প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট : মর্যাদার সুউচ্চ আসনে বাংলাদেশ

মেহেদী হাসান : বাংলাদেশ সময় ১১ মে দিবাগত রাত ২টা ১৪ মিনিটে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে নিয়ে মহাকাশের পথে উড়াল দেয় উৎক্ষেপণ যান ফ্যালকন-৯। এর সঙ্গে সঙ্গে সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে সচিত্র ছবিসহ যে সংবাদটি প্রচারিত হতে থাকে সে সংবাদটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৭ বছরের সাধনার সংবাদ। ‘মহাকাশে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে বাংলাদেশ’। বাঙালির স্বাধীনতা-সংগ্রামের স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। সেই স্লোগান বুকে নিয়েই মহাকাশের পথে উড়ল দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার স্থানীয় সময় ১২ মে বিকেল ৪টা ১৪ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ১১ মে দিবাগত রাত ২টা ১৪ মিনিট) স্পেসএক্সের লঞ্চিং স্টেশন থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’কে নিয়ে উৎক্ষেপণ যান ফ্যালকন-৯ মহাকাশের পথে উড়ে যায়।
পুরো উৎক্ষেপণ পর্বটি সরাসরি সম্প্রচার করে বাংলাদেশ টেলিভিশন। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলও উৎক্ষেপণ পর্বটি সরাসরি সম্প্রচার করে। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের ইউটিউব চ্যানেলেও উৎক্ষেপণ পর্ব সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। বিভিন্ন জেলা শহরে বড় পর্দায় সেটা প্রদর্শনেরও ব্যবস্থা করা হয়। তাই শুধু শহর নয়, উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে।
উৎক্ষেপণের প্রথম ১০ ঘণ্টার মধ্যেই (বাংলাদেশ সময় ১২ মে দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ) এ মহাকাশ যানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হয় গাজীপুরের ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের। আর তখন থেকেই এ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের মাধ্যমে মহাকাশে বিরাজমান বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রত্যক্ষ করতে ফ্লোরিডায় স্পেসএক্সের লঞ্চিং স্টেশনে উপস্থিত ছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, ডাক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ, বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদারসহ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া একটি প্রতিনিধি দল।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণের পরপরই দেশবাসীকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। উচ্ছ্বসিত সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ মহাকাশে বিচরণের গর্বিত অংশীদার হলো।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গায়ে লেখা আছে ‘জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান। এর আগে যখন তিনি ফ্রান্সে থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের কারখানা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন তখনই স্যাটেলাইটের গায়ে এ স্লোগানটি লিখে এসেছিলেন। সেই স্লোগান বুকে নিয়েই মহাকাশে ঠাঁই করে নিল দেশের প্রথম স্যাটেলাইট।
১১ মে দিবাগত রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের লঞ্চিং স্টেশন থেকে স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ সফলভাবে উৎক্ষেপণের পরপরই জাতির উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন এক যুগে প্রবেশ করলো। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট ক্লাবের গর্বিত সদস্য হলো।
বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে নির্যাতিত মা-বোনদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃত হবে। তিনি অনুধাবন করেছিলেন বহির্বিশ্বের সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ রক্ষা করতে না পারলে অগ্রগতি ও প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। এজন্য স্বাধীনতার মাত্র ৩ বছরের মাথায় ১৯৭৪ সালে তিনি রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় প্রথম ভূ-উপগ্রহ ভূকেন্দ্র স্থাপন করেন, যার সাহায্যে তথ্য-উপাত্ত আদান-প্রদানের মাধ্যমে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়। শেখ হাসিনা বলেন, আজ আমরা জাতির পিতার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আরেক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছি নিজস্ব উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে। তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে আজ যুক্ত হলো স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ। আজ থেকে আমরাও স্যাটেলাইট ক্লাবের গর্বিত সদস্য হলাম। প্রবেশ করলাম নতুন এক যুগে। বাংলাদেশের স্যাটেলাইট দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ছাড়াও এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে সেবা প্রদান করা যাবে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এই স্যাটেলাইট দিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাকস্তান এবং উজবেকিস্তানের অংশ বিশেষে সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীন বিটিআরসি থেকে প্রকল্প গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, বিটিআরসি, প্রকল্প এবং স্যাটেলাইট কোম্পানির কর্মীদের ধন্যবাদ জানান। এছাড়া নির্মাতা ও উৎক্ষেপণকারী উভয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের, এ কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও জনগণকেও ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি রাশিয়াকে ধন্যবাদ জানান তাদের কক্ষপথ বাংলাদেশকে ভাড়া দেয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য যেন পূরণ হয় সে জন্য দেশবাসীর দোয়াও চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পরিচালনায় নবগঠিত কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম স্বদেশ খবরকে জানান, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নিয়ে রওনা হওয়ার প্রথম দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্যালকন-৯ ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। প্রথম ১০ থেকে ১২ ঘণ্টায় অতিক্রম করে ৩৫ হাজার কিলোমিটার পথ। উৎক্ষেপণ যানটি ৩ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পর থেকেই গাজীপুরে ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র থেকে সেটির অবস্থান দেখা যেতে শুরু করে। এর পরপরই এই ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র থেকে পর্যবেক্ষণ কাজ শুরু হয়। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি কক্ষপথে পৌঁছতে সময় লাগবে ৮ থেকে ১০ দিন। তবে এটি পুরোপুরি কক্ষপথে স্থাপিত হয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার উপযোগী হতে সময় লাগবে অন্তত ২ মাস।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ২৪ ঘণ্টা আগে প্রথমবার স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের চেষ্টা করা হয়। তবে সে সময় একেবারে শেষ মুহূর্তে গিয়ে উৎক্ষেপণ স্থগিত করা হয়। এরপর বাংলাদেশ সময় ১১ মে দিবাগত রাত ২টা ১৪ মিনিটে দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ সফল হয়।
সে সময় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় নিজের ফেসবুক ওয়ালে লিখেন, যেহেতু এই ধরনের বিষয়ে কোনো ঝুঁকি নেয়া যায় না, সেহেতু উৎক্ষেপণের মোক্ষম সময়ের জন্য অপেক্ষা করা খুবই সাধারণ বিষয়, চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।
সজীব ওয়াজেদ জয় জানান, উৎক্ষেপণের শেষ মুহূর্তগুলো কম্পিউটার দ্বারা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। হিসাবে যদি একটুও এদিক-সেদিক পাওয়া যায়, তাহলে কম্পিউটার উৎক্ষেপণ থেকে বিরত থাকে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের ঠিক ৪২ সেকেন্ড আগে নিয়ন্ত্রণকারী কম্পিউটার উৎক্ষেপণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। স্পেসএক্স সবকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরের দিন একই সময়ে আবারও প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বহনকারী রকেটটি উৎক্ষেপণের চেষ্টা চালাবে।
সজীব ওয়াজেদ জয়ের আশার বাণী শোনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মহাকাশে সফলভাবে উৎক্ষেপণ হয় বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’। এই মাহেন্দ্রক্ষণের মধ্য দিয়েই বিশ্বসভায় মর্যাদার সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলাদেশ।

দুই.
