প্রতিবেদন

শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত প্রিয়াঙ্কা চোপড়া লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
মিয়ানমারে নৃশংসতার শিকার হয়ে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। বাংলাদেশ সফর শেষে ফেরার আগে ২৪ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এ মন্তব্য করেন বলিউড ও হলিউডের জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী। জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে ৪ দিনের সফরে ২১ মে বাংলাদেশে আসেন প্রিয়াঙ্কা। উখিয়া ও টেকনাফে ১০টি শরণার্থী ক্যাম্প ঘুরে দেখে শিশুদের সঙ্গে কথা বলে তাদের অভিজ্ঞতা, তাদের সংকট তিনি বোঝার চেষ্টা করেন। কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফিরে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এই অভিনেত্রী। বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তার অভিজ্ঞতার কথা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে শিশুদের পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বলেন, একটা প্রজন্ম হারিয়ে যেতে বসেছে। যথাযথ শিক্ষার ব্যবস্থা না হলে এই শিশুরা চরমপন্থার দিকে ঝুঁকতে পারে। রোহিঙ্গারা বিপর্যয়ের মধ্যে আছে। যারা কর্মক্ষম তাদের কাজ নেই। ক্যাম্পের শিশুরা যে শিক্ষার যথাযথ সুযোগ পাচ্ছে না, সে কথাও প্রিয়াঙ্কা চোপড়া তুলে ধরেন।
মিয়ানমারের রাখাইনে দমন-পীড়নের মুখে গত কয়েক দশকে চার লাখের মতো রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। আর গত বছর ২৫ আগস্ট রাখাইনে নতুন করে দমন অভিযান শুরুর পর এসেছে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ যেভাবে আশ্রয় দিয়েছে তাকে ‘অভূতপূর্ব’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বলেন, কিভাবে মানবতার পাশে দাঁড়াতে হয়, তা বাংলাদেশের কাছে বিশ্বের শেখার আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে বলেন, নৃশংসতার মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়া হয়েছে মানবিক কারণে। ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা বাংলাদেশের একার পক্ষে কঠিন, তারপরও বাংলাদেশ সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ১ লাখ রোহিঙ্গাকে শিগগিরই ভাসানচরে স্থানান্তর করা হবে। সেখানে তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গত বছরের ২৩ নভেম্বর একটি সম্মতিপত্রে সই করেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। ওই চুক্তি বাস্তবায়নে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখার কথাও বলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের পর ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত প্রিয়াঙ্কা চোপড়া লা মেরিডিয়ান হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। সেখানে তিনি উপস্থিত সাংবাদিককের কাছে জানতে চান, ‘আপনাদের ক’জনের শিশুসন্তান আছে? হাত তুলুন।’ উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রায় অর্ধেক হাত তুলেন। তাদের মধ্যে একজন ফিসফিস করে বলেন, ‘আপনার আছে?’ বিষয়টি প্রিয়াঙ্কার কান এড়ায়নি। তিনি বলেন, ‘স্মার্ট প্রশ্ন। আপনারা জানতে চাচ্ছেন আমার সন্তান আছে কি না। আপনারা হয়ত জানেন না যে আমার সন্তান নেই।’ পরক্ষণেই প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘আমি যে শিশুদের নিয়ে কাজ করছি তারা সবাই আমার সন্তান।’
আবার পাল্টা প্রশ্ন করেন প্রিয়াঙ্কা, আপনি কি চাইবেন আপনার সন্তানরা এমন পরিস্থিতিতে পড়–ক যেখানে দেশে বোমা পড়ছে, লোকজনকে মেরে ফেলা হচ্ছে; যদি আপনার সন্তানদের ক্ষেত্রে এটি হয় তাহলে কি আপনি চাইবেন না কেউ তাদের সহযোগিতা করুক?
জাতিসংঘের জরুরি শিশু তহবিল ইউনিসেফেরে শুভেচ্ছাদূত প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘শিশু শিশুই। সে কোথা থেকে এলো, তার অভিভাবক কী করেছিল, তার কী ধর্মÑ এসব প্রশ্ন অর্থহীন। বিশ্বের প্রতিটি শিশুকে রক্ষার দায়িত্ব এই বিশ্বের এবং আমাদের মতো ব্যক্তিদের।’ প্রিয়াঙ্কা বলেন, ইতিহাস, ভূগোল, ভৌগোলিক অবস্থানÑ এগুলো শিশুদের কাছে তুচ্ছ। প্রতিটি শিশুই তার ভবিষ্যৎ চায়। প্রতিটি শিশুই মানবতার সেবায় ভূমিকা রাখার সুযোগ প্রত্যাশা করে।
এই বার্তাটি বিশ্বের কাছে ছড়িয়ে দিতেই এ সফরে এসেছিলেন বলে জানান প্রিয়াঙ্কা। রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের চোখ দিয়ে বিশ্বকে দেখা এবং তাদের প্রতি আরো সদয় হওয়া ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করাই ছিল তার চারদিনের এ সফরের লক্ষ্য।
প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বলেন, বর্ষা আসছে। বিশুদ্ধ পানি, আশ্রয়Ñ কিছুই নেই এই শিশুদের। তারা তো কেউ পছন্দ করে এই পরিবেশে আসেনি। তাই রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন শেষে বিশ্বের কাছে তার বার্তাটি হলো, ‘এই শিশুদের জন্য আপনারা আপনাদের হৃদয় খুলে দিন, সহমর্মিতা ছড়িয়ে দিন।’
মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে বা এই ইস্যুতে ভারতকে আরো সক্রিয় হতে ভূমিকা রাখবেন কি নাÑ এমন প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে ভারতীয় নাগরিক প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘আমি শিশুদের পক্ষে এখানে এসেছি। আমি রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার মতো উপযুক্ত নই। আমি হয়ত সব জানিও না। আমি দোষারোপে বিশ্বাস করি না। আমি শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি।’
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাজনৈতিক উদ্যোগ নেবেন কি নাÑ এমন প্রশ্ন উঠলে একপর্যায়ে প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘যেদিন রাজনীতিবিদ হব সেদিন সব করব। আমি এখন ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে শিশুদের পক্ষে কাজ করছি। যখন আমি প্রধানমন্ত্রী হব তখন সব করব।’