সাজাপ্রাপ্ত, সে কী করে এখানে থাকে?
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক আশ্রয়ের তথ্য দিয়ে তারেক রহমানের বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রত্যাহারে সৃষ্ট রাজনৈতিক ব্যর্থতা সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও এর মধ্য দিয়ে নতুন সংকটে জড়িয়ে পড়ল বিএনপি। কারণ এর মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব থাকার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, তারেক রহমানের পক্ষের আইনজীবীগণ দীর্ঘদিন ধরে আদালতে মিথ্যাচার করে আসছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে প্যারোলে যুক্তরাজ্যে যান। বিদেশ যাওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি আদালতে হাজির হননি। তাকে তো আজীবনের জন্য প্যারোল দেয়া হয়নি। বিএনপির নেতারা বলছেন তারেক রহমান লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন। তাই সরকারের উচিত আইনানুগ পদ্ধতিতে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাসহ তার বিরুদ্ধে চলমান অন্যান্য মামলায়ও বিচারে সম্মুখীন করা।
এদিকে তারেক রহমানের জন্ম নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘চোরামি’ করেছেন বলে কিছুদিন আগে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, মির্জা ফখরুল মিথ্যা কথা বলেছেন যে, জন্মসূত্রে তারেক রহমান বাংলাদেশি। চোরা তারেকের জন্ম করাচি। জন্ম নিয়েও চোরামি। খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, তারেক রহমানের জন্ম করাচিতে। তাই তারেক রহমান কোনোভাবেই জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক না।
এদিকে তারেক রহমান বিতর্কে যখন রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত ঠিক তখন বিএনপিতে চলছে চরম শূন্যতা ও হাহাকার। তবে দলের তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন হলেও বিএনপির অনেক শীর্ষ নেতাই তলেতলে আছেন খোশ মেজাজে। তারা দলের শীর্ষ নেতার পদ দখল করার গোপন মিশনে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার খালেদা-তারেককে বাদ দিয়ে নতুন দল গড়ার স্বপ্নে কাজ করছেন। আবার কেউ কেউ বর্তমান সমালোচনা এড়িয়ে দেশ ও দলের স্বার্থের কথা বলে শীর্ষ পদটি দখলের পাঁয়তারা করছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান বিএনপির নেতৃত্ব থেকে আউট হয়ে যাওয়ার পর এখন দলটির মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, তাদের আগামীর নেতা কে? মোটকথা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে আসলে কে আসবে, কঠিন এ মুহূর্তে কে দলের হাল ধরবেনÑ তা ভেবে রীতিমতো শঙ্কিত বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তাই তারাও এখন আশঙ্কা করছেন, ‘এই যাত্রায় বিএনপির ভাঙন বোধ হয় আর ঠেকানো গেল না।’
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে নতুন বিএনপি গঠনের জন্য উন্মুখ নেতারা এখন আন্দাজে ঢিল ছোড়ার মতো মন্তব্য করছেন। কোনো নেতা বলছেন, খালেদা জিয়া রমজানের আগেই জামিন পাবেন, কেউ বলছেন, জুনে মুক্তি পাবেন, কেউ বলছেন, নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া জামিন পাবেন, আবার কেউ বলছেন, না, ৫ বছরের আগে তিনি জামিন পাচ্ছেন না।
তারেক রহমানের বাংলাদেশে ফেরা না ফেরা নিয়ে বিএনপির নেতারা আড়ালে-আবডালে বলছেন, তারেক রহমানের নাগরিকত্ব নিয়ে যেভাবে প্রশ্ন উঠেছে, তিনি যেভাবে মামলার জালে জড়িয়ে পড়ছেন, তাতে তার আর বাংলাদেশে ফেরার কোনো সম্ভাবনাই নেই। মূলত এই দোলাচলেই এখন বিএনপি ব্যস্ত। দলটির সামনে এখন কার্যত কোনো লক্ষ্যই নেই। গণমানুষের রাজনীতি তাদের কাছে চরমভাবে উপেক্ষিত হওয়ায় দেশের মানুষের পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীরাও হতাশ ও দিকভ্রান্ত।