কলাম

শান্তিনিকেতনে শান্তির দূত শেখ হাসিনা

অজয় দাশগুপ্ত
শান্তিনিকেতন নামটি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের দেয়া। আর একে গৌরবান্বিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। ভারত সরকারের আমন্ত্রণে দু’দিনের সফরে সেখানে গেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। যতটা না প্রধানমন্ত্রী তারচেয়ে বেশি ভাবছি বঙ্গবন্ধুকন্যা হিসেবে। বঙ্গবন্ধু আমাদের সেই নেতা যিনি বাংলাদেশের স্বপ্নকে সত্য করেছিলেন। শুধু কি তাই? যে দেশে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ ছিলেন, যে ভূমিতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অবৈধ সেখানে তিনি তাঁকে শুধু প্রতিষ্ঠা করেননি, তাকে দিয়েছেন জাতীয় সংগীত রচয়িতার সম্মান। প্রধানমন্ত্রী যে দেশে গিয়েছেন সেখানেও রবীন্দ্রনাথ জাতীয় সংগীতের রচয়িতা।
শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশকে একটি অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। যেখানে আর্থসামাজিক সমস্যাই শুধু নয়, ইতিহাসের কলঙ্কও মোছার পথে। আমাদের দুর্ভাগ্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এক ধরনের রাজনীতি এই দেশ ও ইতিহাসকে অপমান করার চেষ্টায় ছিল। এখনও আছে। তারা পারে না হেন কোনো কাজ নেই। তাদের টার্গেট আমাদের দেশ ইতিহাস সংস্কৃতি। সে জায়গায় এখনও রবীন্দ্রনাথ তাদের দুশমন। দুশমন কাজী নজরুল। রবীন্দ্র বিরোধিতার মূল কারণ যদিও তার ধর্মীয় পরিচয় নজরুলের বেলায় তার আদর্শ ও মানবিকতা। তাই এরা গোপনে রবীন্দ্রনাথের গান শোনেন আর বাইরে তার গান জাতীয় সংগীত থেকে নাকচ করার ষড়যন্ত্র করেন। অন্যদিকে নজরুলের অবস্থা আরও খারাপ। এরা অন্তরে তাঁকে ধারণ করতেই পারে না। ভয় পায়। বাহ্যত দেখালেও তাদের জীবনে নজরুল এক ভয়ানক আতঙ্ক এই সমাজে। তাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কলকাতা সফর নানাদিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি গেছেন সেখানে বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন করতে। গেল বছর ডিসেম্বরের শেষ ক’দিন শান্তিনিকেতনে ছিলাম। সাদামাটা আশ্রম আর সাধারণ ঘরবাড়ি। কিন্তু সব জায়গায় যে নান্দনিকতা আর ভালোলাগা তার তুলনা নেই। কোথাও যেন সম্মুখে শান্তি পারাবার আছে সেখানে। সে মাঠে দাঁড়িয়ে মনের তালগাছ পাখা মেলে আকাশে। এই ভাবনা ও ভালোলাগার জায়গাটা বাংলাদেশের মানুষের মানবিক সম্পদ। কারণ কবি ভারতের একার কেউ না। তিনি আমাদেরও। সেখানে বাংলাদেশের প্রচুর ছাত্রছাত্রী পড়তে যায়। প্রতি বছর ফিরে আসা অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত। যারা রবীন্দ্র সংগীতের দিকপাল বা ভালো গাইয়ে তাঁরা সকলেই কোন না কোনোভাবে শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রভারতী কিংবা বিশ্বভারতী প্রভাবিত। বাংলাদেশ ভবন সেদিক থেকে আমাদের প্রভাব ও ভালোবাসাকেই বড় করে তুলবে। এই ভবনের ভেতর দিয়ে আমাদের দেশ ও জাতির অস্তিত্ব আরও একবার তার সাংস্কৃতিক শিকড়ে গিয়ে মিলবে। আজ দেশের ভেতর মৌলবাদের যে অশুভ প্রভাব এবং ছায়া তা থেকে মুক্তির জন্য এমন উদ্যোগের বিকল্প নেই। হাজার ভাষণ বা লাখো কথার চাইতে এ কাজ দামি। কারণ শান্তিনিকেতনের প্রভাব ও শুভ ছায়ায় মানুষ বাঙালি ছাড়া আর কিছুই হতে শেখে না। শেখ হাসিনার ভেতর যে সত্তা ও বাঙালিয়ানা সেটাই তাঁকে দিয়ে আজ এই কাজ করিয়ে নিচ্ছে। যা একদিন ইতিহাসে ঠাঁই করে নেবে। সঙ্গে এটাও মানতে হবে তিনিই পারেন। দেশের চলমান রাজনীতিতে যারা তাঁকে নানা কারণে দোষারোপ করেন, বিশেষত সুশীল নামধারী, যারা তাঁকে মাঝে মাঝে বাঙালিয়ানা থেকে দূরে বলে অভিযোগ করেন এবার তাদের মুখে কুলুপ অঁাঁটা দরকার।
