অর্থনীতি

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের গবেষণা রিপোর্ট ব্যাংকিং খাতে অদক্ষতার মূল কারণ নীতিবান নেতৃত্বের অভাব

নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্যাংকিং খাতের অদক্ষতার বিষয়টি বর্তমানে বেশ প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। পারিবারিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ব্যাংকিং বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার পরও ব্যাংকের পরিচালকের পদে বসে যাচ্ছেন ছাত্রত্ব শেষ না করা কেউ কেউ। আবার কেউ কেউ পরিচালকের পদে বসে আরেকটি ব্যাংকের আরেকজন পরিচালকের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করে দেন নিজের ব্যাংক থেকে। ওই পরিচালকও আবার তার ব্যাংক থেকে পূর্ববর্তী পরিচালকের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করেন। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় এসব পরিচালকের নামে-বেনামে নেয়া ঋণই এক সময় খেলাপি হতে থাকে। অদক্ষ লোকজন ব্যাংকের পরিচালক পদে বসে যাওয়ার কারণেই ব্যাংক ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে। দেউলিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় ব্যাংকটির। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ৬১ শতাংশ ব্যাংকার মনে করেন ব্যাংকিং খাতে নীতিবান নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। এ জন্য ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকিং খাতের নীতিবান নেতৃত্ব দরকার বলে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে ব্যাংকের অপারেটিং খরচ ১০০ টাকার মধ্যে মানবসম্পদ উন্নয়নে মাত্র ২৫ পয়সা ব্যয় করা হয়। প্রশিক্ষণেও বাজেট কমিয়েছে ব্যাংকগুলো। একই সঙ্গে ব্যাংকে এক বছরে কর্মী কমেছে প্রায় ১০ হাজার। ২০১৬ সালে ব্যাংক কর্মী ছিল ৯০ হাজার ২৬৫ জন। ২০১৭ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ২৪৫ জন।
২৪ মে রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম অডিটোরিয়ামে ‘হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট অব ব্যাংকস’ শীর্ষক বার্ষিক পর্যালোচনা কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী।
স্বাগত বক্তব্যে আয়োজনের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শুরু করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী। তিনি দক্ষতার সঙ্গে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণের ওপরও জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইবিএমের চেয়ারম্যান প্রফেসর মুজাফফর আহমেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা, বিআইবিএমের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) ড. শাহ মো. আহসান হাবীব, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি, বিআইবিএমের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর এস এ চৌধুরী, প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ আব্দুল্লাহ, ওয়ান ব্যাংক লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং কোম্পানি সেক্রেটারি জন সরকার প্রমুখ।
কর্মশালায় গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। গবেষণা দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন বিআইবিএমের সহকারী অধ্যাপক মাসুদুল হক, বিআইবিএমের সহকারী অধ্যাপক রেক্সোনা ইয়াসমিন, বিআইবিএমের প্রভাষক আনিলা আলী, বিআইবিএমের প্রভাষক লামিয়া রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. রফিকুল ইসলাম এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মো. মাজহারুল ইসলাম। কর্মশালার উদ্বোধন করে ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল বলেন, ব্যাংকিং খাতের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয় বেশকিছু সার্কুলার জারি করেছে। এসব সার্কুলার যথাযথ পরিপালনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নজরদারি করা হয়। ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। এতে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ব্যাংকগুলো কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন ব্যয় ৫০ শতাংশ কমিয়েছে। ১০০ টাকা অপারেটিং ব্যয়ের মধ্যে মাত্র ২৫ পয়সা কর্মীদের উন্নয়নে ব্যয় করেছে ব্যাংক; যা খুবই হতাশাজনক। আন্তর্জাতিকভাবে অপারেটিং খরচের ২ থেকে ৩ শতাংশ ব্যয় করা হয় কর্মীদের পেছনে। একই সঙ্গে এক-তৃতীয়াংশ ব্যাংক তাদের মানবসম্পদ উন্নয়নের বাজেট ব্যয় করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা বলেন, ব্যাংকিং খাতের নৈতিকতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নৈতিকতা বজায় রাখতে পারলে ব্যাংকিং খাতের সমস্যা অনেকাংশে দূর হবে। তিনি ব্যাংকের কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। বিআইবিএমের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর এস এ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকিং খাতে চাকরির জন্য লাইসেন্স ব্যবস্থার প্রবর্তন করলে অনেক সমস্যা দূর হয়ে যাবে। বিশেষ করে পেশাদারি সংক্রান্ত লাইসেন্স থাকলেও ব্যাংকিংয়ে নেই। ব্যাংকিং খাতে এখন বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। সুতরাং এ বিষয়টি বিবেচনায় এই লাইসেন্স কাজে লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি বলেন, নারী কর্মীদের সন্ধ্যা ছয়টার পর ব্যাংকের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আবার ব্যাংকের পরিচালকদের একটি অংশ ব্যাংক কর্মীদের সঙ্গে কিভাবে আচরণ করতে হবে তা জানে না। এজন্য ব্যাংক পরিচালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ আব্দুল্লাহ বলেন, মানবসম্পদ কর্মীদের বেসিক ব্যাংকিংয়ের ধারণা থাকতে হবে। পদোন্নতির বিষয়েও সুস্পষ্ট ধারণা না থাকায় সমস্যা তৈরি হয়। এসব বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নজর দিতে হবে। ওয়ান ব্যাংক লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং কোম্পানি সেক্রেটারি জন সরকার বলেন, ব্যাংকের পরিবেশ পরিবারের মতো করে গড়ে উঠতে হবে। ভালোবাসার কারণে পরিবার যেমন টিকে থাকে ঠিক তেমনি ব্যাংকের মধ্যেও একই পরিবেশ রাখতে হবে। তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ফি নেয়া ঠিক নয়। কারণ এটিকে বিজ্ঞাপন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রায় সব আলোচকের আলোচনায় ব্যাংক পরিচালকদের নীতিহীনতার বিষয়টি উঠে এসেছে। আলোচকদের মতে, অনেক পরিচালকই ব্যাংককে তার পারিবারিক ব্যবসা বলে বলে মনে করেন। এই মনে করা থেকেই ব্যাংকের কোনো কোনো পরিচালক তার সহকর্মীর সঙ্গে মালিকসুলভ আচরণ প্রদর্শন করেন। বিষয়টি এখন আর দু-একটি ঘটনার মধ্যেই সীমিত নেই। এর পরিমাণ বাড়ছে বলেই অত্যন্ত লক্ষণীয়ভাবে গত এক বছরে ব্যাংকগুলোর অন্তত ১০ হাজার কর্মী কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন। এই কর্মীরা অন্য কোনো না কোনো পেশায় জড়িয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক কর্মী এক বছরের ব্যবধানে কেন পেশা ত্যাগ করলেন তা গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে বলে মত দেন বেশিরভাগ আলোচক।