প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

শান্তিনিকেতনে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ও বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনার পাশে থাকার অঙ্গীকার নরেন্দ্র মোদির

নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্বোধন হয়েছে বহুল প্রত্যাশিত ও নয়নাভিরাম বাংলাদেশ ভবনের। বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক অনুদানে নির্মিত বাংলাদেশ ভবনটি দুই বাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা সর্বোপরি জ্ঞানচর্চার সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবে। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধন করেন। এ সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের তিন শীর্ষ রাজনীতিক- শেখ হাসিনা, নরেন্দ্র মোদি ও মমতা ব্যানার্জি দুই দেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো উচ্চমাত্রায় এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি বন্ধু হিসেবে একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অপরাপর বিশ্বের জন্য ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উভয় দেশের সহযোগিতার মনোভাব ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত দুটি আলাদা দেশ হলেও দুই দেশের স্বার্থগত সম্পর্ক রয়েছে। সাংস্কৃতিকভাবে হোক কিংবা সরকারি নীতির দিক দিয়ে হোক, আমরা এক অপরের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখি। বাংলাদেশ ভবন তেমনই একটি দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জি তার বক্তব্যে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেন, আমাদের সম্পর্ক বহতা নদীর মতো। এই সম্পর্ক অনেক দূর গড়াবে।
মোদি তাঁর বক্তব্যে আরো বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ অভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন স্বাধীন চিন্তার মানুষ। রবীন্দ্রনাথ যতটা ভারতের, ততটা বাংলাদেশেরও। বঙ্গবন্ধুও রবীন্দ্রনাথের বড় ভক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম সীমান্তের ওপারে (বাংলাদেশে) হয়েছে। কিন্তু অনুপ্রেরণা গেছে এপার থেকে। রক্তপাতের কষ্ট এপারেও (ভারতে) অনুভূত হয়েছে। বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধনের পর ওই ভবনেই আধাঘণ্টা একান্ত বৈঠক করেন শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুই নেতার একান্ত বৈঠকে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলোতে আলোচনা হয়েছে। এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও রাজনীতি বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।’
২৫ মে স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ৯টা ৫৫ মিনিট) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নগর উন্নয়নমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম এবং ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে কলকাতা থেকে ১৮০ কিলোমিটার উত্তরে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতনে যান। তিনি শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র ভবনে পৌঁছলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য্য নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁরা দুজনই পরিদর্শক বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এরপর তাঁরা বিশ্বভারতীর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। নরেন্দ্র মোদি তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশেই সম্মানের পাত্র। তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ ও মহাত্মা গান্ধীর কথাও উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা পুরোপুরি কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত বন্ধুত্ব অপরাপর বিশ্বের জন্য ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দিতে পারি যে উভয় দেশ সহযোগিতার এই মনোভাব ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখবে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে একত্রে চলতে চায় এবং এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যকার সব সমস্যার নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে আমাদের এখনো কিছু সমস্যা রয়েছে, যা আমি এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশের স্বার্থে এখানে তা উত্থাপন করতে চাই না। অবশ্য আমি বিশ্বাস করি যে বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে যেকোনো সমস্যার সমাধান করা যায়।’
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বভারতী চত্বরে বাংলাদেশ ভবন নির্মাণের সুযোগ করে দেয়ার জন্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ভারত সরকার, ভারতের বন্ধুভাবাপন্ন জনগণকে ধন্যবাদ জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন ক্ষুধা দারিদ্র্য ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বিশ্বাস করতেন, সমাজে বৈষম্য দূর না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ব কখনোই উন্নতি লাভ করবে না। শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর বিশ্ব সম্প্রদায়কে চাপ দেয়ারও আহ্বান জানান। মিয়ানমার থেকে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন, ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নিয়েছে। মানবিক কারণে আমরা আশ্রয় দিয়েছি। তারা দ্রুত তাদের স্বদেশে ফিরে যাকÑ আমরা সেটাই চাই। আমরা কিন্তু নির্যাতিত মানুষকে আশ্রয় না দিয়ে পারি না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করার পর ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দির গান্ধী তাঁকে এবং তাঁর বোন শেখ রেহানাকে আশ্রয় দেয়ায় ভারতের জনগণের প্রতি তিনি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশের জনগণ এই সমর্থন কখনো ভুলবে না।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, সন্ত্রাস ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্মিলিত প্রয়াস বাংলাদেশ ভবনের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত দুই রাষ্ট্র। তবে তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
গত কয়েক বছর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সোনালি অধ্যায়ের কথা উল্লেখ করে স্থল সীমান্তসহ বিভিন্ন ইস্যু নিষ্পত্তির উদাহরণ দেন মোদি। বক্তৃতার শুরুতে নরেন্দ্র মোদি বাংলায় বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন করা তাঁর সৌভাগ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশ ও ভারতÑ দুই দেশেরই জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। কবি গুরুর শান্তিনিকেতনে আসার জন্য শেখ হাসিনাকে অশেষ ধন্যবাদ জানান মোদি।
এদিকে বাংলাদেশ ভবন নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বক্তব্য দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘আমার খুব ভালো লেগেছে, এটা দারুণ হয়েছে। আজ বঙ্গবন্ধুর কথা মনে পড়ছে বারবার। কারণ ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের সম্পর্ক সেই ১৯৭১ সাল থেকে।’ তিস্তার প্রসঙ্গ এড়িয়ে মমতা বলেন, ‘অবিরল-অবিচল, একেবারে পদ্ম-মেঘনা-যমুনার মতো, অনেক জল গড়িয়ে গেছে, অনেক জল গড়াবে। কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক আরো অনেক অনেক ভালো হবে, এটা আমি বিশ্বাস করি।’
মমতা পশ্চিমবঙ্গে কবি নজরুল ইসলামের নামে বিমানবন্দর, একাডেমি প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা বঙ্গবন্ধুর নামেও একটি বঙ্গবন্ধু ভবন করতে চাই। যখনই আমাদের সুযোগ দেবেন, আমরা করব।’
প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানা এবং সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, কবি, গায়ক, শিল্পীসহ উভয় দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা ফেরার পথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি ঘুরে দেখেন। তিনি সেখানে কবির আবক্ষমূর্তিতে ফুলের মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা। পশ্চিমবঙ্গের নগর ও পৌরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম তাঁদের ঠাকুরবাড়ি ঘুরিয়ে দেখান। প্রধানমন্ত্রী প্রায় ৪০ মিনিট ঠাকুরবাড়িতে অবস্থান করেন। এরপর সন্ধ্যায় কলকাতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ব্যবসায়ী নেতারা বৈঠক করেন।
২৬ মে প্রধানমন্ত্রী আসানসোলে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে তিনি এক বিশেষ সমাবর্তনে সম্মানসূচক ডি লিট ডিগ্রি গ্রহণ করেন। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ভাষণ দেন এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে স্বর্ণপদক বিতরণ করেন।
নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিস্তা চুক্তিসহ সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তিস্তা চুক্তিসহ বেশকিছু বিষয় অনিষ্পন্ন আছে। আমরা সেগুলো শিগগিরই সমাধান করতে চাই।’ ‘তিস্তা চুক্তির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। চাপ দিয়েছেন। আশা করি, খুব তাড়াতাড়ি হবে। কিন্তু চুক্তি সইয়ের তারিখ দেয়া আপাতত খুবই অসম্ভব।’

ঢাকা-দিল্লি সহযোগিতা ভবিষ্যতেও
অব্যাহত থাকবে : শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা পুরোপুরি কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন উভয় দেশ ভবিষ্যতেও সহযোগিতার এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত বন্ধুত্বকে অপরাপর বিশ্বের জন্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দিতে পারি যে, উভয় দেশ সহযোগিতার এই মনোভাব ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখবে।
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যৌথভাবে নবনির্মিত বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধনকালে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাংস্কৃতিকবন্ধন সুদৃঢ় এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরো জোরদার হবে। অনুষ্ঠানের শুরুতে শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীরা বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর কেশরিনাথ ত্রিপাঠি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সবুজ কলি সেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানা এবং সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, কবি, গায়ক এবং শিল্পীসহ উভয় দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বিগত ৯ বছরে বিভিন্ন খাতে দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারত আর্থসামাজিক উন্নয়ন সাধনে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ ভবন দুদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ ভবন হবে এমন একটি অনন্য কেন্দ্র যেখানে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধ জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, রবীন্দ্রনাথ এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে লেখাপড়া ও গবেষণা করতে পারবে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত চত্বরে বাংলাদেশ ভবন স্থাপনে আমি অভিভূত। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বভারতী চত্বরে বাংলাদেশ ভবন নির্মাণের সুযোগ করে দেয়ার জন্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, পশ্চিম বাংলা সরকার, ভারত সরকার ও ভারতের বন্ধুভাবাপন্ন জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, দ্বিতল এই ভবনটি নির্মাণে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ২৫ কোটি রুপি ব্যয় করেছে এবং এই ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও সংস্কারের জন্য তিনি ১০ কোটি রুপির এককালীন তহবিল দেয়ার ঘোষণা দেন। গবেষকদের সুবিধার জন্য এই ভবনে একটি লাইব্রেরি, অডিটোরিয়াম, ক্যাফেটেরিয়া, ডিজিটাল সরঞ্জামাদিসহ যাদুঘর, আর্কাইভ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকবে। শেখ হাসিনা বলেন, রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় জন্মগ্রহণ করলেও তিনি বাংলাদেশকে তার হৃদয়ে ঘনিষ্ঠভাবে ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি তার জীবনের কিছুদিন বাংলাদেশের পতিসর, শিলাইদহ এবং শাহাজাদপুরে কাটিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রবীন্দ্রনাথ এসব জায়গায় তার জমিদারি পর্যবেক্ষণের জন্য সফর করেন। তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকতেন এবং সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকতেন। শেখ হাসিনা বলেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের পল্লী এলাকার প্রকৃতিকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন এবং পল্লীর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য তিনি কৃষিভিত্তিক সমাজ ও অসাধারণ গান, কবিতা, উপন্যাস ও ছোট গল্প রচনা করতেন। পতিসরে তিনি কৃষি সমবায় এবং ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বভারতীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক মাত্র কিছুদিন আগে। তিনি বলেন, ১৯৯৯ সালে এই প্রতিষ্ঠান থেকে ‘দেশিকুটুম’ পুরস্কার লাভের পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে তাঁর সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সকল ক্ষেত্রে সহযোগিতা দিয়েছেন। ১৯৪৮ সালে তৎকালীন তরুণ ছাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম শুরু করেন। ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ধরে ১৯৬১ সালে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকীতে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও সকল কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়। আমাদের দেশের জনগণ এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা রবীন্দ্রনাথের চেতনাকে আমাদের অন্তরে ধারণ করে রাখার জন্য সংগ্রাম করেছি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রবীন্দ্রনাথের গান আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে।
এই পর্যায়ে শেখ হাসিনা বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারাটি জীবন ক্ষুধা দারিদ্র্য ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বিশ্বাস করতেন সমাজে বৈষম্য দূর না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ব কখনোই উন্নতি লাভ করবে না। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রতিপাদ্য ছিল সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়Ñ এই নীতি প্রণয়ন। শেখ হাসিনা বলেন, তার নীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ সকল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। দুদেশের জনগণের মধ্যে অভিন্ন ঐতিহাসিক, সামাজিক, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক এবং আবেগঘন সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করার পর ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে এবং তাঁর বোন শেখ রেহানাকে আশ্রয় দেয়ায় ভারতের জনগণের প্রতি তিনি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশের জনগণ এই সমর্থন কখনো ভুলবে না।