ভারতের সঙ্গে আমাদের অমীমাংসিত সমস্যা বা যেসব কারণে সম্পর্ক নাজুক সেগুলো হয়ত এখানে আলোচনায় আসবে না। তারপরও অন্যদিকে যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে শেখ হাসিনার কথা হয়েছে তখন স্বভাবতই আমরা আশা করতে পারি জল গড়াবে। বরফ শীতলতা ভেঙে তিস্তা দেখবে পানির মুখ। মমতা ব্যানার্জী ভারতের শক্তির ওপর ভর করে যতই গোঁয়ার্তুমি করেন না কেন মূলত তিনি এখন বিশ্ব রাজনীতি এমনকি উপমহাদেশের রাজনীতিতেও শেখ হাসিনার তুলনায় শিশু। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তঁাঁর আপন ঔজ্জ্বল্যে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। সেখানে তাঁকে সম্মান জানানোর কোনো বিকল্প নেই। নরেন্দ্র মোদি সেটা বোঝেন। ফলে আমাদের আশা থাকবে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন থেকে নতুন শান্তি ও মৈত্রীর বাণী নিয়েই ফিরবেন শেখ হাসিনা।
রবীন্দ্রনাথের আশ্রমে বা শান্তিনিকেতনে যাননি এমন বিখ্যাত মানুষ বিরল। গান্ধী নেহরু তো বটেই শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর জীবনে এক বিশাল প্রভাব এই শান্তিনিকেতনের। তিনি এখানে পড়াশুনাও করেছেন। নেহরু জানতেন এই প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা তাঁর কন্যার জীবনে প্রয়োজন পড়বে। আশা করি, শেখ হাসিনার মনোজগতেও ছায়া ফেলবে কবিগুরুর শান্তি ও ভালোবাসার নিকেতন। এখানেই শেষ না এই সফরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আসানসোল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান সূচক ডি লিট ডিগ্রি গ্রহণ করেছেন। এই সম্মানও বিরল। কারণ আমাদের জীবনে আরেক অপরিহার্য কবি নজরুল। কবি বলে নয়, তার জীবন ভালোবাসা গান লেখা এমনকি তার সাহস ও শৌর্য এখনও বাঙালির উৎসভূমি। তার মতো অসাম্প্রদায়িক মানুষ ভূ-ভারতে বিরল। বেদনা ও দ্রোহে একাকার এই কবির শেষ জীবন কেটেছে বাংলাদেশে। আমাদের দেশেই চিরনিদ্রায় শায়িত তিনি। তার ভূমি থেকে ডিগ্রি নেয়ার উত্তাপ ও সম্মান নিশ্চয়ই শেখ হাসিনাকে আরও বেগ ও উচ্চতা দেবে। কিছু দিন আগে তিনি যখন সিডনি এসেছিলেন নিজেই বলেছিলেন ক্লান্তির কথা। একের পর এক দেশে যাওয়া-আসা তাকে ক্লান্ত করে বৈকি। এই রাজনীতি এই সরকার এই সমস্যা সব তো তাঁর কাঁধেই। সেখানে দু’দিনের এই সফর নিঃসন্দেহে ভিন্নমাত্রার। এই সফরে আছে অপরিমেয় প্রাণশক্তি আর আনন্দের খোরাক। আমাদের সম্ভাবনার সফলতার চাবি যাঁর হাতে তঁাঁর শান্তিনিকেতন যাত্রা ও শান্তি নিয়ে ফেরত আসাই আমাদের সমৃদ্ধ করবে। এটাই আমাদের বিশ্বাস। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সবাই এক নির্মম হত্যাকা-ে এক রাতে হারিয়ে গেলেও তাঁর কন্যা ধীরে ধীরে রবীন্দ্রনাথের সে লাইনগুলোই সত্য প্রমাণিত করেছেন। দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে মঙ্গলালোক তবে তাই হোক। সে আলোয় উদ্ভাসিত হোক বাংলাদেশ। উদ্ভাসিত হোক আমাদের সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের জীবন। সেটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ। সম্প্রতি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়া ও দেশকে মানবিক করার ভেতর দিয়ে শান্তি ও কল্যাণের পথ খুলে দেয়া প্রধানমন্ত্রী আমাদের ভরসা। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি শান্তি ও কল্যাণের বার্তা নিয়েই ফিরেছেন।