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইটের মহাকাশ জয়ের মিশন শুরু হয়। ফ্লোরিডার কেপ কেনাভেরাল জন এফ কেনেডি থেকে যাত্রা শুরু করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। এটি উৎক্ষেপণের দায়িত্বে রয়েছে মার্কিন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। এর মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হয়েও বাংলাদেশ স্যাটেলাইট ক্লাবের সদস্য হিসেবে অনন্য এক মর্যাদা অর্জন করে; প্রবেশ করে তথ্যপ্রযুক্তির এক নতুন দিগন্তে। পুরো দেশবাসীর জন্য এ এক অনবদ্য অর্জন। এর ফলে পৃথিবী চলে আসছে আমাদের হাতের মুঠোয়; নতুন নতুন কর্মক্ষেত্রও বিকশিত হবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে নিজস্ব ব্রডকাস্টিং সেন্টার, যা টেলিযোগাযোগ খাতে অভূতপূর্ব উন্নতির সহায়ক। বিশ্বাঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বলতর হবে মহাকাশ জয়ের এ মিশনের মাধ্যমে।

সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে বর্তমানে বছরে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয় হচ্ছে এ খাতে। উপগ্রহটি স্থাপনের পর এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে ব্যয় করা থেকে রক্ষা পাবে দেশ। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোকে ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দিয়ে প্রায় সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য আগাম প্রদানেও ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। এর মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যাবে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা। এ ছাড়া টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-গবেষণা, ভিডিও কনফারেন্স, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগকালে জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অবদান রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। জানা গেছে, স্যাটেলাইটটির ৪০টি ট্রান্সপন্ডার ক্যাপাসিটি থাকবে। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ট্রান্সপন্ডারগুলো ভাড়া দেয়া হবে বিভিন্ন দেশকে। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ-পরবর্তী সময় ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দেয়া, বিপণন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ কমিউনিকেশন্স স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসসিএল)।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১) কৃত্রিম উপগ্রহটি একটি জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট। এটি ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। এর মাধ্যমে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে উন্নত কমিউনিকেশন্স এবং ব্রডকাস্টিং সার্ভিস দেয়া যাবে। এর প্লাটফর্ম স্পেস বাস-৪০০ বি২ এর প্রতিটি পাখায় ৩টি করে সৌর প্যানেল সন্নিবেশিত আছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর ন্যূনতম আয়ুষ্কাল ১৫ বছর।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা লাভ এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমুদ্র বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এবার আমাদের আকাশ জয়; যা আমাদের দেশবাসীর জন্য এক বিশাল অর্জন। তিনি বলেন, দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। এটি উৎক্ষেপণের ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক কম মূল্যে সম্প্রচার সেবা প্রদান, টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-গবেষণা, ভিডিও কনফারেন্স, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ অবস্থায় জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অবদান রাখবে। স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের ক্যাপাসিটির মধ্যে ২০টি বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ট্রান্সপন্ডারগুলো ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ হওয়ায় বাংলাদেশসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি দেশ টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা দিতে জিয়োসিক্রোনাস স্যাটেলাইট সিস্টেমের (৪০টি ট্র্যান্সপন্ডার, ২৬ কেইউ ব্যান্ড, ১৪ সি ব্যান্ড) গ্রাউন্ড সিস্টেমসহ সব ধরনের সেবা দেবে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর কভারেজ এরিয়াকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর একটিকে বলা হচ্ছে প্রাইমারি কভারেজ এরিয়া ও অন্যটি সেকেন্ডারি কভারেজ এরিয়া। অ্যান্টেনা বিম ও এলাকা অনুযায়ী প্রাথমিক কভারেজ এরিয়াকে আবার তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের পর্যবেক্ষণ, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। যার একটি গাজীপুর ও অন্যটি রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায়। এ দুটি ভূ-উপগ্রহকেন্দ্র নিজেদের মধ্যে সুরক্ষিত অপটিক্যাল ফাইবার দ্বারা সংযুক্ত। যেন যেকোনো কারিগরি সমস্যায় কোনো সেবা বন্ধ হয়ে না যায়। দুটি উপগ্রহ কেন্দ্রের মধ্যে গাজীপুর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হবে এবং বেতবুনিয়া বিকল্প পরিচালনা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
প্রধান ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র বিকল্পসহ একটি স্যাটেলাইট অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার (এসওসিসি) ও নেটওয়ার্ক অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার (এনওসিসি) স্থাপন করা হয়েছে। এবং বেতবুনিয়ায় একটি করে এসওসিসি ও এনওসিসি স্থাপন করা হয়েছে।
ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রগুলোতে কেইউ ব্যান্ডের জন্য একটি ৯ মিটার অ্যান্টেনা এবং ৪টি সম্প্রচার লাইন (বিকল্পসহ) রয়েছে এবং সি ব্যান্ডের জন্য একটি ৯ দশমিক ৩ মিটার অ্যান্টেনা এবং ২টি সম্প্রচার লাইন (বিকল্পসহ) রয়েছে। এছাড়া প্রধান ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র একটি ভিস্যাট হাব ও ক্যারিয়ার মনিটরিং সিস্টেম (সিএমএস) রয়েছে।

তিন.
