ফিচার

তথ্যপ্রযুক্তি : অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হাই-টেক পার্কের গুরুত্ব

মোহাম্মদ নাজমুল আলম
শিল্প পার্ক-এর অনুরূপ হাই-টেক সিটি অথবা আইটি পার্ক হচ্ছে একটি ল্যান্ডস্কেপ উন্নয়ন যেখানে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান যেমন তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, আইটি প্রশিক্ষণ, বিপণন ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয় সর্বস্তরে ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করার জন্য। ৩০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বিশ্বখ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি হাই-টেক পার্কের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যেখানে জন্মলাভ করেছে ইয়াহু, গুগল, ইবের মতো বড় ইন্টারনেট ডটকম কোম্পানিগুলো। ২০০০ সালে এখানে গড়ে ওঠা প্রায় ৪ হাজার উচ্চ প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানি প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করেছে আর এর সিংহভাগ হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কিত বিনিয়োগের মাধ্যমে। এছাড়া এখানে রয়েছে হাজার হাজার স্টার্টআপ কোম্পানি, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমস্ত ভেনচার মূলধন বিনিয়োগের এক-তৃতীয়াংশের জন্যও কাজ করে এবং রয়েছে উচ্চপ্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের জন্য একটি অগ্রণী হাব, যা ইকোসিস্টেম হতে এই অঞ্চলকে সাহায্য করেছে। ভারতের সিলিকন ভ্যালিটি ব্যাঙ্গালুরুতে অবস্থিত যেটি ভারতের ইনফরমেশন টেকনোলজি কোম্পানিগুলোর জন্য হাব হিসেবে কাজ করছে। এখানে রয়েছে শতাধিক সফটওয়্যার কোম্পানি, প্রকৌশল কলেজ, ব্যাঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয় এবং রয়েছে বিশ্বের সর্বাধিক সংখ্যক সফটওয়্যার পেশাজীবী। প্রায় ২ মিলিয়ন আইটি পেশাদারের সাথে আরও রয়েছে ৬ মিলিয়ন আইটি সম্পর্কিত চাকরি। এখানকার আইটি রপ্তানি বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার এবং ব্যাঙ্গালুরু হচ্ছে জিডিপির পঞ্চম-সর্বোচ্চ আয়ের ভারতীয় শহর। কাজেই ব্যাঙ্গালুরুকে ভারতের সিলিকন ভ্যালি বলা হয়ে থাকে। আমরা আশা করি গাজীপুরের কালিয়াকৈর হবে বাংলাদেশের সিলিকন ভ্যালি যেখানে লক্ষ লক্ষ প্রযুক্তিবিদ অদূর ভবিষ্যতে নিজেদেরকে উদ্ভাবনী কাজে ব্যস্ত রাখবেন। দেশি-বিদেশি নামকরা কোম্পানিগুলো সেখানে তাদের অফিস, প্রযুক্তি কারখানা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান চালু করে গার্মেন্টস শিল্পের মতো আইটি শিল্পেও বাংলাদেশ অন্যতম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। আমরা এটা বিশ্বাস করি কারণ আমাদের বিশাল সম্পদ ও আজকের অগ্রগামী শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের সেই সক্ষমতা আছে। শুধু যে জিনিসটির অভাব সেটি হলো সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। এই প্রজন্মের অবশ্য সেটা নিয়ে মাথা ব্যথা নেই কিন্তু তাদেরকে সেই পরিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি করে দেয়াটাই একটা চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জটা জয় করতে পারলে এই দেশ একদিন আইটি শিল্পেও বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হবে।

