কলাম

বিশ্বের মানুষ এখন ইতিবাচক বাংলাদেশকে চেনে

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)
ব্যক্তিগত কারণে দুই দফায় প্রায় ৪ মাস আমেরিকায় থেকে কয়েক দিন হলো দেশে ফিরে এসেছি। বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের ঘটনাবলি স্বচক্ষে দেখা একজন বাঙালি হিসেবে এই বয়সে এসে বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকি না কেন বাংলাদেশ সর্বত্রই সঙ্গে থাকে। তাই বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ সম্পর্কে কেউ জানতে চাইলে এবং দু-চারটা ভালো কথা বললে মনটা ভরে যায়। এ সম্পর্কে আমেরিকার দুয়েকটি অভিজ্ঞতার কথা আজকের লেখায় তুলে ধরতে চাই। তবে তার আগে একটু প্রাসঙ্গিক ও প্রারম্ভিক কথা বলা প্রয়োজন বলে মনে করছি। এ বছর প্রায় ৪ মাস থেকে এলাম আমেরিকার লুজিয়ানা রাজ্যের নিউ অরলিনস শহরে। গত বছরও প্রায় ৬ মাস এখানে থেকেছি। নিউ অরলিনস শহরটি পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম নদী মিসিসিপির তীরে অবস্থিত। নিউ অরলিনসসহ এই লুজিয়ানা ছিল প্রথমে স্পেন এবং পরে ফ্রান্সের অধীন। ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা, যুদ্ধ এবং ১৭৮৩ সালে প্যারিস চুক্তির মধ্য দিয়ে ব্রিটেনের কাছ থেকে আমেরিকা যখন স্বাধীনতা অর্জন করে তখন তাদের ভৌগোলিক পরিধি সীমাবদ্ধ ছিল উত্তর-পূর্বের ১৩টি রাজ্যের মধ্যে এবং তা ছিল বর্তমান আমেরিকার আয়তনের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। আমেরিকার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন ১৮০৩ সালে ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ানের কাছ থেকে মাত্র দেড় কোটি ডলার মূল্যে সমগ্র লুজিয়ানা অঞ্চলটি কিনে নেন, যার মোট আয়তন ৮ লাখ ২৮ হাজার বর্গমাইল। বর্তমান আমেরিকার ৫০টি রাজ্যের মধ্যে ১৫টি রাজ্য এই লুজিয়ানা অঞ্চলের জায়গা নিয়ে গঠিত হয়েছে। তখন আমেরিকা লুজিয়ানা না কিনলে বা ফ্রান্স বিক্রি না করলে এ অঞ্চলটি এককভাবে আরেকটি বিশাল বড় অথবা কয়েকটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হতে পারত। প্রতি একর জায়গার মূল্য তখন পড়ে মাত্র তিন সেন্ট বা বর্তমানে ষাট সেন্টের সমান। জেফারসন যখন লুজিয়ানা কেনার সিদ্ধান্ত নেন তখন তার ক্যাবিনেট সদস্য ছাড়া অন্যান্য কংগ্রেস সদস্য এবং বিরোধী দল মিলে নানা অজুহাতে প্রচ- বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু জেফারসন তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
এখন ভাবলে অবাক হতে হয়, নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক সাহস একটা জাতিরাষ্ট্রকে কত বড় করতে পারে। এই ঘটনাটি ইতিহাসে লুজিয়ানা পারসেজ হিসেবে চিহ্নিত এবং বলা হয়ে থাকে ইউরোপের রেনেসাঁ ও ইংলিশ রেভ্যুলেশনের পর থেকে যেসব ঘটনা বিশ্ব ব্যবস্থার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে তার মধ্যে এই লুজিয়ানা পারসেজ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি। লুজিয়ানা তখন কিনতে পেরেছিল বলেই পরে ১৮৪৬-৪৮ সালে মেক্সিকোর সঙ্গে যুদ্ধে আমেরিকা জয়লাভ করতে সক্ষম হয় এবং টেক্সাস থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত আরও কয়েকগুণ এলাকা আমেরিকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। আজকে আমরা যে বিশাল পরাশক্তি আমেরিকাকে দেখছি তা হয়ে ওঠা সম্ভব হতো না, যদি ওই সময়ে লুজিয়ানা পারসেজের ঘটনা না ঘটত। গলফ অব মেক্সিকো হয়ে আটলান্টিক থেকে মিসিসিপি নদীর প্রবেশমুখে অবস্থান হওয়ায় ওই সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকার জন্য নিউ অরলিনস ছিল স্ট্র্যাটেজিক্যালি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই থেকে এখনো নিউ অরলিনস বিশ্বের সব অঞ্চলের পর্যটকের জন্য খুবই আকর্ষণীয় স্থান। ফ্রান্সের উপনিবেশের নিদর্শন বহনকারী নিউ অরলিনস শহরের মাঝখানে অবস্থিত ফ্রেন্স কোয়ার্টার এলাকাটি বছরের সব সময়ই পর্যটকদের আনাগোনায় ভরপুর থাকে। এখানকার রেস্টুরেন্ট, অপেরা হাউজ, পানশালা ও স্যুভেনিয়ারের দোকানগুলো বিশেষভাবে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। নিউ অরলিনস শহরটি আকারে বেশি বড় নয়। বাংলাদেশের একটি জেলা শহরের চাইতে বড় হবে না। এর মধ্যেই কয়েকটি গলফ কোর্স এবং প্রায় ডজনখানেক পাঁচতারা হোটেল রয়েছে। পর্যটকদের জন্য মিসিসিপি নদীর তীরঘেঁষে গড়ে উঠেছে রিভার ওয়াক নামের বিশাল শপিংমল, যার নদীর দিকে সমান্তরালভাবে লম্বালম্বি রয়েছে সারিবদ্ধ সব খাবারের দোকান। বিশাল খোলা জায়গায় পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল লাগানো আছে। পছন্দমতো খাবার নিয়ে পর্যটকরা টেবিলে বসলে দেখা যায় মিসিসিপি থেকে গাঙচিলের দল উড়ে এসে নির্ভয়ে টেবিলের ওপর বসে পড়ে। তবে একটু পরপরই সাইনবোর্ডে লেখা আছে পাখিদের খাবার দেবেন না। যা হোক, যা বলার জন্য এত কথা বলা তা হলো দেশে ফেরার কয়েক দিন আগে আমরা দেখার জন্য ওই রিভার ওয়াক শপিংমলে গিয়েছিলাম। শপিংমলের দুই পাশে বড় বড় দোকানের মাঝখানে হাঁটাচলার জন্য অনেক চওড়া স্পেস, যেখানে আবার স্বল্প পরিসরে চক্রাকারের তাকের ওপর ছোট ছোট শো পিস, মোবাইল, ঘড়ি, নানা পদের অরনামেন্ট ইত্যাদি নিয়ে পসরা সাজিয়ে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টারত উঠতি বয়সের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা। পড়াশুনার ফাঁকে অতিরিক্ত কিছু আয় করাই এদের লক্ষ্য। আমরা ওইসব খুচরা দোকানের পাশ দিয়েই হাঁটছিলাম। এ রকম একটা দোকানের পাশ দিয়ে যেতেই দোকানের মেয়েটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য একটু এগিয়ে এসে জানতে চাইল আমরা কোন দেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশ বলতেই যেন বিক্রেতা মেয়েটির আগ্রহ বেড়ে গেল। সে প্রশ্নের সুরে বলল, তোমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেমন আছে। আমি প্রথমে একটু আশ্চর্যই হলাম। কারণ আমেরিকায় এই বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানা বা আগ্রহ থাকাটা সচরাচর দেখা যায় না। তারা নিজেদের নিয়েই মশগুল থাকতে ভালোবাসে। আরেকটু আলাপচারিতায় এই মেয়েটির বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহের আসল কারণটি জানতে পারলাম। সে স্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অর্থনীতির ওপর গ্র্যাজুয়েশন করছে। তার অধ্যাপক তাকে বলেছেন একটি স্বল্পোন্নত দেশ কিভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে উন্নয়নের ম্যাজিক সৃষ্টি করতে পারে তা স্বচক্ষে দেখতে চাইলে তাকে বাংলাদেশে যেতে হবে। তার অধ্যাপক তাকে আরও বলেছেন, উন্নয়নের যে গতি ও ধারায় বাংলাদেশ উঠে এসেছে তা অব্যাহত থাকলে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে অর্থনীতির ছাত্রদের আগামীতে বাংলাদেশের এই উত্থান পর্বের ইতিহাস পড়তে হবে। অধ্যাপকের উৎসাহে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন সোর্স থেকে এই তরুণী ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছে। সম্প্রতি ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) ৫১তম বার্ষিক সভায় এডিবির প্রেসিডেন্ট বলেছেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য বিমোচনে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। দেখলাম এ তথ্যটিও সে জানে। এই সূত্রেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামটিও সে জেনেছে। জানাল আগামী বছর গ্রীষ্মের ছুটিতে সে বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা করছে। গ্রীষ্মের সময় বাংলাদেশের আবহাওয়া কেমন থাকে এবং ঢাকা শহর সম্পর্কে আরও কিছু জানতে চাইল। গ্রীষ্মের সময় আবহাওয়া তার জন্য কিছুটা অসহনীয় হতে পারে বলে জানালাম আমি। ঢাকার ট্রাফিক জ্যামের কথাটিও তাকে বললাম। আবহাওয়ার বিষয়টা নিয়ে সে কিছুটা চিন্তিত বলে মনে হলো। তবে ট্রাফিক জ্যাম সম্পর্কে তার ধারণা উঠতি অর্থনীতির দেশে এমনটা হয়ে থাকে। এভাবে ৪-৫ মিনিট কথা বলার পর আমরা বিদায় নেয়ার কথা বলতে সে খুব বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইল তার দোকান থেকে আমরা কিছু কিনতে চাই কি না। জানাল তার অতিথি হিসেবে যতটুকু সম্ভব আমাদের সে কনসেশন দেবে। অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা সামনের দিকে এগোতে থাকলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমার স্ত্রীকে বললাম, বিদেশের মাটিতে বিদেশি মানুষ যখন নিজ দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক কথা বলে তখন সেটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও সম্মানের হয়। এটা দেশের জন্য অমূল্য সম্পদ।
লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক