প্রতিবেদন

প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিল সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে ৩৮ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকার বিশাল কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেয়া ৫ বছর মেয়াদি এ কর্মসূচির কার্যক্রম শুরু হবে আগামী জুলাই মাস থেকে। চলবে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে এ কর্মসূচি সহায়ক হবে। চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) শীর্ষক প্রকল্পটি ২২ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অনুমোদিত প্রকল্প সংক্রান্ত বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। মন্ত্রী জানান, মূলত পিইডিপি-৩ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় পিইডিপি-৪ প্রণয়ন করা হয়েছে। কর্মসূচিতে সরকারের নিজস্ব তহবিল হতে ব্যয় হবে ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। অবশিষ্ট ১২ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর ঋণ ও অনুদান হিসেবে পাওয়া যাবে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, ডিএফআইডি, ডিফাট (অস্ট্রেলিয়া), গাক (কানাডা) ও ইউনিসেফ।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এটি আমাদের স্বপ্নের কর্মসূচি। প্রাথমিক শিক্ষা খাতের অবকাঠামোসহ অন্যান্য ক্ষেত্রের উন্নয়নে প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এবারের কর্মসূচির বেশিরভাগ অর্থ ব্যয় হবে গুণগত মান তথা উৎকর্ষ সাধনে। এজন্য প্রি-প্রাইমারি এবং প্রথম হতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বর্তমান পাঠ্যসূচির সংশোধন এবং সব স্কুলে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করা হবে। সারাদেশে প্রাথমিক স্কুলে ১ লাখ ৬৫ হাজার ১৭৪ শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। ১ লাখ ৩৯ হাজার ১৭৪ শিক্ষকের ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রতি শিক্ষককে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান, শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিদেশে মাস্টার্স ও প্রশিক্ষণের সুযোগ, আইসিটি ট্রেনিং, লিডারশিপ ট্রেনিংসহ মানোন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি প্রয়োজনে তৃতীয় আরও একটি ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা করা হবে। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, একনেক সভায় এটিসহ মোট ১৬টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে ১২টি প্রকল্প নতুন এবং চারটি সংশোধিত প্রকল্প। এসব প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৬ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৫২ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, প্রকল্প সাহায্য ৪৩ হাজার ২২১ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ ৩২৮ কোটি টাকা।

পদ্মাসেতু রেলসংযোগ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পদ্মাসেতু রেলসংযোগ প্রকল্প সংশোধিত (প্রথম) আকারে সভায় অনুমোদিত হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ৪ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদকালও আরও দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। যদিও প্রকল্পের মূল কাজ এখনও শুরু হয়নি। ব্যয় বৃদ্ধির এই টাকা বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে। অন্যদিকে প্রকল্প সাহায্য হিসেবে চীনের ঋণ সহায়তা কমেছে। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়াল ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের মূল বরাদ্দ ছিল ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটা টাকা।

সরকারি চিনিকল সারা বছর
চালু রাখার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
সভায় ৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারি ১৪টি চিনিকলে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন সংক্রান্ত একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় বিদ্যমান ১৫টি সরকারি চিনিকল বাঁচাতে পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চিনিকলগুলো বর্তমানে বছরের ৩ মাস চিনি উৎপাদনের কাজে সচল থাকে। বছরের বাকি নয় মাস বন্ধ থাকে। ওই সময় বন্ধ না রেখে চিনিকলগুলোকে রিফাইনারি (পরিশোধনাগার) হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে তা এসব কলে প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে লাভজনক হবে। এছাড়া চিনি উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে আখের পাশাপাশি সুগার বিটের প্রচলন ও উৎপাদন বাড়ানোয় মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।

একনেকে অনুমোদিত অন্য প্রকল্প
একনেক সভায় অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলো হচ্ছে ৮ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ের রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প, ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ের কন্সট্রাকশন অব নিউ ১৩২/৩৩ কেভি অ্যান্ড ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন আন্ডার ডিপিডিসি প্রকল্প (১ম সংশোধিত), যশোর, কক্সবাজার, পাবনা ও নোয়াখালীর চারটি মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্প, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। এছাড়া ৮০৬ কোটি ব্যয়ে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের উন্নয়ন (১ম পর্যায়) প্রকল্প, ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তথ্য কমিশন ভবন নির্মাণ প্রকল্প এবং ৫৬ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় বাংলাদেশ বেতারের সিলেট কেন্দ্র আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল সম্প্রচার যন্ত্রপাতি স্থাপন প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে।
এর বাইরে ৩৯৪ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে সাতক্ষীরা সড়ক ও সিটি বাইপাস সড়ককে সংযুক্ত করে সংযোগ সড়কসহ ৩টি লিংক রোড নির্মাণ প্রকল্প, ১৬৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকার তেজগাঁওয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প, ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের আশুগঞ্জ অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার নদীবন্দর স্থাপন প্রকল্প, ৮৪৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীর ভূমিতে, পিলার স্থাপন, তীর রক্ষা, ওয়াকওয়ে ও জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প, ৬১২ কোটি টাকা ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১৯টি পৌরসভা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (৩য় সংশোধিত), ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা মহানগরীর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং খাল উন্নয়ন, ৭১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫টি র্যাব ফোর্সেস ট্রেনিং স্কুল কমপ্লেক্স নির্মাণ (১ম সংশোধিত) প্রকল্প সভায় অনুমোদিত হয়েছে।