কলাম

র‌্যাবের গৌরবময় সাফল্যের রূপকথা

কর্নেল মো. আনোয়ার লতিফ খান, বিপিএম, পিএসসি
মানব সভ্যতার আত্মবিকাশের পর সময়ের পরিবর্তনে ও পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতি এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কারণে দেশে-বিদেশে অপরাধের ধরনে এসেছে আমূল পরিবর্তন। অপরাধের বহুমাত্রিক হিংস্র থাবায় বিশ্বব্যাপী আপামর জনসাধারণকে ক্ষত-বিক্ষত ও উদ্বিগ্ন করেছে। বিশেষ করে সন্ত্রাসী কর্মকা-ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেরও উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টির প্রয়াস নিয়েছিল। দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বে প্রতিটি দেশের জনগণ এবং সম্পদের নিরাপত্তায় বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নিজস্ব কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে।

পটভূমি
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অর্জিত লাখো শহীদের রক্তে ভেজা আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশ। সমৃদ্ধির পথে ধীরে ধীরে অগ্রসরমান আমাদের জাতি যখন উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করতে যাচ্ছে ঠিক তখনই কিছু পথভ্রষ্ট দুষ্টচক্রের কালো থাবায় জাতির এই অগ্রযাত্রা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ক্রমান্বয়ে দেশে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, জঙ্গিবাদের উত্থান, মাদকের অপব্যবহারের মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে থাকে। অপরাধীদের মোকাবিলায় প্রয়োজন হয় বিশেষ কোনো ব্যবস্থা যার মাধ্যমে চিরতরে তাদের মূলোৎপাটিত হবে। আর এ প্রয়োজনীয়তা থেকেই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশ্বমানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন বাহিনী র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব।

গঠন
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯ সংশোধন করে ‘দি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস (সংশোধিত) অ্যাক্ট ২০০৩, অনুসারে ২০০৪ সালে গঠন করা হয় এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব। শান্তি ও সম্প্রীতির স্বপ্নে ঘেরা নতুন এক বাংলাদেশের অšে¦ষায় শুরু হয় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড, বাংলাদেশ পুলিশ, আনসার ও বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক প্রশাসনের বাছাইকৃত চৌকস কর্মকর্তা ও অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে গঠিত নতুন এই বিশেষ বাহিনীর পথচলা।

র‌্যাবের গৌরবদীপ্ত সাফল্য
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অদ্যাবধি র‌্যাব আপামর জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। র‌্যাব কর্তৃক গৃহীত কার্যকর এই বহুমুখী পদক্ষেপের ফলে দেশে বর্তমানে যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে, তেমনি স্থিতিশীলতা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। র‌্যাব কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ এবং অর্জিত সাফল্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো :

ধর্মীয় জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলে র‌্যাবের ভূমিকা
বর্তমান বিশ্বে জঙ্গিবাদ একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। ’৯০-এর দশক থেকে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের গোড়াপত্তন হয়। পবিত্র ইসলাম ধর্মের মূলধারা, কোরআন ও হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা থেকে বিচ্যুত হয়ে উগ্র জঙ্গিবাদের উদ্ভব ঘটে। এই জঙ্গিবাদ মদদপুষ্টরা দেশে সাম্প্রদায়িকতা, সহিংসতা, অরাজকতা ও নাশকতামূলক কর্মকা-ের প্রসার ঘটিয়ে একটি অস্থিতিশীল ও নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতি তৈরির প্রয়াস নিয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে র‌্যাব জঙ্গি দমনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, যা সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছে। প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী র‌্যাব বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাসহ ১ হাজার ৬২৩ জন জঙ্গি গ্রেপ্তার করেছে। জঙ্গি দমনে বিগত সময়ের সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখে বর্তমান সময়েও র‌্যাব নিরবচ্ছিন্ন অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র, বোমা ও বিস্ফোরক দ্রব্য। বিগত ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁর প্রাথমিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও মূল অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্র প্রস্তুতকরণ এবং পরবর্তীতে সাভারের আশুলিয়া, মিরপুরের দারুস সালাম, তেজগাঁও, চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে, ঝিনাইদহ এবং সিলেটের আতিয়া মহলে সেনা অভিযান-পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে র‌্যাবের পেশাদারিত্ব দক্ষতা ও সাহসিকতা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। হলি আর্টিজান ঘটনা-পরবর্তী র‌্যাব বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ৪৪৩ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে র‌্যাবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বগুড়া, রংপুর, কুষ্টিয়াতে আত্মসমর্পণ করে ৭ জন বিপথগামী তরুণ। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হয়ে নিজেকে সমাজে সু-প্রতিষ্ঠিত করতে র‌্যাব তাদের প্রত্যেককে ৫ লক্ষ টাকা করে অনুদান প্রদান করে। এছাড়াও সাধারণ মানুষকে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে সম্পৃক্ত করতে হলি আর্টিজান হামলার ১১ দিনের মধ্যেই ‘রিপোর্ট টু র‌্যাব’ নামের একটি মোবাইল অ্যাপস চালু করে র‌্যাব। জঙ্গি দমনে র‌্যাব সাধারণ মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘কতিপয় বিষয়ে জঙ্গিবাদীদের অপব্যাখ্যা এবং পবিত্র কোরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা’ শীর্ষক পুস্তিকা প্রকাশ করেছে। জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণার অংশ হিসেবে লক্ষ লক্ষ লিফলেট প্রচার, বিলবোর্ড স্থাপনের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক নানা তৎপরতা চালিয়ে আসছে র‌্যাব। র‌্যাবের এই নিরন্তর অভিযান ও প্রচারণামূলক কার্যক্রমের ফলে জঙ্গি সংগঠনসমূহের সাংগঠনিক কাঠামো যেমন দুর্বল হয়ে পড়েছে তেমনি জঙ্গি তৎপরতা এখন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। র‌্যাবের এই সাফল্য দেশে ও বহির্বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

