প্রতিবেদন

রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের নানামুখী তৎপরতায় খুশি সাধারণ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রতি বছরই রমজান মাসে বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। অধিক মুনাফার আশায় বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিজেদের পকেট ভারী করতে গিয়ে ক্রেতা সাধারণের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে। নির্বাচনের বছরে যাতে কোনো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অধিক মুনাফা লাভের আশায় পণ্যমূল্য বৃদ্ধি করতে না পারে সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারিসহ সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কর্মকা-ের ওপর চালানো হচ্ছে পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান। গোয়েন্দা নজরদারি ও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের ২৪৬ আমদানিকারক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে; যারা বাজার সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচিত।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা নজরদারি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতা, টিসিবির ন্যয্যমূল্যে পণ্য বিক্রিসহ আরো কয়েকটি কারণে এবার রমজানে পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি অন্যান্যবারের তুলনায় বেশ কম। খুচরা বিক্রেতাদের বদ অভ্যাসের কারণে এবং ক্রেতাদের ’কিনতেই হবে’ মনোভাবের কারণে প্রথম রমজানে বেগুনি তৈরির বেগুন এক লাফে ১০০ টাকায় উঠে গেলেও তৃতীয় রমজানেই তা ৪০ টাকায় নেমে আসে। বেগুনের মতো শসা, টমেটো, কাঁচা মরিচ ও গাজর জাত ও মানভেদে ৫০-৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে খুচরা পর্যায়ে। মজুদকৃত পণ্য বাজারে চলে আসায় বেশিরভাগ ভোগ্যপণ্যের দাম না বেড়ে বরং কমছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ র্যাবের টিম মজুদদারির বিষয়ে কঠোর দৃষ্টি রাখায় এবং পাইকারি বাজারে অভিযান পরিচালনা করায় এবার রমজানের আগে সিন্ডিকেট করে পণ্য মজুদের অভিযোগ ওঠেনি। ফলে পণ্যের কৃত্রিম ঘাটতি দেখা দেয়নি। খুচরা বাজারে পণ্যের জোগান প্রচুর থাকায় অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ীই পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী না হয়ে কমছে। আর এতে পবিত্র রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতাদের মধ্যে স্বস্তি বিরাজ করছে।
এই রমজানেই ছোলা, ডাল, পিঁয়াজ ও চিনির দাম আরো কমার আভাস দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে এই প্রতিবেদক দেখেছে, কেজিতে ৫০ টাকা কমে ধনেপাতা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। পিঁয়াজ, খেজুর, ছোলা, মুড়ি, চিনি, ডাল ও ভোজ্যতেলের দামও বাড়েনি। তবে সব ধরনের মাছ ও মাংসের দাম চড়া। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে গরু ও খাসির মাংস। প্রতিকেজি গরুর মাংস ৪৮০-৫০০, খাসি ৭৫০-৮০০ এবং ব্রয়লার মুরগি ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের দেশি ও সামুদ্রিক মাছ। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বেড়েছে ব্রয়লার মুরগি ও মাছের দাম। আর গরুর মাংসের দাম বাড়ানো হয়েছে সিন্ডিকেট করে। অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে যেকোনো মাছ ও মাংসের দাম ভোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনসহ
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্রেতা বলেছেন, মাছ-মাংসের দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো উচিত। কোনো কোনো ক্রেতা বলেছেন, মাংস ব্যবসায়ীরা কসাইয়ের মতো আচরণ করছে। তারা কেজিপ্রতি দামও বেশি রাখছে, আবার মাপেও কম দিচ্ছে। গরুর মাংসের কথা বলে মহিষ, খাসির কথা বলে ছাগলের মাংস ধরিয়ে দেয়ার অভ্যাস তাদের বেশ পুরনো।
পবিত্র মাহে রমজান সামনে রেখে এবার প্রচুর বিদেশি ফল আঙ্গুর, আপেল, খেজুর, আনার, নাশপাতি, পেয়ারা, মালটা আমদানি হয়েছে। একইসঙ্গে মধুমাস জ্যৈষ্ঠের আম, লিচু, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ধরনের দেশি মৌসুমি ফলে
বাজার ঠাসা। এ কারণে ফলমূলের দাম বাড়েনি। জাত ও মানভেদে প্রতিকেজি আপেল বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১৫০ টাকায়, মাঝারি মানের খেজুর ১২০ থেকে ৩০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া প্রতি’শ লিচু ২৫০ থেকে ৩৫০ এবং প্রতিকেজি হিমসাগর আম ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোটামুটি ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকায় এবার রোজাদাররা ইফতারিতে প্রচুর পরিমাণ ফলমূল খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এর ফলে তৈলাক্ত জাতীয় খাবার বিশেষ করে ভাজাপোড়া খাবারের চাহিদাও অন্যবারের চেয়ে কমে গেছে। ফলশ্রুতিতে রাজধানীতে এবার ভাজাপোড়ার অস্থায়ী দোকান অন্যান্যবারের তুলনায় অনেক কম। এর বাইরে চিকিৎসকরা প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে ভাজাপোড়া খাবার বর্জন ও অধিক পরিমাণে দেশি ফলমূল খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এদিকে রোজার শুরুতেই পিঁয়াজের দাম একটু বাড়লেও এখন স্থিতিশীল রয়েছে। হিলি বন্দর দিয়ে ভারত থেকে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক পরিমাণে পিঁয়াজ আমদানি হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশিষ্ট সূত্র। এ কারণে জাত ও মানভেদে ৩৫-৫০ টাকার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পিঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে খুচরা বাজারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় আপাতত পিঁয়াজের দাম আর বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বিপুল পরিমাণ ভোগ্যপণ্য আমদানি ও মজুদ থাকায় ছোলা, চিনি, খেজুর, ভোজ্যতেল ও ডালের দাম বাড়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং ১৫ রোজার আগে আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্য বাজারে ছাড়া সম্ভব না হলে অনেক ব্যবসায়ীর মুনাফা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
তবে সে যা-ই হোক, এবার রমজানের আগে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সবগুলো সংস্থাই ছিল সক্রিয়। সীমিত আয়ের মানুষকে যাতে বিপাকে পড়তে না হয় সেজন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। রমজান মাস আসার আগে থেকেই গোয়েন্দারা অনুসন্ধান ও নজরদারি শুরু করে। রাজধানীর পুরান ঢাকা, বাড্ডা, আশুলিয়াসহ বেশকিছু এলাকা ও চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার-খাতুনগঞ্জ, রাজশাহী, দিনাজপুর ও নারায়ণগঞ্জের ২৪৬ জন আমদানিকারকের তালিকা তৈরি করা হয় এবং তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হয়। এই কার্যক্রমেই সবচেয়ে বেশি কাজ হয়। আর এবারের রমজানে অন্য যেকোনো রমজানের তুলনায় দ্রব্যমূল্য থাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই খুশি সাধারণ মানুষ।