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি নির্মাণ করেছে ফ্রান্সের থ্যালাস অ্যালেনিয়া নামে একটি প্রতিষ্ঠান। স্যাটেলাইটের কাঠামো তৈরি, উৎক্ষেপণ, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনার দায়িত্ব এ প্রতিষ্ঠানটির। ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি অরবিটাল স্লটে (নিরক্ষরেখায়) উড়বে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে ১৫ বছরের জন্য অরবিটাল স্লট বা নিরক্ষরেখা (১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব) লিজ নিয়েছে বাংলাদেশ। ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয়ে এ স্লট বরাদ্দ নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিক ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব স্পেস কমিউনিকেশনের মধ্যে চুক্তি হয়। ইন্টারস্পুটনিকের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি হলেও এ চুক্তি তিন ধাপে ৪৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) বাংলাদেশকে প্রথমে নিরক্ষরেখার ১০২ ডিগ্রি স্লট বরাদ্দ দেয়। কিন্তু প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ তাতে বাধা দেয়। দেশগুলোর আপত্তির মুখে বাংলাদেশ বিকল্প উপায় খুঁজতে থাকে। বিকল্প হিসেবে ৬৯ ডিগ্রিতে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের প্রস্তাব দেয়া হয় বাংলাদেশকে। কিন্তু বিকল্প প্রস্তাবেও আপত্তি তোলে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও চীন। সর্বশেষ ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রিতে (পূর্ব) স্লট বরাদ্দ পাওয়া যায়। এ স্লটটিও খালি ছিল না। স্লটটি ছিল ইন্টারস্পুটনিকের। কিন্তু অর্থের সংস্থান না হওয়ায় রাশিয়ার মহাকাশ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইন্টারস্পুটনিকের নিজস্ব দুটি স্লটের বিপরীতে (৮৪ ও ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি) একটি শর্তহীন চুক্তি করে বাংলাদেশ।
মার্কিন রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করেছে। নির্মাণ করেছে থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেস। গত ৩০ মার্চ একটি বিশেষ উড়োজাহাজে করে উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ পৌঁছে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালে কেনেডি স্পেস সেন্টারে স্পেসএক্সের লঞ্চ প্যাড থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নিয়ে মহাকাশের উদ্দেশে উড়ে যায় ফ্যালকন-৯ রকেট। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয় প্রায় ২ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেয়া হয় ১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা, বাকি ১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) বিডার্স ফিন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।
এই কৃত্রিম উপগ্রহটি উৎক্ষেপণের পর সেটি পরিচালনা, এর বিভিন্ন সুবিধার সফল ব্যবহার, বাণিজ্যিকভাবে এর ট্রান্সপন্ডার বাজারজাতকরণ ইত্যাদি কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য ইতোমধ্যে সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। কোম্পানিতে কারিগরি লোকবল নিয়োগ এবং লোকবলকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট ও ইত্যাদি সংস্থা বিদেশি স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। বহির্বিশ্বের বিভিন্ন স্যাটেলাইট অপারেটরের কাছ থেকে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপন্ডার ভাড়া বাবদ প্রতি বছর প্রায় ১৪ মিলিয়ন ইউএস ডলার ব্যয় করে থাকে। অনুমোদন পাওয়া আরও স্যাটেলাইট চ্যানেলের সম্প্রচার শুরু হলে এ ভাড়া আরও বাড়বে। শুধু ব্রডকাস্টিং চাহিদার পূরণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ হওয়ায় এ অর্থ দেশেই রাখা সম্ভব হবে। এখন এই অর্থ প্রতি বছর রাজস্ব হিসেবে আয় হবে।
উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পাঠানোর কাজটি বিদেশে হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায়, যা নিয়ন্ত্রণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনের যন্ত্রপাতি আমদানি করে কার্যক্রম শুরু করেছে বিটিআরসি। বিটিআরসির এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে বসে উন্নয়নশীল দেশ পেরিয়ে উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দীপ্ত পদক্ষেপে।