প্রতিবেদন

সারাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যু আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ॥ বাঁচতে জরুরি পরামর্শ

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে বজ্রপাত ও বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গত ১ মে তারিখে দেয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, এ বছর মার্চ ও এপ্রিলে মোট ৭০ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন। আর ৩০ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত সারাদেশে মারা গেছেন ১০৬ জনের বেশি। মে মাসের প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত এক দশক ধরে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা ক্রমান্বয়ে বাড়ার পেছনে বিশেষজ্ঞরা মোবাইল ফোনের টাওয়ার এবং খোলা স্থানে মানুষের মোবাইল ফোনে কথা বলাকে দায়ী করেছেন।
পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে উল্লেখযোগ্যহারে বজ্রপাত হলেও বজ্রাঘাতে প্রাণহানি বাংলাদেশের তুলনায় অতি নগণ্য। আমেরিকায় প্রতি বছর প্রায় ২৫ মিলিয়ন বজ্রপাত হলেও গড়ে মাত্র ৫০ জন নিহত ও ১০০ জনের মতো মানুষ আহত হয়। জাপানে প্রতি বছর ১০ লাখের বেশি বজ্রপাত হলেও গড়ে ৩ জনের বেশি মানুষ মারা যায় না। পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা ভেনিজুয়েলার মারাকাইবো লেকে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ২৫০টি বজ্রপাত হয়। অথচ বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২০১১ সালে ৯৭৮টি, ২০১২ সালে ১২১০টি, ২০১৩ সালে ১৪১৫টি, ২০১৪ সালে ৯৫১টি ও ২০১৫ সালে ১২১৮টি বজ্রপাত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাত বাড়ার জন্য নানা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা বাড়ার জন্য মোবাইল ফোনের টাওয়ারকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হচ্ছে। কারণ দেশের ৬-৭টি মোবাইল কোম্পানি গত কয়েক বছরে পাল্লা দিয়ে সারাদেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করেছে। এই মোবাইল টাওয়ার বজ্রবিদ্যুৎকে আকর্ষণ করে ভূমির দিকে টেনে এনে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২০১৬ সালের ১৭ মে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর আগ পর্যন্ত বজ্রপাতের বিষয়টি উপেক্ষিতই ছিল এবং সঙ্গতকারণেই বজ্রপাতে মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান কোনো সংস্থা বা সরকারের কোনো বিভাগ সংরক্ষণ করেনি। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী ২০১০ হতে ২০১৭ পর্যন্ত যথাক্রমে ১২৪, ১৭৯, ৩০১, ২৮৫, ২১০, ২৭৪, ৩৫১ এবং ২৬২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বজ্রাঘাতে। বিগত ৮ বছরে বজ্রাঘাতে সর্বমোট ১৯৮৬টি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। যেখানে ২০১০ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ৫ বছরে মৃতের সংখ্যা ছিল ১০৯৯টি, সেখানে পরবর্তী ৩ বছরেই (২০১৫-২০১৭) মৃত্যুসংখ্যা ৮৮৭টিতে পৌঁছেছে। জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আরও দেখা যায়, ২০১০ হতে ২০১৭ পর্যন্ত বজ্রাঘাতে মোট মৃত্যুর ৩২ শতাংশ ঘটেছে শুধু ‘মে’ মাসে এবং এই মাসে বজ্রপাতে আহত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ২৭৩। এই দীর্ঘ মৃত্যুসারিতে ‘মে’ মাসের একইদিনে প্রাণহানি ঘটেছে অনেক বজ্রাঘাতপ্রাপ্ত মানুষের। তন্মধ্যে ২০১০ সালের ১৭ মে ৭ জন, ২০১১ সালের ২২-২৩ মে ৪৫ জন, ২০১২ সালের ২ মে ১৪ জন, ২০১৩ সালের ৫-৬ মে ৩২ জন, ২০১৪ সালের ৩০ মে ৮ জন, ২০১৫ সালের ১৬-১৭ মে ৩৩ জন, ২০১৬ সালের ১১-১২ মে ৫৭ জন এবং ২০১৭ সালের ৯ মে ২১ জনের মৃত্যু বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ বছরের এপ্রিলের শেষ ২ দিনে বজ্রপাতে ৩২ জন মানুষের মৃত্যুসহ ১০ জন আহত হয় এবং শুধু মে মাসের ১২ তারিখে সারাদেশে প্রায় ২৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল টাওয়ার ও মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা যত বাড়ছে, বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যাও তত বাড়ছে। বজ্রপাতে এই মৃত্যুর মিছিল থামানোর জন্য বিশেষজ্ঞরা মোবাইল টাওয়ারের সংখ্যা কমিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছেন। তারা বলেছেন, এক এলাকায় প্রতিটি কোম্পানির পৃথক মোবাইল টাওয়ার না রেখে সব কোম্পানি মিলে একটি টাওয়ার স্থাপন করলে বজ্রপাতের আশঙ্কা অনেক কমে যায় আবার ভূমির ব্যবহারও হ্রাস পায়।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল
ডিফেন্স অধিদপ্তরের জরুরি নির্দেশনা অনুযায়ী বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে করণীয়

১. বজ্রপাতের ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির ধাতব রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না।
২. প্রতিটি বিল্ডিংয়ে বজ্র নিরোধক স্থাপন নিশ্চিত করুন।
৩. খোলাস্থানে অনেকে একত্রে থাকাকালীন বজ্রপাত শুরু হলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে দূরে সরে যান।
৪. কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে যান।
৫. খোলা জায়গায় কোনো বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেয়া যাবে না। গাছ থেকে ৪ মিটার দূরে থাকতে হবে।
৬. ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তার থেকে দূরে থাকতে হবে। বৈদ্যুতিক তারের নিচ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে।
৭. ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগগুলো লাইন থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে।
৮. বজ্রপাতে আহতদের বৈদ্যুতিক শকের মতো করেই চিকিৎসা দিতে হবে।
৯. এপ্রিল-জুন মাসে বজ্রপাত বেশি হয়। এই সময়ে আকাশে মেঘ দেখা গেলে ঘরে অবস্থান করুন।
১০. যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন।
১১. বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি বা বারান্দায় থাকবেন না এবং ঘরের ভেতরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকুন।
১২. ঘন-কালো মেঘ দেখা গেলে অতি জরুরি প্রয়োজনে রাবারের জুতা পরে বাইরে বের হতে পারেন।
১৩. উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার, ধাতব খুঁটি ও মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকুন।
১৪. বজ্রপাতের সময় জরুরি প্রয়োজনে প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করুন।
১৫. বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা, মাঠ বা উঁচু স্থানে থাকবেন না।
১৬. কালো মেঘ দেখা দিলে নদী, পুকুর, ডোবা, জলাশয় থেকে দূরে থাকুন।
১৭. বজ্রপাতের সময় শিশুদের খোলা মাঠে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখুন এবং নিজেরাও বিরত থাকুন।
১৮. বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে থাকলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়–ন।
১৯. বজ্রপাতের সময় গাড়ির মধ্যে অবস্থান করলে, গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ ঘটাবেন না। সম্ভব হলে গাড়িটিকে নিয়ে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন।
২০. বজ্রপাতের সময় মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করুন।