রাজনীতি

জাতীয় নির্বাচন : বিএনপিকে হিসাবে রেখেই মাঠ গোছাচ্ছে আওয়ামী লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার টানা দুই মেয়াদে গত প্রায় সাড়ে ৯ বছরে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে বিদ্যুতের ঘাটতি দূর হয়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে, শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন এসেছে, মানুষের মাথাপিছু আয় এবং গড় আয়ু বেড়েছে, বেকার সমস্যা সহনীয় পর্যায়ে এসেছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে এবং সর্বোপরি মানুষ উন্নত জীবন ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখছে। এর বিপরীতে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সাজা ভোগ করছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। পেট্রলবোমা দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো সন্ত্রাসী কর্মকা-ের অভিযোগও আছে দলটির বিরুদ্ধে। তবু স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা বিপুলসংখ্যক ভোট পাচ্ছেন। এ নিয়ে চিন্তিত ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা। সর্বশেষ খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর লক্ষাধিক ভোট প্রাপ্তি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ১৬ মে গণভবনে ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের এক বৈঠকে তিনি তাঁর মনোভাব প্রকাশ করেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির বিপুল ভোটপ্রাপ্তির কারণ মূল্যায়নের পরামর্শ দেন ১৪ দলের নেতাদের।
১৪ দলের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মূলত বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে ১৬ মে গণভবনে ওই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। রাত সাড়ে ১০টার কিছু পর পর্যন্ত বৈঠক চলে। সমসাময়িক নানা বিষয়েও আলোচনা হয় সেখানে। একপর্যায়ে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফল তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের সবাইকে একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীকে পরাজিত করতে হবে। এই দেখেন, দেশের এত উন্নয়ন হলো, এরপরও মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। ওদের প্রার্থী এক লাখের ওপরে ভোট পেয়েছে। আপনারা শুধু প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে না থেকে যার যার অবস্থান থেকে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- প্রচার করেন। আমাদের দলের নেতাকর্মীদের কোনো নেতিবাচক কর্মকা- থাকলে সেগুলো লিখে রাখেন, আমাদের জানান।’ সূত্র মতে, বৈঠকে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, উন্নয়ন যথেষ্ট হয়েছে। এরপরও কেন বিএনপি এত ভোট পাচ্ছে সেটা মূল্যায়ন করা দরকার। সম্মিলিতভাবে আগামী নির্বাচনে লড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি ১৪ দলের শরিকদের মূল্যায়ন করার তাগিদ দেন। ন্যাপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। প্রশাসনের সেবার মান বাড়াতে হবে। প্রশাসনের সেবার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তুষ্টি আছে। জানা গেছে, বিএনপির বিপুল ভোট পাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের দুশ্চিন্তা রয়েছে। বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তব্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে। কিভাবে এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো যায় সে বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উঠে আসে উন্নয়ন কর্মকা-ের প্রচারবিমুখতার বিষয়টি। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় বিএনপিকে হিসাবে রেখে নির্বাচনি মাঠ গোছাতে হবে এবং মাঠ গোছানোর প্রথম প্রক্রিয়া হিসেবে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- প্রচারের জন্য প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে রাজনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সরকারের উন্নয়নধর্মী কাজের প্রচার চালাতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলেই কেবল সাধারণ মানুষ কিছু পায়, দেশের উন্নয়ন হয়।
বিএনপির প্রার্থীরা কেন বিপুল ভোট পাচ্ছেন এবং ভোট বাড়াতে সরকারের করণীয় বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, ‘বিএনপির বিপুল ভোট পাওয়ার বড় দুটি কারণ হলোÑ সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- তৃণমূলে তেমনভাবে প্রচার হয় না। আর আওয়ামী লীগের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের নানা নেতিবাচক কাজ মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে রেখেছে।’
একজন আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, সাধারণ মানুষ কমপক্ষে তিনটি জিনিস চায়। প্রথমত, সুশাসন ও জবাবদিহি। শুধু কেন্দ্রে নয়, যেখান থেকে মানুষ সরকারি সেবা পায় সেখানে একটা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি থাকা জরুরি। সরকার বিভিন্ন সেবা অনলাইনকেন্দ্রিক করে পরিস্থিতি উন্নয়নের চেষ্টা করছে। তবে তা এখনো যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি দূর করা। বিভিন্ন অফিস-আদালতে দুর্নীতিবাজদের দাপট রয়েছে। এগুলো দূর করতে হবে। তৃতীয়ত, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষে মানুষে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে। ফলে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।’
জাসদের সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পক্ষের সব ভোট বিএনপির ঘরে যাচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপির আমলে শুরু হওয়া লুণ্ঠন এখনো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেনি। ন্যায়বিচার ও সুশাসনের অভাব আছে। মানুষের মন জয় করার জন্য যে ধরনের কর্মকা- দরকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তা পারেনি। ফলে জনগণের সন্তুষ্টি সেভাবে আসেনি। আর তৃণমূলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল একটা বড় সমস্যা।’
শিরীন আখতার বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সরকার থাকবে নাকি স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতায় থাকবে সেই ফয়সালা করার দিকে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ ছাড়া মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া, শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ রাখা, মানুষের জন্য অসহনীয় হয় এমন পরিস্থিতি তৈরি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।’
দিলীপ বড়–য়া বলেন, টানা ক্ষমতায় থাকলে সরকারের প্রতি মানুষের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠে। এ কারণে অনেকে বিরোধী পক্ষকে ভোট দেয়। আর বর্তমানে দেশে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী একটি বড় অবস্থান নিয়ে আছে। এদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার জন্য শাসক দলের জনগণের সঙ্গে যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার তারা তা পারছে না। তৃণমূল পর্যায়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এখনো চলছে। বিভিন্ন অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। ফলে তারা সরকারের উন্নয়ন ও ইতিবাচক কর্মকা-কে প্রাধান্য দিচ্ছে না।
জানা গেছে, ১৪ দলীয় নেতাদের বৈঠকে যেসব আলোচনা উঠে আসে, সেগুলো উত্তরণে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশনা দেন। নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী যেকোনো নির্বাচনে বিএনপিকে হিসাবে রেখেই সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচনি মাঠ গোছানোর সিদ্ধান্ত হয়। বিশেষ করে সারাদেশে নির্বাচনি মাঠে ভোটের লড়াইয়ে জয়ী হতে পারবেন এমন গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারে সবাইকে প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।