রাজনীতি

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার কারাদশ- ক্ষমতায় যেতে না পারার আশঙ্কায় হতাশ বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার ৫ বছরের কারাদ- হয়েছে এবং তিনি গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জেলে আছেন। সাম্প্রতিক সময়ে খোদ বিএনপির শীর্ষ নেতারাই বলছেন, খালেদা জিয়া খুব সহসা মুক্তি পাচ্ছেন না। বিএনপির অন্যতম আইনজীবী নেতা খন্দকার মাহবুব হোসেন স্পষ্ট করে বলেছেন, সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে বিএনপি চেয়ারপারসনের সহসাই মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দলটির একাধিক নেতা স্বীকার করেছেন, এমন পরিস্থিতির জন্য বিএনপি প্রস্তুত ছিল না। তাদের মধ্যে খালেদা জিয়ার কারাবাসের দীর্ঘসূত্রতায় ক্ষমতায় যেতে না পারার আশঙ্কায় নতুন করে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। তবে বিএনপি পরিস্থিতিকে বাস্তবতা হিসেবে ধরে নিয়ে নির্বাচন সামনে রেখে কৌশলে এগুতে চাইছে। বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীতো দূরের কথা দলের শীর্ষ পর্যায়ের অধিকাংশ নেতাই জানেন না দেশের অন্যতম জনপ্রিয় বৃহৎ এ রাজনৈতিক দলটি শেষ পর্যন্ত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি না। অনেকেই এখনও অনুমান করছেন শেষ মুহূর্তে বিএনপি হয়ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শেষ কথা জানার জন্য দেশের অন্যতম বৃহৎ এ দলটির সকল স্তরের নেতাকর্মীরা কারাবন্দি খালেদা জিয়া এবং লন্ডনে পলাতক হিসেবে অবস্থানরত দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে আছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলাটির বিচার কার্যক্রম চলেছে ১০ বছর ধরে। কিন্তু সেই বিচার কার্যক্রম এখনই শেষ হয়ে যাবে, এমনটা ধারণা করতে পারেননি বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। ফলে বিচার শেষে ৫ বছরের সাজা হওয়ার পর খালেদা জিয়াকে যখন জেলে নেয়া হয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে এসে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছে।
বিএনপি নেতাদের অনেকেই মনে করেছিলেন, খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলেও অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্তি পাবেন তিনি। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে, ততই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন না। বিএনপি নেতারা মনে করেন, খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত হবে, এ ব্যাপারে তাদের কর্মী-সমর্থকরা প্রস্তুত ছিলেন না। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, তাদের শীর্ষ নেত্রীকে জেলে নেয়ার ঘটনায় বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিল। অথচ বিএনপির শীর্ষ নেতারা তা হতে দেননি। তারা ভেবে রেখেছিলেন, আইনগতভাবেই খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন। তার মুক্তির জন্য শক্তি খরচ করে লাভ নেই। কিন্তু এখন খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিএনপির সেইসব নেতার সব হিসাব-নিকাশ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
বিএনপির সিনিয়র একজন নেতা স্বদেশ খবর-এর সঙ্গে হতাশার সুরেই বলেন, তাদের তৃণমূলে আবার যে হতাশা তৈরি হলো, তা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। যদিও বিএনপিতে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়ায় মানুষের মাঝে একটা সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছে এবং গণসংযোগের মতো তাদের কর্মসূচিগুলোকে মানুষ সমর্থন করছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপির কর্মসূচি সরকারের ওপর কোনো চাপ তৈরি করতে পারেনি। খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যুর কাছে এখন নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার বিএনপির দাবি চাপা পড়ে গেছে। নির্বাচনের সময় সহায়ক সরকারের যে দাবি বিএনপি করেছিল, সেটা এখন অতীত হয়ে গেছে। বিএনপি আর সে সুযোগ পাচ্ছে না। খালেদা জিয়ার কারাবাসের পর যে আন্দোলন গড়ে তোলার কথা ছিল, সেটাও কিন্তু তারা পারেনি। সব মিলিয়ে তাদের নেতৃত্বে এক ধরনের হতাশা এবং একই সাথে কনফিউশন সৃষ্টি করেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত হওয়ায় সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝে কিছুটাতো ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। তবে এটা ঠিক সরকারের দিক থেকে এটা আরেকটা প্রভোকেশন। যাতে দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আমরা সচেতনভাবে চেষ্টা করছি, প্রভোকেশনে ট্র্যপ্ট না হতে। মহাসচিব আরও বলেন, জনগণ ও দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিই তারা অব্যাহত রাখতে চাইছেন। তিনি বলেন, বর্তমান কঠিন সময়েও বিএনপির সিনিয়র নেতারা ঐক্যবদ্ধ আছেন। তবে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে না পারলে দলটির কোনো রাজনৈতিক কৌশলই মাঠে কাজ করবে না। বিএনপি চেয়েছিল তাদের জোট এবং সরকারের জোটের বাইরে থাকা দলগুলোর সাথে যুগপৎভাবে কর্মসূচি নিয়ে এগুতে। এর মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে সব দলকে দাঁড় করানোর একটা চেষ্টা তাদের রয়েছে। কিন্তু বিএনপির সে চেষ্টাও হালে পানি পায়নি ৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে আজ পর্যন্ত। বরং সব কিছু বাদ দিয়ে বিএনপিকে এখন খালেদা জিয়ার মুক্তি বিষয়েই ভাবতে হচ্ছে। বিএনপি মনে করেছিল সরকার খালেদা জিয়াকে জেলে নিলেই সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে। একটা বিপ্লব ঘটে যাবে। জনতা আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে জেল থেকে বের করে নিয়ে আসবে এবং বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। কিন্তু এসবের কিছুই হয়নি। জনতা খালেদা জিয়াকে জেল থেকেও বের করে আনেনি, ক্ষমতায়ও বসায়নি। বরং বিএনপির এখন ভেঙে কয়েক টুকরা হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অবাক করা বিষয় হলো বিএনপির অভ্যন্তরেই এখন কোনো কোনো নেতা অসুস্থ চিন্তার দিকে হাঁটছেন। তারা জেলবন্দি খালেদা জিয়ার জেলের অভ্যন্তরে স্বাভাবিক মৃত্যু আশা করছেন। তাদের ধারণা হলো খালেদা জিয়া জেলে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করলেও মানুষজনকে উসকে দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে একটা জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলা যাবে। বিএনপির কোনো কোনো নেতা আবার এ ধারণাও পোষণ করেন যে, খালেদা জিয়ার স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে তাদের জন্য নতুন বিএনপি গঠনের রাস্তাটি একেবারে পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিএনপির এসব নেতা মনে করেন, তারেক রহমানের পক্ষে আইনগত কারণেই এ মুহূর্তে বাংলাদেশে ফিরে আসা সম্ভব নয়। আর বাংলাদেশে ফিরে আসা সম্ভব না হওয়ায় তার পক্ষে রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়াও সম্ভব নয়। সে হিসাবে তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জিয়াউর রহমানকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে দলের অনেক নেতাই এখন বিএনপি চেয়ারপারসন হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। বিএনপির জন্য এখন এটাই করুণ বাস্তবতা। আর খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের এ মুহূর্তে চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া তেমন কিছুই করার নেই বলেও মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।