বাংলাদেশে হাই-টেক পার্ক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ডিজিটাল বাংলাদেশ ও প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় সরকার একটি করে হাই-টেক পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশে আইটি পার্ক তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, আইটি শিল্পে উদ্যোক্তা তৈরি, দেশি-বিদেশি কোম্পানির প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার জন্য অবকাঠামো তৈরি, দেশীয় বিভিন্ন কোম্পানির জন্য সফটওয়্যার তৈরি ও বিদেশে সফটওয়্যার রপ্তানিসহ বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা মূলত এর উদ্দেশ্য। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া এবং উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জন্য পাবলিক সার্ভিস ও অবকাঠামো ডিজিটালাইজেশন করাও হাই-টেক পার্কের উদ্দেশ্য। বাংলাদেশে অনেকগুলো আইটি পার্কের প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে এবং ইতোমধ্যে যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়ার প্রযুক্তি পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। নির্মিত এই পার্কটিতে প্রায় ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে এই আইটি পার্কে বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন কাজ করছে।

সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক
রাজধানী ঢাকার কাওরানবাজারে জনতা টাওয়ার সফটওয়ার টেকনোলজি পার্কে ১৫টি আইটি কোম্পানিকে জায়গা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ১০টি কোম্পানি ইতোমধ্যেই তাদের কর্মকা- শুরু করেছে। পার্কটিতে আড়াই হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে ১০টি কোম্পানিতে ৭০০ লোক কাজ করছে।

কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, ৩৯৪.১৪৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক ৩৫৫ একর জমিতে স্থাপন করা হচ্ছে এবং এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর। পার্কটির নির্মাণ কাজ শেষ হলে প্রায় ১ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া জ্ঞানভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার জন্য বিশ্বমানের বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি, দেশি-বিদেশি নামকরা আইসিটি কোম্পানিকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার জন্য যথোপযুক্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ মডিউল প্রস্তুত, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও ফার্ম পর্যায়ে উদ্ভাবনী কার্যক্রমে সহায়তা প্রদান, হাই-টেক পার্কের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায় পরিবেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও হবে এই পার্কের উদ্দেশ্য।

হাই-টেক পার্ক সিলেট
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি চালু হলে ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং বিশ্বমানের বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সুযোগ-সুবিধাদি সৃষ্টির মাধ্যমে দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিকমানের আইটি ও আইটিইএস প্রতিষ্ঠান এবং ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে পার্কে আকৃষ্টকরণ, আইটি পেশাজীবীদের জন্য চাকরির ক্ষেত্র তৈরি করা এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ-ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের নিমিত্ত প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা এই পার্কের উদ্দেশ্য।

রাজশাহী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক
কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের জুনে প্রকল্পটি চালু হলে ১৪ হাজার জন লোকের কর্মসংস্থানসহ রূপকল্প ২০২১-এর লক্ষ্য অর্জন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাজশাহী অঞ্চলে হাই-টেক শিল্পের বিকাশ, মৌলিক অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার এবং আইটিইএস শিল্পপ্রতিষ্ঠা ও কার্য পরিচালনার জন্য বিদেশি কোম্পানি আকৃষ্ট করতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি গ্র্যাজুয়েটদের উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি ও কর্মসংস্থান, উত্তরাঞ্চলে আইটি শিল্পের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিতকরণসহ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানব উন্নয়ন করাই হবে এই পার্কের উদ্দেশ্য।

১৭টি জেলায় আইটি পার্ক
হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য মতে, নতুন করে শুরু হতে যাওয়া ৫টি হাই-টেক পার্ক হচ্ছে মানিকগঞ্জ হাই-টেক পার্ক, সিরাজগঞ্জ হাই-টেক পার্ক, জয়পুরহাট হাই-টেক পার্ক, চাঁদপুর হাই-টেক পার্ক এবং মাদারীপুর হাই-টেক পার্কসহ ১৭৯৬.৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২০ সালের জুন মাসের মধ্যে ময়মনসিংহ সদর, জামালপুর সদর, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ, চট্টগ্রামের বন্দর, কক্সবাজারের রামু, রংপুর সদর, নাটোরের সিংড়া, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, বরিশাল সদর এবং খুলনার কুয়েট-এ আইটি পার্ক স্থাপন হচ্ছে। এসব আইটি পার্কের মূল উদ্দেশ্য হবে মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করা।