সুন্দরবন এলাকায় জলদস্যু
বনদস্যু দমন ও পুনর্বাসন
সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন এলাকায় জলদস্যু ও বনদস্যুদের আক্রমণের শিকার সুন্দরবন অঞ্চলের নিরীহ মৎস্য, কাঠ ও মধু সংগ্রহকারী দরিদ্র জনগোষ্ঠী। সুন্দরবন ও সমুদ্রসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনী ডাকাতি, খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা- করে থাকে, সেসব এলাকায় র‌্যাবের সাঁড়াশি অভিযানের ফলে যেমন ওই অঞ্চলে বনদস্যু ও জলদস্যুর অপতৎপরতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে তেমনি ধীরে ধীরে জনমনে শান্তির পরশ বিস্তার লাভ করছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অদ্যাবধি ২১২টি সাফল্যজনক অভিযানে ৪৫৪ জন জলদস্যু ও বনদস্যু গ্রেপ্তার, ১৫০৭টি অস্ত্র, ৩২,০৪৬ রাউন্ড গোলাবারুদ এবং ১৬৬টি অন্যান্য অস্ত্র উদ্ধার করেছে র‌্যাব। ২০১৫ সালে র‌্যাবের বনদস্যু ও জলদস্যুবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ পর্যন্ত ২০টি বাহিনীর ২১৭ জন বনদস্যু ও জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে। আত্মসমর্পণকৃত বনদস্যু ও জলদস্যুদের প্রত্যেককে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ১ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করার ফলে আত্মসমর্পণকারী বনদস্যু ও জলদস্যুদের স্বাবলম্বী করতে এক অনন্য ভূমিকা পালন করছে। এছাড়াও এক্সিম ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা, র‌্যাবের পক্ষ হতে ২০ হাজার টাকা, ১টি করে মোবাইল সেট ও অন্যান্য উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। বনদস্যু ও জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য কমে যাওয়ার ফলে ওই এলাকায় বর্তমানে একটি স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

