কলাম

ডিজিটালাইজেশনে অভূতপূর্ব অগ্রগতি

অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ^াস
১১ মে (২০১৮) বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘোষিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ পৌঁছে গেছে নতুন এক উচ্চতায়। আমাদের কৃষিভিত্তিক সমাজের সাংস্কৃতিক মানকে ডিজিটাল যুগের স্তরে উন্নীত করা একটি কঠিন কাজ ছিল। তার জন্য সঠিক নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনার দরকার পড়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই কাজটি সুনিপুণ পরিকল্পনায় বাস্তবায়ন করে চলেছেন। তাঁর মতে, ‘দীর্ঘদিন এদেশের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছি। মানুষের অনেক কাছে যাবার সুযোগ হয়েছে, সমস্যাগুলো দেখার ও জানার সুযোগ পেয়েছি। সরকার গঠন করার পর সেগুলো চিহ্নিত করা ও সমাধানের চেষ্টা করছি।’ মনে রাখতে হবে এদেশে আমরা সর্বপ্রথম শেখ হাসিনার মুখেই ডিজিটাল বাংলাদেশ ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির কথা শুনেছি। তাঁর নেতৃত্বেই সম্পন্ন হয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপান্তরের ইতিহাস। ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে বোঝায় দেশের সকল নাগরিককে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারার সক্ষমতা তৈরি করা। উপরন্তু তার চারপাশে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা যাতে তার জীবনধারাটি যন্ত্র-প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশের অনন্য নিদর্শন হিসেবে প্রতিভাত হয়। শিক্ষাসহ সরকারি-বেসরকারি ব্যবসাবাণিজ্য, শিল্প-কল-কারখানা ও সেবাকে ডিজিটাল করা হচ্ছে। এতে দেশের মানুষের জীবনধারা ডিজিটাল যুগে পদার্পণ করেছে।
২.
২০২১ সালে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ। আর ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উন্নত দেশ। ডিজিটাল প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় আয়োজিত ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’-এর উদ্বোধনে শেখ হাসিনা এদেশের অগ্রগতিতে প্রযুক্তির অবদানের কথা তুলে ধরেছেন। ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে দেশকে ডিজিটাল হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। গত ৯ বছরে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৮ কোটিতে। দেশকে ডিজিটাল হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিটি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে তৃণমূল পর্যায় থেকে। ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার হয়েছে। এখন গ্রামীণ মানুষও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। প্রতিটি জেলায় হাইটেক বা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক গড়ে তোলার অংশ হিসেবে ২৮টি হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের মধ্যে ঢাকার কারওয়ান বাজার ও যশোরে সফটওয়্যার পার্কের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া ১২টি বেসরকারি সফটওয়্যার পার্কও গড়ে উঠেছে।
এর আগে ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৫-এর উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করা আমাদের অঙ্গীকার। আমরা সে লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছি। ওই একই অনুষ্ঠানে তরুণ সমাজের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, নতুন প্রজন্মকে তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তাঁর সরকার স্কুলে কম্পিউটার শিক্ষা চালু, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠা, কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন ও ভ্রাম্যমাণ আইটি ল্যাব চালু করেছে। নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে সরকার দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল সংযোগ চালু করেছে। নতুন প্রজন্মকে তথ্যপ্রযুক্তিতে সক্ষম করে তুলতে মাধ্যমিক পর্যায়ে আইসিটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রায় ১৩ কোটি মোবাইল সিম ব্যবহার হচ্ছে। মানুষ এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিলসহ ট্যাক্সও দিতে পারে। ২০১৮ সালে দেশে ফোরজি চালু হয়েছে।
৩.
শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রযুক্তিভিত্তিক রূপান্তরিত বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। তাঁর মতে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। বিশ্বের প্রায় দুইশত দেশের মধ্যে মাত্র ৫৬টি দেশ মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট স্থাপনের অভিজাত ক্লাবের সদস্য। আর বাংলাদেশ এ ক্লাবের ৫৭তম সংযোজন। যা থেকে মূলত তিন ধরনের সেবা পাওয়া যাবে : ১. সম্প্রচার, ২. টেলিযোগাযোগ, ৩. ডাটা কমিউনিকেশন্স। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ব্যবহার করে কম খরচে আরও বেশি সংখ্যক টেলিভিশন চ্যানেল দেখা যাবে। দুর্গম এলাকা এবং আপদকালীন বিকল্প হিসেবে স্যাটেলাইট ব্যবহার করে ইন্টারনেট সেবা এবং মোবাইল ফোন চালানো সম্ভব। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্য পূরণে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ অত্যন্ত কার্যকর হবে। সব অঞ্চলের জন্য ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তির সমান সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইনফো সরকার-৩ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশের সকল ইউনিয়নকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির আওতায় নিয়ে আসা এ উদ্যোগের লক্ষ্য। কিন্তু এদেশে ৭৫০টি ইউনিয়ন দুর্গম এলাকায়। সাধারণত ডাটা সার্ভিসের জন্য অপটিক্যাল ফাইবারকে পছন্দের শীর্ষে রাখা হয়। তবে দুর্গম এলাকা বিশেষ করে দ্বীপ এবং পার্বত্য অঞ্চলে অপটিক্যাল ফাইবার কেবল লাইন পৌঁছানো দুরূহ ও ব্যয়বহুল। সেখানে ইন্টারনেট লিঙ্কড যোগাযোগ ও ডাটা সার্ভিসের বিকল্প উপায় হবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। এছাড়াও জরুরি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে ভূমিভিত্তিক যোগাযোগ সেবায় বিঘœ ঘটলে ডাটা ও টেলিযোগাযোগ সেবার ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট থেকে বাড়তি সুবিধা নেয়া যাবে।
৪.
বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের উন্নয়নে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন মেটাতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তাপুষ্ট একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৪ হাজার জনবলকে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৬৫টি প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা গ্রহণ করেছে। ২০১৮ সাল নাগাদ ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় এবং জিডিপিতে সফটওয়ার ও সেবাখাতের অবদান ১ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগেই জানানো হয়েছে যে, হাইটেক পার্ক ও সফটওয়ার টেকনোলজি পার্ক স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে এবং প্রতি জেলায় ক্রমান্বয়ে এই অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।
টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতি কমাতে ইতোমধ্যে সরকারি অফিসে ই-টেন্ডার পদ্ধতি চালু হয়েছে। সরকারি কাজে স্বচ্ছতা আনতে শিগগিরই সব মন্ত্রণালয়ে ই-টেন্ডার কার্যক্রম চালু করা হবে। দেশে ফোর-জি সেবা দেয়া হয়েছে। ফোর-জি বিপ্লব ঘটিয়েছে প্রযুক্তিতে। বর্তমানে বাংলাদেশ আউটসোর্সিংয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। সাড়ে ২৫ হাজার কম্পিউটার ল্যাব সারাদেশের স্কুলগুলোতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওয়েব পোর্টাল করেছি আমরা। যেখান থেকে যেকোনো তথ্যসেবা আমরা দিতে সক্ষম। আইটি সেক্টরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি এবং আরও এগিয়ে যাবো। ৯ বছর আগে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প বলে কিছু ছিল না। তখন আইটি খাত থেকে রপ্তানি আয় ছিল ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা এখন ২৫০ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। শিগগিরই তৈরি পোশাক শিল্পের চেয়ে আইটি বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি আয় বাড়বে। নেপাল ও ভুটানসহ সার্কভুক্ত দেশগুলোকে পরস্পরের মধ্যে সংযুক্তির (কানেক্টিভিটি) আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করে বেকারত্ব দূর করাকে অন্যতম এজেন্ডা হিসেবে নিয়েছে বর্তমান সরকার। এজন্য জোর দেয়া হয়েছে দ্রুত আইটি পার্ক স্থাপনের ওপর, পাশাপাশি আইটি ইনস্টিটিউট, আইটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ওপর। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নিরলস প্রচেষ্টায় আইটি খাত ইতোমধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের অনেক তরুণ-তরুণী সফটওয়ারের কাজ করে নিজের বেকারত্ব ঘুচিয়েছেন; অন্যের কাজের সংস্থান করেছেন এবং বিদেশ থেকে নিয়ে আসছেন মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যখন কম্পিউটার ব্যবহারে সাবলীল হয়ে উঠবে তখন বাংলাদেশকে আর তৈরি পোশাক শিল্পের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। কুটির শিল্পের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধরনের সফটওয়ারের কাজ করে দেশের মাটিতে বসে এদেশের যুবসমাজ নিয়ে আসবে বৈদেশিক মুদ্রা। আর এর মাধ্যমে মাত্র দশ থেকে পনের বছরের মধ্যে বাংলাদেশের নাম স্থান পাবে উন্নত দেশের তালিকায়।
ইতোমধ্যে সারাদেশে তৈরি করা হয়েছে ১ লাখের বেশি ওয়াই-ফাই জোন। ৫টি ধাপ বা পর্যায়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া হচ্ছে। প্রথমত, ই-গভর্ন্যান্স পদ্ধতি চালু করা। এ প্রক্রিয়ায় সরকারের সব কাজকর্ম ডিজিটালাইজড করা হচ্ছে। এতে সরকারের কাজকর্ম স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়েছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) নামের প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায় হচ্ছে স্কুল-কলেজে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা। এ প্রক্রিয়ায় পাঠ্যসূচিতে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় পর্যায় হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা। চতুর্থত, আইটি পার্ক গড়ে তোলা। পঞ্চম পর্যায়ে, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দেশের সব মানুষকে কম-বেশি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানার্জন করতে হবে। সে লক্ষ্য নিয়েই ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথের দাম নামিয়ে আনা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে দেশের জনগণ, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা তথ্যপ্রযুক্তি প্রয়োগের সুফল সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে, ‘ডিজিটাল আইন’ প্রবর্তন করা হয়েছে। ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে দেশের প্রতি প্রান্তে পৌঁছে দেয়ার কাজ চলছে। খুব দ্রুতগতিতেই বাংলাদেশের সব সেক্টর ডিজিটালাইজড হবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো আর্থিক খাতে লেনদেনে এটিএম বুথ, মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইনে পেমেন্টের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতা। ব্যাংক-এ না গিয়ে ঘরে বসেই অসংখ্য গ্রাহক মোবাইলে পরিশোধ করছে ইউটিলিটি বিল। এটিএম বুথ ব্যবহার করে টাকা তুলে খরচ করছে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে কতটা সহজ করেছে তার উদাহরণ শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক পরিবারে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আওতায় প্রায় অর্ধ শত ব্যাংক অনুমতি পেয়েছে। এ পদ্ধতির মাধ্যমে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্সও আসছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর মধ্যে আন্তঃলেনদেন সম্পূর্ণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ স্থাপন করেছে। এ সিস্টেমে এটিএম বুথ, পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস), ইন্টারনেট, মোবাইল ব্যাংকিং করা হচ্ছে। এর মধ্যে সব ব্যাংকের মধ্যে একটি কমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কার্ডের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ ও কেনাকাটা চালু রয়েছে। এ নেটওয়ার্কের আওতায় যুক্ত হয়েছে ৩৮টি ব্যাংক। এছাড়া স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মাসে প্রায় ২১ লাখ চেক প্রসেসিং হচ্ছে। উপরন্তু ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক-এর মাধ্যমে সরকার ও করপোরেট বডির মধ্যে বেশি অর্থের আদান-প্রদান চলছে। আর ই-কমার্স পদ্ধতির মাধ্যমে গ্রাহক তার নিজ অ্যাকাউন্ট থেকে অনলাইনে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে গ্রাহক নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করছেন। তবে এ সিস্টেমের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ট্রান্সফার করা হচ্ছে। এম-কমার্সে সোয়া ৫ লাখ গ্রাহক ইউটিলিটি বিল দিচ্ছে এবং এ পদ্ধতির মাধ্যমে মোবাইল ব্যবহারকারীরা রেলওয়ের টিকিট, ক্রিকেট ম্যাচের টিকিট কিনতে পারছেন। এছাড়া পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলও পরিশোধ করছেন।
৫.
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতি, স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির প্রতি, রূপকল্প ২০২১-এর প্রতি, ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপনের মধ্য দিয়ে দেশ পুনরায় ঘুরে দাঁড়ায়। গত মহাজোট সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেয়ার সময় একপর্যায়ে বলেনÑ ‘প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থেকে টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। তাই আমরা আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ২০২১ সালের মধ্যে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করি। এই ৪ বছরে আমরা ব্যাংকিংসহ সকল অর্থনৈতিক কর্মকা-, সেবা প্রদান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করেছি। সব বয়সী জনগণ এই প্রযুক্তিকে গ্রহণ করেছে। আমরা প্রতিটি ইউনিয়নে ইন্টারনেট সার্ভিস ও তথ্য সেবা কেন্দ্র চালু করেছি। এগুলো থেকে প্রতি মাসে ৪০ লক্ষ গ্রামীণ মানুষ ই-সেবা নিচ্ছেন। ইন্টারনেটের গতি বাড়িয়েছি ও ব্যয় কমিয়েছি। ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা ৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। ১২ কোটি মোবাইল সিম বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।
৬.
আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের এই যুগে সমাজের মানুষের চাহিদা মাথায় রেখে তা বাস্তবায়ন করতে শেখ হাসিনা সরকার সচেতন রয়েছে। টানা ৪ বছর প্রযুক্তি খাতে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ‘ওয়ার্ল্ড সামিট অন দি ইনফরমেশন সোসাইট’ (ডব্লিউআইসিএস) পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে স্থান করে নিয়েছে। বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন সেবাখাতে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রযুক্তির ব্যবহার করে জনসাধারণের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। ই-গভর্নমেন্ট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং অংশগ্রহণের উন্নয়ন সরকার ও তার নাগরিকদের দৈনন্দিন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশের ফলে সামনে নতুন (চতুর্থ) শিল্পবিপ্লবের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই বিপ্লবের দিকে ধাবিত হওয়ার ফলে শিল্পক্ষেত্রে ধীরে ধীরে মানুষের প্রয়োজন কমতে থাকবে। শিল্প কারখানাগুলো অধিকাংশই প্রযুক্তি ও যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়বে। তবে আমরা মনে করি দেশের মেধাবী তরুণ প্রজন্মই তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে শামিল করার স্বপ্ন সার্থক করবে।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক
জনসংযোগ তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়