বাংলাদেশের উন্নয়নে হাই-টেক পার্কের ভূমিকা
শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ ও বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় হাই-টেক পার্কের ভূমিকা অপরিসীম। ব্যবসাবাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা সেবাসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর, কারিগরি সহায়তা প্রদান ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে হাই-টেক পার্কে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানগুলো নিরন্তর সেবা দিতে পারে। বিপুল পরিমাণে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পর্যায়ের দক্ষ প্রযুক্তিবিদ তৈরি করা ও তাদেরকে কাজে লাগিয়ে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার বানিয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি ও কারিগরি সেবার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে পারে। গার্মেন্টস সেক্টরের চেয়েও বেশি বৈদেশিক অর্থ উপার্জন করা সম্ভব এই সেক্টরে। দেশের অর্থনৈতিক ও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে হাই-টেক পার্কগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কম্পিউটার ও মোবাইল প্রস্তুতকরণ ও এর যন্ত্রাংশসহ হাসপাতাল ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন ধরনের রোবট তৈরি করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করা সম্ভব।

হাই-টেক পার্ককে কার্যকরীকরণ
হাই-টেক পার্ককে কার্যকরী করার দায়িত্ব হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের। কর্তৃপক্ষের সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও তদারকির মাধ্যমে হাই-টেক পার্কে নতুন উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করা হলে এর সুফল দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাবে। বিনা শর্তে জায়গা বরাদ্দ দিয়ে স্টার্ট আপ, ছোট, বড় ও নামিদামি দেশি-বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনা করার সুযোগ দিলে এর উদ্দেশ্য দ্রুত বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করা যায়। তবে পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে যারা আছেন তাদের প্রযুক্তি বিদ্যায় উচ্চশিক্ষা, দুর্নীতিমুক্ত ও সৎ মানসিকতা থাকা খুব জরুরি। অন্যথায় এর সুফল অর্জন করা খুব কঠিন। এছাড়া সফটওয়্যার কোম্পানি, হার্ডওয়্যার প্রস্তুতকারী ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে হাই-টেক পার্ককে দ্রুত কার্যকরী করা সম্ভব। ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালি ও ভারতের ব্যাঙ্গালুরুর অনুরূপ বাংলাদেশেও নিম্নলিখিত কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে হাই-টেক পার্ককে দ্রুত কার্যকরী করা যেতে পারে। এছাড়া এগুলোর মাধ্যমে হাই-টেক পার্কগুলোর প্রযুক্তিসেবা দ্রুত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে, আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। যেমন স্টার্টআপ কোম্পানি, বড় আকারের প্রযুক্তি কোম্পানি, বিনিয়োগকারী বিশেষ করে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম গঠন, এক্সেলারেটর কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় সম্পৃক্তকরণ এবং কো-ওয়ার্কিং স্পেসের ব্যবস্থা করে হাই-টেক পার্ককে দ্রুত কার্যকরী করা সম্ভব।

স্টার্টআপ কোম্পানি
স্টার্টআপ হচ্ছে একটি সদ্যোজাত কোম্পানি, যা উচ্চাকাক্সক্ষী উদ্যোক্তাদের মনের ধারণা থেকে জন্ম হয়। বর্তমানে প্রযুক্তি ব্যবসায় এটিই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। যেমন এয়ার বিনবি, উবার স্টার্টআপ কোম্পানির জ্বলন্ত উদাহরণ। এছাড়া ফেসবুক, মাইক্রোসফট ইত্যাদিও একসময় স্টার্ট আপ কোম্পানি ছিল। বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য যেমন চাল-ডাল, চলাচলের জন্য পাঠাও স্টার্টআপ হিসেবে বেশ পরিচিতি লাভ করছে এবং চলার পথে যানবাহনের ত্র“টি মেরামতের জন্য যান্ত্রিক, মালপত্র সরানোর জন্য ট্রাক লাগবে, জরুরি ডাক্তারের জন্য অলওয়েল, রাজধানীর বিভিন্ন নারী উদ্যোক্তার তৈরিকৃত খাবার গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করার জন্য ফুড পিওন, লাইফ স্টাইল ব্যবসায়ের জন্য স্টাইলাইন কালেকশন, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দিতে মায়া আপা। এছাড়া হাংরি নাকি, প্রিয়শপ, আজকের ডিল, শপারু, পিকাবু, দারাজসহ সহস্রাধিক স্টার্টআপ এখানে রয়েছে।