মাদক নির্মূল ও মাদকের অপব্যবহার
এবং পাচাররোধে র‌্যাবের ভূমিকা
নেশাগ্রস্ত ও মাদকাসক্ত ব্যক্তি শুধু নিজেদের জীবনই ধ্বংস করে না; বরং পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও বিপর্যয় নিয়ে আসে। মাদকাসক্ততায় নৈতিকতার অবক্ষয় সৃষ্টি করে আইনশৃঙ্খলারও ভারসাম্য বিনষ্ট করে। মাদক মানুষকে চিত্তবিভ্রম, অস্থির ও উচ্ছৃঙ্খল করে তোলে। ইভটিজিং, নারী নির্যাতন ও নরহত্যার মতো অপরাধগুলোর বেশিরভাগই মাদকাসক্তির কুফল হিসেবে চিহ্নিত। এছাড়াও যানবাহন দুর্ঘটনা বেশিরভাগ মাদকাসক্ত চালকের কারণেই ঘটে থাকে। দেশের ভবিষ্যৎ বংশধর, জাতির আশা ও আকাক্সক্ষার উজ্জ্বল প্রদীপ তরুণ-তরুণীরা বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের ভয়াল দংশনে যখন জর্জরিত হচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তেই র‌্যাব কঠোর হস্তে মাদক নির্মূলে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গঠিত ত্রিমাত্রিক এই এলিট ফোর্স দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও গভীর অরণ্যসহ উত্তাল সমুদ্র-জলপথেও মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে প্রশংসিত হয়েছে। ফলে কর্মোদ্দীপনায় উদ্দীপ্ত র‌্যাবের চৌকস সদস্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অদ্যাবধি মাদক সংক্রান্ত অপরাধে ৬৮ হাজার ৩৫৭ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তারপূর্বক আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে হেরোইন ৫০১.৮৪১ কেজি, ফেন্সিডিল ৩০ লক্ষ ৭৫ হাজার ৩৯৮ বোতল, ইয়াবা ট্যাবলেট ২ কোটি ৫৪ লক্ষ ৩৯ হাজার ৯৪৬ পিস, বিদেশি মদ ১ লক্ষ ৬৬ হাজার ৩৮৫ বোতল, দেশি মদ ৪৩ লক্ষ ১৫ হাজার ৪৬৮ লিটার, গাঁজা ৭৬ হাজার ১৭৪ কেজি, বিয়ার ৩ লক্ষ ৮৬ হাজার ৫২৭ ক্যান, কোকেন ২৯.৭৯৯ কেজি, আফিম ৩৩.৭৭৯ কেজি, ভায়াগ্রা ট্যাবলেট ৭৬ লক্ষ ৫৮ হাজার ৯৪৪টি, আইসপিল ট্যাবলেট ৫ হাজার ৯২টি, নেশা জাতীয় ইনজেকশন ৩ লক্ষ ৯৬ হাজার ৯৪৫টি, সেনেগ্রা ট্যাবলেট ২ লক্ষ ৮০ হাজার ৬০৯টি উদ্ধারপূর্বক পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ
উদ্ধারে র‌্যাবের ভূমিকা
অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার র‌্যাবের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে র‌্যাব অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে সচেষ্ট ছিল। প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে এ পর্যন্ত র‌্যাব ১০ হাজার ৯১৭ জনকে অস্ত্রসংক্রান্ত বিষয়ে গ্রেপ্তার করেছে এবং উদ্ধার করেছে ১৪ হাজার ৭২৮টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, ২ লক্ষ ১৯ হাজার ৪৮০ রাউন্ড গোলাবারুদ, ২৬ হাজার ৬২৮টি ককটেল, বোমা ও গ্রেনেড এবং ৫ হাজার ৮৬০ কেজি বিস্ফোরক ও ৩৩৪টি ট্যাংক বিধ্বংসী উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক। র‌্যাবের এ কর্মদীপ্ত অভিযানের ফলে দেশে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে এবং জনজীবনে শান্তি ফিরে আসছে।

চরমপন্থি দমনে র‌্যাবের ভূমিকা
দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা তথা কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মেহেরপুর এলাকায় একসময় চরমপন্থিদের অপতৎপরতা ছিল। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, রাহাজানি, খুন লুটতরাজে অতিষ্ঠ ছিল সাধারণ জনগণ। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখে। র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয় চরমপন্থি দলের শীর্ষ নেতারা এবং উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ। ফলে এলাকার মানুষের মধ্যে ফিরে আসে শান্তির সুবাতাস ও স্বস্তির আবহ। নিরীহ জনগণকে চাঁদাবাজি আর লাল চিঠির দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত করার সাফল্য গাথা এখন এ অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে উচ্ছ্বসিত ও সূর্যের আলোর মত দেদীপ্যমান। ফলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এখন একটি শান্ত জনপদের নাম। যার ফলে এ অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে ফিরে এসেছে কর্মচাঞ্চল্য আর প্রাণের উচ্ছ্বাস। র‌্যাবের এ অবদান সত্যিই প্রশংসনীয় ও যুগোপযোগী।

তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার
র‌্যাবের অব্যাহত সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর অভিযানে সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতা রোধ করে তাদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। র‌্যাব বিগত ১৪ বছরে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ মোট ১ লক্ষ ৮৭ হাজার ৯৭ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তারপূর্বক আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ সংস্থা কর্তৃক সরকার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত শহীদ, পিচ্চি হান্নান, বড় জামাল, মুরগি মিলন, আব্দুল মমিন ওরফে লেংড়া মমিন, মাহবুব ওরফে সাইজ্যা মাহবুব প্রভৃতি ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীসহ চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যাপক অবদান রেখেছে। ফলশ্রুতিতে জনগণের মনে ফিরে এসেছে স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ।

