প্রতিবেদন

র‌্যাবের ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশাবাদ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের ন্যায় মাদক নির্মূলেও র‌্যাব কার্যকর ভূমিকা রাখবে

বিশেষ প্রতিবেদক
এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাবের ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে। ২০০৪ সালে এই বাহিনীটি গঠনের পর থেকে অদ্যাবধি দেশ ও জাতির কল্যাণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে র‌্যাব। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলে এই বাহিনী অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাহিনীটির ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলের ন্যায় মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে ছেলে-মেয়েদের রক্ষায় দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যেতে র‌্যাব সদস্যদের প্রতি নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি র‌্যাব সদস্যদের অনুরোধ করবো, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তারা যেমন সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে তেমনি এখন মাদকের বিরুদ্ধেও এই অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩ মে কুর্মিটোলা র‌্যাব সদর দপ্তরে র‌্যাবের ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাদক যারা তৈরি করে, যারা বিক্রি করে, যারা পরিবহন করে এবং যারা সেবন করে সকলেই সমানভাবে দোষী। এটাই মাথায় রাখতে হবে এবং সেভাবেই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’ ‘মাদকবিরোধী অভিযানে র‌্যাব ইতোমধ্যে যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছে। আর আমাদের ছেলে-মেয়েরা যাতে এর ছোবল থেকে
দূরে থাকতে পারে তার প্রয়োজনীয়
ব্যবস্থা নিতে হবে।’
এ ব্যাপারে বিশেষভাবে ভূমিকা পালনের জন্য তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে বড় বড় অভিযানে র‌্যাবের সাফল্যের জন্য র‌্যাব সদস্যদের ধন্যবাদ জানান এবং এই অভিযান অব্যাহত রাখারও নির্দেশ দেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক ও র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। সন্ত্রাস, জঙ্গিদমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ, অপহরণ এবং জাল-জালিয়াতিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় র‌্যাবের বিভিন্ন ভূমিকা সম্পর্কে এবং সুন্দরবনে র‌্যাবের অভিযানে ২০টি জলদস্যু বাহিনীর ২১৭ জন সদস্যের আত্মসমর্পণ এবং তাদের সাধারণ জীবনে পুনর্বাসন সম্পর্কিত অনুষ্ঠানে পৃথক দুটি ভিডিওচিত্র পরিবেশিত হয়। মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনী প্রধান, মহাপুলিশ পরিদর্শক, মহাপরিচালক বিজিবি, সরকারের ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, র‌্যাব ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ র‌্যাবের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও সদস্যবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছলে র‌্যাবের একটি সুসজ্জিত বাহিনী প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী উত্তরা আশকোনা এলাকায় ৮ দশমিক ৫৬ একর জমির ওপর অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত র‌্যাব সদর দপ্তর কমপ্লেক্স নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী শহীদ র‌্যাব সদস্যদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে র‌্যাব সদর দপ্তরে শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ ‘প্রেরণা ধারা’র উদ্বোধন করেন।
র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে হাস্যোজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমন, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, চরমপন্থি দমন এবং ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনাসহ সকল ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে র‌্যাব অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। র‌্যাব দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সকলের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পবিত্র ইসলাম ধর্মের মূলধারা কোরআন ও হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা থেকে বিচ্যুতির কারণে উগ্র জঙ্গিবাদের উদ্ভব হয়েছে। এই জঙ্গিবাদীরা সাম্প্রদায়িকতা, সহিংসতা, অরাজকতা ও নাশকতামূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল ও নিরাপত্তাহীন করে তোলার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। তবে র‌্যাব জঙ্গি দমনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে, যা সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী তাঁর সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির পুনরুল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ হবে একটি শান্তির দেশ এবং আমরা কখনই জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেব না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম কিন্তু আমরা দেখেছি এই ধর্মের নাম করে কিছু মানুষকে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। এমনকি আমাদের ভালো ঘরের উচ্চশিক্ষিত কোমলমতি ছেলে-মেয়েরাও এই বিভ্রান্তির বেড়াজালে পড়ে যায়। মানুষ মারলে বেহশতে যাওয়া যাবে এই বিভ্রান্তিতে পড়ে তারা দেশে যে অস্থিতিশীলতা এবং অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল তার বিরুদ্ধে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং র‌্যাব বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখতে হবে যেন বাংলাদেশকে কেউ সন্ত্রাসী এবং জঙ্গির দেশ বলে অপবাদ দিতে না পারে, বাংলাদেশের মানুষ যেন শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারে এবং যাতে আমরা আমাদের দেশকে কাক্সিক্ষত উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে পারি।
জঙ্গিবাদকে একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা-পরবর্তী ১০ ঘণ্টার মধ্যেই জিম্মি নাটকের অবসান এবং পরবর্তীতে এই হামলায় জড়িতদের এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী হামলার পূর্ব প্রস্তুতিকালে জঙ্গিদের গ্রেপ্তারের জন্য র‌্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। একইসাথে তিনি জঙ্গি দমনে সমাজের সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে তাঁর প্রচেষ্টার কথাও উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেকের পুত্র বা পোষ্য কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কী করে, তা লক্ষ্য রাখার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেউ দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকছে কি না তার প্রতি লক্ষ্য রাখথে সংশ্লিষ্ট অভিভাবক এবং শিক্ষকদের প্রতি পুনরায় আহ্বান জানান। সুন্দরবনে জলদস্যু দমনে র‌্যাবের ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত ২১৭ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে, যারা বর্তমানে পুনর্বাসিত হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবন অঞ্চলে এখনও যারা দস্যুতার সঙ্গে জড়িত তাদের সুস্থ জীবনে ফিরে আসার জন্য সরকার ঘোষিত আত্মমসমর্পণের সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘এই কথাটা সকলের কাছে আমি পৌঁছে দিতে চাইÑ সুস্থভাবে সবাই জীবনযাপন করুন এবং সুন্দরভাবে বাঁচুন। নিজের সংসার, নিজের পরিবার, নিজের সন্তানÑ তারাও যেন সমাজে সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারে এজন্য আরো যারা এই জলদস্যুতার সাথে বা দস্যুতার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে তাদেরকে অবশ্যই আমরা জীবন-জীবিকার পথ এবং সুস্থভাবে বাঁচার সুযোগ করে দেব।’
প্রধানমন্ত্রী র‌্যাবের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেন, দেশীয় অসাধু ব্যবসায়ীর পাশাপাশি বিদেশি চোরাকারবারি, জাল মুদ্রা ও পাসপোর্ট প্রস্তুতকারী এবং অবৈধ ভিওআইপিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বৃদ্ধিতে এবং বিভিন্ন পালা-পার্বণ-উৎসব এবং ভিআইপি, ভিভিআইপি নিরাপত্তার দায়িত্বেও র‌্যাব অবদান রাখছে। এছাড়া র‌্যাব জননিরাপত্তায় হুমকি ও আতঙ্ক সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, র‌্যাব নকল ও ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে। এই অভিযানও অব্যাহত রাখতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে পাবলিক পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নানামুখী পদক্ষেপের পাশাপাশি র‌্যাবের ভূমিকাও প্রশংসার দাবি রাখে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, র‌্যাবের উপস্থিতিই সেখানে এ ধরনের দুষ্কৃতকারীদের কাছে একটি অশনি বার্তা হিসেবে কাজ করে।
র‌্যাবকে একটি অত্যাধুনিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে বলেন, র‌্যাবের দক্ষতা ও জনবল বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ২টি ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১টিসহ মোট ৩টি নতুন ব্যাটালিয়ন গঠন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে পদ্মাসেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করে নিজস্ব অর্থায়নে এর নির্মাণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এই অর্জনকে অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অর্জনকে ধরে রাখতে হলে আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরো উন্নত করতে হবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই ধারা অব্যাহত রেখে ২০২১ সালের মধ্যে আমরা যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবো তখন বাংলাদেশ হবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত মধ্যম আয়ের দেশ।
ভাষণের এই পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এখানেই থেমে যেতে চাই না, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ যেন উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয়- অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে উন্নত দেশ হবে বাংলাদেশ। এর পাশাপাশি জাতিসংঘ নির্ধারিত সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল-এসডিজির স্থায়ী উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং ১০ বছর মেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা রূপায়ণের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট সময়ে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছি। আমরা ইতোমধ্যে আমাদের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে কেমন বাংলাদেশ হিসেবে দেখতে চাই, সেই পরিকল্পনাও আমরা এখন থেকেই তৈরি করছি।
‘বাংলাদেশ আমার অহংকার’ র‌্যাবের এই মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে কাজ করতে র‌্যাবসহ সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ আমার প্রিয় দেশ। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে এদেশ আমরা অর্জন করেছি, এদেশ আমার অহংকার।
প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়তে চাই। আর সেই বাংলাদেশ গড়তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যগণ, যারা জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করেন এবং জনগণের পাশে দাঁড়ান।