বড় আকারের প্রযুক্তি কোম্পানি
বড় আকারের প্রযুক্তি কোম্পানি যেমন অ্যাপল, গুগল, মাইক্রোসফট, ফেসবুক, এইচপি, ওরাকল, ইন্টেল একসময় স্টার্টআপ ছিল। টাইগার আইটি বাংলাদেশ, ম্যাগনিটো ডিজিটাল, সাউথটেক লিমিটেড, ডাটাসফট, লিড সফট, নিউক্রিড, ব্রেইন স্টেশন ২৩ লিমিটেড, কাজ সফটওয়্যার লিমিটেড, রেভেসফট ইত্যাদিসহ বেশকিছু দেশি-বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে প্রযুক্তি সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

বিনিয়োগকারী
বাংলাদেশে বিনিয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগের অভাব হলে শিল্পের বিকাশ ঘটে না। প্রযুক্তি শিল্প বিকাশের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার বিনিয়োগ। সঠিকভাবে বিনিয়োগের মাধ্যমে হাই-টেক পার্কগুলোকে কাজে লাগানোই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। যেমন সিলিকন ভ্যালিতে অর্থ প্রচুর। যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করা ভেনচার মূলধনের ৪০ শতাংশের বেশি এই অঞ্চলে বিনিয়োগ করে কিন্তু এ কথাও সত্য শুধু টাকাই সফলতা আসে না। যদি তাই হতো তাহলে ব্যক্তিগত অথবা সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে সারা বিশ্বে অনেক প্রযুক্তি হাব দেখা যেত। অসংখ্য দেশ এখন পর্যন্ত স্থানীয় ইকোসিস্টেমে বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে যাচ্ছে কোনোরকমের দৃশ্যমান ফলাফল ছাড়াই। তারপরও বিনিয়োগকারীরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যখন তারা সঠিক মানসিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টি দিয়ে এগিয়ে আসে যেটি সিলিকন ভ্যালির ক্ষেত্রে দেখা যায়।

স্টার্টআপ অ্যাক্সিলারেটর
অ্যাক্সিলারেটর স্টার্টআপ কোম্পানিকে সিড ফান্ড, পরামর্শ প্রদান, ব্যবসার সাথে সংযোগ স্থাপন, প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহসহ বিভিন্ন সহযোগিতা করে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের উচ্চ চিন্তাভাবনা, উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, নির্বাহী, রাজনীতিবিদ এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ই সত্যিকার অর্থে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, গুগল দ্বারা পরিচালিত স্বায়ত্তশাসিত যানবাহনগুলোর জন্য বেশিরভাগ গবেষণা আসলে কার্নেগি মেলন এবং স্ট্যানফোর্ডের প্রফেসর ও পিএইচডিতে অধ্যয়নরত ছাত্রদের প্রজেক্টের মাধ্যম। আর এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেই বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রামের আওতায় ইনোভেশন হাব তৈরি করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রযুক্তিপ্রেমী ছাত্র ও শিক্ষকদের উদ্ভাবনী ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের উদ্ভাবনকে নাগরিক সেবায় নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও বিশ্ববিদালয়ের সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে প্রযুক্তির উন্নয়নে ও নতুন প্রযুক্তি তৈরিতে একত্রে কাজ করতে পারে। এ ধরনের সংস্কৃতি বা কমিউনিটি গড়ে ওঠার সময় হয়েছে। আমরা আশা করি বড় বড় কোম্পানিগুলো বেশি করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে এক সাথে কাজ করবে। এক্ষেত্রে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষেরও ভূমিকা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রযুক্তিগত গবেষণায় ব্যবহার করে তাদের উদ্ভাবনকে জাতীয় পর্যায়ে ব্যবহার করতে পারবে পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার সুযোগও বাড়বে।
লেখক : সিনিয়র প্রভাষক, সিএসই বিভাগ
রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা