আন্তর্জাতিক

আবার মুখোমুখি উত্তর কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র : শান্তি প্রক্রিয়া কী ভেস্তে যাবে!

স্বদেশ খবর ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক টুইট বার্তায় উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার বহুল কাক্সিক্ষত বৈঠকটি এক খোঁচায় বাতিল করে দিয়েছেন। ২৪ মে এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউজ জানায়, উত্তর কোরিয়া নিজেদের সর্বশেষ বিবৃতিতে ‘ভীষণ ক্রোধ ও বৈরী মনোভাব’ দেখানোর কারণে ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আগামী ১২ জুন সিঙ্গাপুরে ঐতিহাসিক বৈঠকটি হওয়ার কথা ছিল। বৈঠকটি হলে তা হতো গত কয়েক দশকের মধ্যে দুই দেশের শীর্ষ নেতার প্রথম সাক্ষাৎ। কিন্তু মে মাসজুড়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের বাকযুদ্ধে বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ২৪ মে যার চূড়ান্ত পরিণতি টানেন খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প। উনের উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি সেখানে (সিঙ্গাপুরে) আপনার সঙ্গে বৈঠকে বসার জন্য খুবই উদগ্রীব ছিলাম। কিন্তু আপনার সর্বশেষ বিবৃতিতে যে ক্রোধ ও শত্র“তা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে, এই মুহূর্তে দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত বৈঠকটি করা যথাযথ হবে না।’ ট্রাম্প আরো বলেন, ‘আপনি আপনার পরমাণু অস্ত্রের সক্ষমতার কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের এত বিপুল পরিমাণ শক্তিশালী পরমাণু অস্ত্র আছে যে আমি স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি, এগুলো যেন কখনো ব্যবহার করতে না হয়।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘পুরো বিশ্ব, বিশেষ করে উত্তর কোরিয়া একটা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও অপার সমৃদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ হারাল। এটি সত্যিকার অর্থে ইতিহাসের দুঃখজনক একটা মুহূর্ত।’ ট্রাম্প তার চিঠি শেষ করেন এই বলে যে, কখনো মনোভাবে পরিবর্তন এলে উন যেন তাকে ফোন করেন।
যেসব বিষয়কে কেন্দ্র করে বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, সেগুলোর একটি হলো ‘লিবিয়া মডেল’। কয়েক দিন আগে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেন, উত্তর কোরিয়ার ওপর এই মডেল প্রয়োগ হতে পারে। মূলত তার এ বক্তব্যের পর প্রথমবারের মতো বৈঠক থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকি দেয় উত্তর কোরিয়া। তখন ট্রাম্প বলেন, চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে উনের পরিণতি হবে লিবিয়ার ক্ষমতাচ্যুত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো।
উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার শর্তে পশ্চিমা বিশ্বকে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি দেন। এর ৮ বছর পর পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহীদের হাতে মৃত্যু হয় গাদ্দাফির।
সর্বশেষ গত ১৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও আকার-ইঙ্গিতে ‘লিবিয়া মডেল-এর কথাই তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উন ১২ জুনের বৈঠক নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো ধরনের খেলা খেললে তা হবে ‘মস্ত বড় ভুল’। ট্রাম্পের কথা পুনর্ব্যক্ত করে পেন্স বলেন, ‘বৈঠকে কোনো চুক্তি না হলে উনকে গাদ্দাফির মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে।’
এদিকে পেন্সের এ বক্তব্যকে ‘মূর্খতা ও অজ্ঞতা’ বলে মন্তব্য করেন উত্তর কোরিয়ার সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী চোয়ে সোন হুই।
ট্রাম্প-কিম বৈঠক বাতিল হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া যে আবার মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেল, তা সহজেই বলা যায়। কিন্তু যে বিষয়টি এখনই বলা যাচ্ছে না সেটি হলো বৈঠক বাতিল হওয়ায় বিশ্বজুড়ে পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কার পারদ কতটা উচ্চতায় উঠল।
গত বছর (২০১৭) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, উত্তর কোরিয়ার হুমকি এমনভাবে মোকাবিলা করা হবে যা বিশ্ব এর আগে কখনো দেখেনি। ট্রাম্প কী এখন উত্তর কোরিয়ার ওপর সেই হামলাটিই করবে, যা বিশ্ব এর আগে দেখেনি। সে সময় উত্তর কোরিয়াও হুমকি দিয়েছিল, তারা প্রশান্ত মহাসাগরের মার্কিন দ্বীপ গুয়ামে পরমাণু হামলা চালাবে, যেখানে প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার মানুষ বসবাস করে।
সে সময় পুরো বিষয়টি উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্র আর তার মিত্রদের। আর সমর বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন একটি পুরাদস্তুর যুদ্ধ বেধে যাবার আশঙ্কা নিয়ে। বিশ্বের সামনে কতটা বিপদ অপেক্ষা করছে তা নিয়েও সমর বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তবে সে সময় কিছু সমর বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, এ নিয়ে এখনই ততটা আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। তারা এ বিষয়ে কিছু যুক্তিও তুলে ধরেছেন। যুক্তিগুলো হলো : ১. কোনো পক্ষই যুদ্ধ চাইছে না। কারণ কোরিয়া উপদ্বীপে একটি যুদ্ধ কারো জন্যই কোনো সুবিধা আনবে না। উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতাসীনদের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে ক্ষমতায় টিকে থাকা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি যুদ্ধ বেধে গেলে ক্ষমতার আসন নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
২. মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে যেভাবে হুমকি দিয়েছেন, সেটা একজন প্রেসিডেন্টের জন্য ব্যতিক্রম। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র পুরোদমে যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। সে সময় মার্কিন একজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছিলেন, উত্তেজক কথাবার্তা বাড়ছে মানে এই নয় যে, আমাদের অবস্থানও বদলাচ্ছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, উত্তর কোরিয়ার দুই দফা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর, জাতিসংঘের মাধ্যমে অবরোধ আরোপের সেই পুরনো পথেই হেঁটেছে যুক্তরাষ্ট্র।
৩. উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় মিত্র প্রতিবেশী চীন। অনেক কিছুর জন্যই দেশটি চীনের ওপর নির্ভরশীল। তাই বড় কোনো যুদ্ধে জড়াতে হলে চীনের মনোভাব বিবেচনা করতে হবে উত্তর কোরিয়াকে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন ঐতিহাসিকভাবে উত্তর কোরিয়াকে বাঁচিয়ে রেখেছে। চীন কোনোভাবেই চায় না উত্তর কোরিয়া ধ্বংস হয়ে যাক। তাহলে এমন একটি সংযুক্ত, অবিভক্ত কোরিয়া সৃষ্টি হবে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা একেবারে চীনের সীমানায় চলে আসবে। আবার উত্তর কোরিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত হলে কোটি কোটি মানুষ এসে চীনে আশ্রয় নেবে। তখন একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হবে। চীন সেটি চায় না বলে তারাও এ অঞ্চলে যুদ্ধের পরিবর্তে স্থিতিশীলতা দেখতে চায়।
অথচ ট্রাম্প-কিম বৈঠক বাতিল হওয়ায় ২০১৭ সালের অবস্থাই বিরাজমান ২০১৮ সালের মে’তে। বৈঠক বাতিল হওয়ায় এখন ট্রাম্প-কিমের কথার ফুলঝুরি দেখবে বিশ্ব। তবে আশার কথা হলো ২০১৭ সালের মতোই সব কিছু হম্বিতম্বির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজেদের স্বার্থে এখনই কোনো যুদ্ধে জড়াবে না বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞ মহল।