রাজনীতি

আন্দোলন না নির্বাচন দোটানায় বিএনপি

মেহেদী হাসান : একাধিক মামলার কারণে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শিগগিরই মুক্তি পাচ্ছেন না। জাতীয় নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে উঠছে। তাকে এবার কারাগারেই ঈদ উদযাপন করতে হচ্ছে। এ দিকে আপিল বিভাগ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করার জন্য হাইকোর্টকে নির্দেশ দিয়েছে। রাষ্ট্রপ ও দুদকের আইনজীবীগণ বলেছেন, সুপ্রিমকোর্টের অবকাশের পর ২৪ জুন আদালত খুলবে। যেহেতু পেপারবুক তৈরি আছে সুপ্রিমকোর্ট খোলার দিনই মেনশন করা হবে। এ ছাড়া আপিল বিভাগের রায়ও বের হয়নি। রায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে হাইকোর্টে আপিল নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্র ও দুদক মেনশন করবে। এ দিকে কুমিল্লায় নাশকতার ২ মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া ৬ মাসের জামিন ২৪ জুন পর্যন্ত স্থগিত করেছে আপিল বিভাগ। আদালত এই সময়ের মধ্য নিয়মিত আপিল করতে রাষ্ট্রপকে নির্দেশ দিয়েছে। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে ভুয়া জন্মদিন পালন ও জাতীয় পতাকার অবমাননার অভিযোগে ঢাকায় করা ২ মামলায়ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন মিলেনি হাইকোর্টে। খালেদার পে জামিন চেয়ে করা আবেদন নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ঢাকার সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতে খালেদা জিয়ার আবেদন নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। মামলার ধরন দেখে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহম্মেদসহ রাষ্ট্র ও দুদকের আইনজীবীগণ বলছেন, শিগগিরই বেগম জিয়া কারাগারের বাইরে আসতে পারছেন না। তাকে এবার কারাগারেই ঈদ করতে হবে। বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে ঢাকাসহ সারাদেশে ৩৮টি মামলা রয়েছে। কারাগার থেকে মুক্তি পেতে হলে তাকে সব মামলায়ই জামিন নিতে হবে।
৩৮টি মামলার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে দায়ের করা ১৪টি মামলার বিচার চলছে বকশীবাজার সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে। মামলাগুলো হলো দারুস সালাম থানায় করা নাশকতার ৮ মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, নাইকো দুর্নীতি মামলা, বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা, যাত্রাবাড়ী থানায় করা বিশেষ মতা আইনে মামলা ও মানহানির অভিযোগে দায়ের করা ২ মামলা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আপিল বিভাগ যেহেতু ২৪ জুন পর্যন্ত জামিন স্থগিত করেছে, সেহেতু খালেদা জিয়ার আর বের হবার উপায় নেই। তাকে জেলেই থাকতে হচ্ছে। ঈদও কারাগারেই করতে হবে। খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়ার মতে, আপিল বিভাগের আদেশের কারণে বেগম জিয়া শিগগিরই বের হতে পারছেন না। তিনি বলেন, আগামী ২৪ জুন আদালত খোলার পর আপিল বিভাগে জামিনের জন্য আবার শুনানি করা হবে। ১৬ মে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। কিন্তু ৩ জুন পর্যন্ত আদালত ওই রায়ে স্বার করেনি। এদিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। ১৬ মে সকালে খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা আপিল দুটি খারিজ করে এই রায় দেয় আদালত। একইসঙ্গে আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সাজার বিরুদ্ধে করা আপিল নিষ্পত্তি করতে হাইকোর্টকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। বেঞ্চে অন্য বিচারপতিগণ ছিলেন বিচারপতি ঈমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মীর্জা হোসাইন হায়দার।
খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে খোদ বিএনপির শীর্ষ নেতারাই বলছেন, খালেদা জিয়া খুব সহসা মুক্তি পাচ্ছেন না। বিএনপির অন্যতম আইনজীবী নেতা খন্দকার মাহবুব হোসেন স্পষ্ট করে বলেছেন, সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে বিএনপি চেয়ারপারসনের সহসাই মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দলটির একাধিক নেতা স্বীকার করেছেন, এমন পরিস্থিতির জন্য বিএনপি প্রস্তুত ছিল না। তাদের মধ্যে খালেদা জিয়ার কারাবাসের দীর্ঘসূত্রতায় ক্ষমতায় যেতে না পারার আশঙ্কায় নতুন করে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। তবে বিএনপি পরিস্থিতিকে বাস্তবতা হিসেবে ধরে নিয়ে নির্বাচন সামনে রেখে কৌশলে এগুতে চাইছে। বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীতো দূরের কথা দলের শীর্ষ পর্যায়ের অধিকাংশ নেতাই জানেন না দেশের অন্যতম জনপ্রিয় বৃহৎ এ রাজনৈতিক দলটি শেষ পর্যন্ত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি না। অনেকেই এখনও অনুমান করছেন শেষ মুহূর্তে বিএনপি হয়ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শেষ কথা জানার জন্য দেশের অন্যতম বৃহৎ এ দলটির সকল স্তরের নেতাকর্মীরা কারাবন্দি খালেদা জিয়া এবং লন্ডনে পলাতক হিসেবে অবস্থানরত দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে আছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলাটির বিচার কার্যক্রম চলেছে ১০ বছর ধরে। কিন্তু সেই বিচার কার্যক্রম এখনই শেষ হয়ে যাবে, এমনটা ধারণা করতে পারেননি বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। ফলে বিচার শেষে ৫ বছরের সাজা হওয়ার পর খালেদা জিয়াকে যখন জেলে নেয়া হয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে এসে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছে।
বিএনপি নেতাদের অনেকেই মনে করেছিলেন, খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলেও অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্তি পাবেন তিনি। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে, ততই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন না। বিএনপি নেতারা মনে করেন, খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত হবে, এ ব্যাপারে তাদের কর্মী-সমর্থকরা প্রস্তুত ছিলেন না। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, তাদের শীর্ষ নেত্রীকে জেলে নেয়ার ঘটনায় বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য দুর্বার গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিল। অথচ বিএনপির শীর্ষ নেতারা তা হতে দেননি। তারা ভেবে রেখেছিলেন, আইনগতভাবেই খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন। তার মুক্তির জন্য শক্তি খরচ করে লাভ নেই। কিন্তু এখন খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিএনপির সেইসব নেতার সব হিসাব-নিকাশ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে বিএনপি নিশ্চিতভাবে সিদ্ধান্তই নিতে পারছে না তারা সরকার বিরোধী আন্দোলন করবে নাকি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেÑ এ নিয়ে এখনও বেশ দোটানায় রয়েছে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।
বিএনপির সিনিয়র একজন নেতা স্বদেশ খবর-এর সঙ্গে হতাশার সুরেই বলেন, তাদের তৃণমূলে আবার যে হতাশা তৈরি হলো, তা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। যদিও বিএনপিতে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়ায় মানুষের মাঝে একটা সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছে এবং গণসংযোগের মতো তাদের কর্মসূচিগুলোকে মানুষ সমর্থন করছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপির কর্মসূচি সরকারের ওপর কোনো চাপ তৈরি করতে পারেনি। খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যুর কাছে এখন নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার বিএনপির দাবি চাপা পড়ে গেছে। নির্বাচনের সময় সহায়ক সরকারের যে দাবি বিএনপি করেছিল, সেটা এখন অতীত হয়ে গেছে। বিএনপি আর সে সুযোগ পাচ্ছে না। খালেদা জিয়ার কারাবাসের পর যে আন্দোলন গড়ে তোলার কথা ছিল, সেটাও কিন্তু তারা পারেনি। সব মিলিয়ে তাদের নেতৃত্বে এক ধরনের হতাশা এবং একই সাথে কনফিউশন সৃষ্টি করেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত হওয়ায় সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝে কিছুটাতো ােভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। তবে এটা ঠিক সরকারের দিক থেকে আরেকটা প্রভোকেশন। যাতে দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আমরা সচেতনভাবে চেষ্টা করছি, প্রভোকেশনে ট্র্যপ্ট না হতে। মহাসচিব আরও বলেন, জনগণ ও দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিই তারা অব্যাহত রাখতে চাইছেন। তিনি বলেন, বর্তমান কঠিন সময়েও বিএনপির সিনিয়র নেতারা ঐক্যবদ্ধ আছেন। তবে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে না পারলে দলটির কোনো রাজনৈতিক কৌশলই মাঠে কাজ করবে না। বিএনপি চেয়েছিল তাদের জোট এবং সরকারের জোটের বাইরে থাকা দলগুলোর সাথে যুগপৎভাবে কর্মসূচি নিয়ে এগুতে। এর মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে সব দলকে দাঁড় করানোর একটা চেষ্টা তাদের রয়েছে। কিন্তু বিএনপির সে চেষ্টাও হালে পানি পায়নি ৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে আজ পর্যন্ত। বরং সব কিছু বাদ দিয়ে বিএনপিকে এখন খালেদা জিয়ার কারামুক্তির বিষয়েই ভাবতে হচ্ছে। বিএনপি ভেবেছিল সরকার খালেদা জিয়াকে জেলে নিলেই সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে। একটা বিপ্লব ঘটে যাবে। জনতা আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে জেল থেকে বের করে নিয়ে আসবে এবং বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। কিন্তু এসবের কিছুই হয়নি। জনতা খালেদা জিয়াকে জেল থেকেও বের করে আনেনি, বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায়ও বসায়নি। বরং বিএনপির এখন ভেঙে কয়েক টুকরা হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
তবে সে যা-ই হোক, এখন যে প্রশ্নটি দলে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না। এ নিয়ে বিএনপিতেই রয়েছে দুই তিন ধরনের মতবাদ। কিছু নেতা বলছেন, খালেদা জিয়া জেলে থাকা অবস্থায় বিএনপি নির্বাচনে গেলে জেলবন্দি খালেদার অদৃশ্য শক্তিতেই বিএনপি বিপুল জয়লাভ করবে এবং আগামীতে সরকার গঠন করতে পারবে। আবার কিছু নেতা বলছেন, খালেদা জিয়া নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে না পারলে বিএনপির ভরাডুবি ঘটবে। নির্বাচনি মাঠে খালেদা জিয়া না থাকলে ভোটারদের মন কিছুতেই প্রভাবিত করা যাবে না। সেক্ষেত্রে মুক্ত খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপির কিছুতেই নির্বাচনে যাওয়া উচিত হবে না।
বিএনপির তৃতীয় আরেকটি পক্ষ খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আরো সোচ্চার হওয়ার পক্ষে। তাদের মতে, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার আন্দোলন শুরু করলে এতদিন বিএনপি চেয়ারপারসন মুক্তি পেয়ে যেতেন। তার মুক্তির জন্য আন্দোলন না করে বিএনপি একদিকে খালেদা জিয়াকে জেলে রেখেছে, আরেকদিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দৌড়ে অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির এই দুই-তিনটি পক্ষের পরস্পরবিরোধী কর্মকা-ের কারণে খালেদা জিয়ার মুক্তিও মিলছে না, আবার বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে নাÑ সে বিষয়টিও তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে পরিষ্কার হচ্ছে না। এতে বিএনপি পড়েছে ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতিতে। দলটির নেতাকর্মীর কাছে তাদের ভবিষ্যৎ এখন ধূসর। বিএনপির জেলের বাইরে থাকা নেতারা খালেদা জিয়াকে মুক্তও করতে পারছেন না এবং নির্বাচনে যাবে, সে নিশ্চয়তাও দিতে পারছেন না। আসলে খালেদা জিয়া ও লন্ডনপ্রবাসী তারেক রহমান ছাড়া বিএনপিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো যে কেউ নেই, এই বিষয়টিই এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে। তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বেশি দিন বাকি না থাকলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ ইস্যুতে এখনও সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছে না বিএনপি।