চাঞ্চল্যকর হত্যা ও অপহরণ সংক্রান্ত ঘটনায় র‌্যাবের অর্জন
অপহরণ ও জিম্মি করে অর্থ আদায়ের ঘটনায় ভিকটিমদের উদ্ধার ও অপহরণকারীদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাব অনন্য সফলতা দেখিয়েছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতাকে কাজে লাগিয়ে র‌্যাবের চৌকস গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৪৯৫ জন অপহরণকারীকে গ্রেপ্তার এবং ১ হাজার ৪৮৬ জন ভিকটিমকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে র‌্যাব। বিগত সময়ের ন্যায় বর্তমানেও চাঞ্চল্যকর অপহরণ ও হত্যাকা-ের রহস্য উৎঘাটনে র‌্যাব সদা সচেষ্ট রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে অপহরণের ৫ ঘণ্টার মধ্যে অপহৃত শিশু উদ্ধার, কাকরাইলে মা-ছেলের হত্যাকারী মূল আসামি এবং রংপুরে আইনজীবী রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের হত্যাকারীদের শনাক্ত ও আটকের মাধ্যমে র‌্যাবের প্রতি জনগণের আস্থা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে।

মানব পাচার রোধ
সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সুনাম ও চাহিদার ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ জনশক্তি বিদেশে গমন করছে। তাদের কষ্টার্জিত আয় আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এ সুযোগে বাংলাদেশের এক শ্রেণির অসাধু দালালচক্র স্বল্প আয়ের মানুষদের প্রলোভন দেখিয়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের যোগসাজশে বিদেশে প্রেরণের নামে মানবপাচার করছে। এ ধরনের পাচারের শিকার সাধারণ জনগণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বনে জঙ্গলে কিংবা কোথাও কোথাও জিম্মি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। এদের অনেকেই নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে। এ চক্রটি প্রতারণার ফাঁদে ফেলে অনেক নারীকে বিদেশে পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশের অনেক নিরীহ লোকজন এরূপ প্রতারক চক্রের প্রতারণায় জায়গা-জমি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থিত এ ধরনের গর্হিত অপরাধের সাথে যুক্ত মানব পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনয়ন ও তাদের মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে র‌্যাব সর্বদা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। র‌্যাব অদ্যাবধি মানবপাচার রোধকল্পে ১৯১টি অভিযান পরিচালনা করে মানবপাচারকারী চক্রের ৫৭৭ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং ৭৯০ জন ভিকটিমকে উদ্ধার করেছে।

ভেজালবিরোধী অভিযানে র‌্যাবের ভূমিকা
ভেজাল খাদ্য, পানীয় ও ওষুধের বিরুদ্ধে র‌্যাব ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে যুগোপযোগী ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিচ্ছে। অদ্যাবধি খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য পণ্যের ভেজাল সংক্রান্ত অপরাধে র‌্যাবের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১১ হাজার ৯৫৮টি মামলায় ১২২ কোটি ৯ লক্ষ ৩৯ হাজার ৬০৭ টাকা জরিমানা ও ১০ হাজার ৮৩০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- প্রদান করা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে র‌্যাবের এ পথচলা আনন্দের, গৌরবের ও প্রশংসার, যা টেকসই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের গ্রেপ্তার
সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি গুরুতর অপরাধ জেনেও এক শ্রেণির অসাধু চক্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে এসএসসি-দাখিল ও এইচএসসি-আলিম এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা যেমন সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সুকৌশলে ফাঁস করে চাকরিপ্রার্থী, ছাত্রছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে শর্ত সাপেক্ষে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এরূপ চরম সংকটপূর্ণ অবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের বিরুদ্ধে র‌্যাব সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করে। ফলে ২০১৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী চক্রের ১০৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব, যা সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

অন্যান্য ক্ষেত্রে র‌্যাবের সাফল্য
র‌্যাব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান উদযাপনে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণের সফরকালীন সময়ে ও আন্তর্জাতিক সভা-সমাবেশ এবং ক্রীড়া অনুষ্ঠানের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব অত্যন্ত সুন্দর ও সুচারুভাবে পালন করে আসছে, যা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

শেষ কথা
র‌্যাব-এর প্রতিটি সদস্য একটি সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তথা সাধারণ জনগণের মাঝে স্বস্তির পরিবেশ বজায় রাখতে র‌্যাবের অকুতোভয় সদস্যরা সততা, নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা, আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার সাথে দেশপ্রেম বুকে নিয়ে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ফলে জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি সাধিত হয়েছে ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা বৃদ্ধি পেয়েছে।
লেখক : অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস.)
র‌্যাব ফোর্সেস