ফিচার

লাইফস্টাইল : সন্তানের বন্ধু হবেন যেভাবে

নজরুল ইসলাম:
এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়ে, সন্তান-সন্ততি আর এক পুরুষ আগের ছেলে-মেয়ে, সন্তান সন্ততিদের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। আগে ধমকধামক আর কঠোর অনুশাসনের মধ্যে সন্তান মানুষ হতো। আর এখন ঠিক তার উল্টো, এখন সন্তানের বন্ধু হতে হবে আপনাকে। বন্ধু হয়ে তার কাছ থেকে বের করে নিয়ে আসতে হবে প্রকৃত সত্য তথ্যাবলি এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সন্তান যখন বন্ধু হয়ে যাবে, তখন সে সন্তানের বিপথে যাওয়ার কোনো আশঙ্কাই থাকবে না।
সমবয়সী ছেলে-মেয়েরা মুহূর্তের মধ্যেই একজন আরেকজনের বন্ধু হতে পারে, কিন্তু একজন বাবা কিংবা মা সন্তানের সাথে এই বন্ধুত্ব চাইলেই চট করে সেভাবে গড়ে নিতে পারেন না। কারণ বাবা-মায়ের সাথে যে বন্ধুত্ব তার ধরন স্বভাবতই বন্ধুর সাথে বন্ধুত্বের মতো হবে না এবং কিছু মৌলিক পার্থক্য সেখানে থাকবেই, আর এটাই বাস্তবতা। তাই বলে এমনটিও নয় যে, সন্তানের সাথে আপনার বন্ধুত্ব হবে না, বন্ধুত্ব অবশ্যই হবে, তবে তার ধরন, এটি গড়ার প্রক্রিয়া বয়স অনুযায়ী হবে কিছুটা ভিন্নভাবে ভিন্ন আবহে। এ বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করবে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর। বিশেষ করে, বন্ধুত্বের কোনো বয়স নেই বা যেকোনো বয়সেই বন্ধুত্ব গড়া যায়Ñ প্রচলিত এই কথাটি সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব গড়ার প্রশ্নে অন্তত চলবে না। কারণ সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে হবে শিশুকাল থেকেই।
প্রফেশনের কারণে আপনি সন্তানের নিদ্রারত অবস্থায় অফিসে যাবেন এবং রাতে আপনি যখন বাড়ি ফিরেন, ততক্ষণে সন্তান আপনার নিদ্রামগ্ন এবং এই পরিস্থিতি এক-দুদিনের নয়, প্রায় সারা জীবনের। এমনকি অধিকাংশ ছুটির দিনেও আপনি সময় কাটাচ্ছেন অফিসিয়াল মেহমানদের সাথে, পার্টিতে। ফলে মাসের এক-আধটা ছুটিতে, তাও অল্প সময়ের জন্য সন্তানের সাথে যে সময়টুকু কাটাচ্ছেন, তাতে সন্তানের কাছে আপনি ক্ষণিকের অতিথির মতো। ফলে এই পরিস্থিতিতে সন্তানের সাথে বন্ধুত্বের কথা না বলে বরং বলা ভালো সন্তানের সাথে দূরত্ব কমাবেন কিভাবে, সেটা। আর যাদের বাবা-মা দু’জনই চাকরি বা ব্যবসা করেন, তাদের সন্তানদের কী অবস্থা সেই নির্মম আলোচনা না করাই ভালো।
আগেই বলেছি সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব হতে হবে তার শিশু বেলাতেই; অর্থাৎ যত ব্যস্ততাই থাকুক সন্তান নিদ্রায় যাওয়ার আগেই আপনাকে ঘরে ফিরতে হবে এবং যতটা সম্ভব তার পাশে থাকতে হবে। অনেকেই হয়ত বলবেন, যে শিশু কথা বলতে পারে না তার পাশে বসে বা সময় কাটিয়ে কী হবে! অবশ্যই হবে। পাশে বসে আপনি তাকে দেখবেন, সে আপনাকে দেখবে এবং তার কৌতূহলী দৃষ্টির সাথে স্নেহ সোহাগ মাখা কথা বলবেন, ওই সময়ে এটাই বন্ধুত্ব। এভাবেই সে আপনাকে চিনবে ও জানবে এবং বড় হতে হতে সম্পর্ক গড়াবে অটুট বন্ধুত্বের দিকে, একই সাথে বন্ধু ও বাবা-মা। যেসব পরিবারে এই বন্ধন গড়ে উঠেছে, সেসব পরিবারে লক্ষ্য করলে দেখবেন, বাবা-মা সন্তানকে পরিচয় করিয়ে দেয়, এটা আমার বন্ধু বাবা অথবা সন্তান বলছে, এটা আমার বাবা বন্ধু বা মা বন্ধু। কিন্তু বড় হতে হতে বন্ধুত্বের সম্পর্ক অধিকাংশই আর অটুট থাকে না, কিছুটা আলগা হয়ে যায়। কিন্তু ছিন্ন হতে হতেও যে বন্ধনগুলো অটুট থাকে তার নেপথ্যে রয়েছে বাবা-মায়ের পারিবারিক পারস্পরিক সম্পর্ক-সম্মান, বিশ্বাস এবং ধৈর্য সহিষ্ণুতা, ধর্মীয় আনুগত্য ইত্যাদি; যা সন্তান অনুসরণ করে ও শিখে। বিশেষ করে স্পর্শকাতর বয়সে অতিরিক্ত সতর্কতার সাথে বুঝিয়ে কথা বলা ও শাসন করাসহ বিভিন্ন কাজ বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বন্ধন অটুট রাখার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ছেলে-মেয়েদের পছন্দ-অপছন্দ জানার চেষ্টা করবেন এবং পড়ালেখার পাশাপাশি তারা অবসরটা যাতে ঘরেই কিংবা বাইরে নিকটাত্মীয়দের সাথে বা ভালো বন্ধুদের সাথে আনন্দ করে কাটাতে পারে (ভালো হয় কোনো খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করলে) সেই সুযোগ করে দিন। বিশেষ করে পিতা-মাতাকে সন্তানের আনন্দ-বেদনার অংশীদার হতে হবে। অনেকে হয়ত বলবেন, সন্তানদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আঁকড়ে না রেখে ওদেরকে ওদের মতো ছেড়ে দিন। তবে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সন্তানদের এভাবে ছেড়ে দেয়া উচিত নয়। আর এ বিষয়ে চূড়ান্ত কথা হলো সন্তানকে বাবা-মার সান্নিধ্য থেকে একদম ছেড়ে দেয়া যাবে না আবার সম্পূর্ণ আবদ্ধও রাখা যাবে না। তার সঙ্গে বন্ধুবৎসল আচরণ করতে হবে। নিয়মিত মতবিনিময় করতে হবে, তাদের সুবিধা-অসুবিধাসমূহ যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে অনুধাবন করতে হবে। তা হলেই কেবল বয়সের পার্থক্য থাকলেও সে বাবা-মাকে বন্ধু বানিয়ে নেবে এবং তাদেরকে তার পথনির্দেশক বলে অনুসরণ করবে।