আন্তর্জাতিক

ইরানের সাম্প্রতিক পরমাণু তৎপরতায় উদ্বিগ্ন বিশ্ব

স্বদেশ খবর ডেস্ক : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি ইউরেনিয়াম সমতা বাড়ানোর প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছেন। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সমতা ১ লাখ ৯০ হাজার এসডব্লিউইউতে উন্নীত করার প্রস্তুতি নিতে জাতীয় আণবিক শক্তি সংস্থার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ৪ জুন এক সমাবেশে ভাষণ দেয়ার সময় তিনি এ নির্দেশ দেন। খোমেনি বলেন, পরমাণু সমঝোতার ভিত্তিতে ৫ জুন থেকেই এ সংক্রান্ত প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। কোনো কোনো ইউরোপীয় সরকারের কথাবার্তা থেকে মনে হচ্ছে তারা চায় ইরানি জাতি নিষেধাজ্ঞাও সহ্য করবে আবার পরমাণু কর্মসূচিও বন্ধ রাখবে। কিন্তু ওইসব ইউরোপীয় সরকারের জেনে রাখা উচিত তাদের এই দিবাস্বপ্ন কখনও সত্যি হবে না। নিশ্চিতভাবেই খুব শিগগিরই ইরানের জন্য পরমাণু তৎপরতার প্রয়োজন দেখা দেবে বলে জানান খোমেনি।
এদিকে জাতিসংঘের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে ইরান জানিয়েছে যে, তারা আবার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মতা বাড়াতে যাচ্ছে। দেশটি বলছে, তারা ইউরেনিয়াম হেক্সাফুরাইড তৈরির মতা বাড়াবে, যেটি আসলে ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ করার একটি অন্যতম প্রধান উপাদান। অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার মুখপাত্র বেহরৌজ কামালভান্দি বলেছেন, পারমাণবিক সমতা অর্জনের প্রক্রিয়া ভালোভাবেই চলছে। প্রয়োজন পড়লে এই কাজ আরও দ্রুত করা হবে।
এর আগে গত ৯ মে ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির পারমাণবিক চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। সেসময় ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, তিনি ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বের হয়ে গেলেও ইউরোপীয় দেশগুলো ও চীন জানায় যে, তারা পারমাণবিক চুক্তিতেই থাকবে। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ কার্যক্রমে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, রাশিয়া ও চীন একটি চুক্তিতে সই করে।
এদিকে ইরানকে নিবৃত্ত করার জন্য সম্প্রতি প্যারিস সফর করছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সেখানে তার সফর উপলে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। তাতেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাঁক্রো বলেছেন, ইরান পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘন করছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি নেতানিয়াহুর উদ্দেশে বলেন, আপনার কাছে পরমাণু সমঝোতা অপর্যাপ্ত মনে হলেও এটি স্বারের আগের অবস্থার চেয়ে এটি ভালো বলে এ সমঝোতা রা করতে হবে। সংঘর্ষ এড়াতে পরিস্থিতি আরও জটিলতার দিকে না নেয়ার আহ্বান জানান প্রেসিডেন্ট ম্যাঁক্রো। ম্যাঁক্রো বলেন, পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সব পকে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কারণ পরিস্থিতি জটিল করলে তার একটাই ফলÑ সংঘর্ষ। ম্যাঁক্রো বলেন, ওয়াশিংটন এ সমঝোতা থেকে বেরিয়ে গেছে বলে বাকি সবাই তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে এমনটি ভাবা ঠিক না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৮ মে পাশ্চাত্যের সঙ্গে ইরানের স্বারিত পরমাণু সমঝোতা থেকে একতরফাভাবে প্রত্যাহার করেছেন। এর পরেই চুক্তি রার জন্য ইউরোপীয় নেতারা উদ্যোগী হয়েছেন।
এদিকে, ইরানের সঙ্গে ৬ বিশ্বশক্তির পরমাণু চুক্তি থেকে সমর্থন প্রত্যাহারে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়েছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মার্কেল তাকে বলেছেন, জার্মানি ইসরাইলের সুরার অধিকার সমর্থন করে। তবে ইসরাইলকে নিরাপদ করে তুলতে পরমাণু চুক্তি বাতিলে তার অজুহাত নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। ইরানের সঙ্গে ৬ বিশ্বশক্তির চুক্তি বাতিলের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইউরোপীয় তিন দেশ সফরে গেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী। জার্মানিতে অনুষ্ঠিত নেতানিয়াহু-মার্কেল বৈঠক সূত্রে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান পরমাণু চুক্তির প্রশ্নে জার্মানির অবস্থান জানিয়েছে।
২০১৫ সালের জুনে তেহরানের সঙ্গে পরমাণু ইস্যুতে ৬ জাতিগোষ্ঠী চুক্তি স্বার করে। ভিয়েনায় নিরাপত্তা পরিষদের ৫ সদস্য রাষ্ট্র (পি-ফাইভ) যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানি (ওয়ান) চুক্তিতে স্বার করে। চুক্তি অনুযায়ী ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু পূর্বসূরি ওবামা আমলে স্বারিত এই চুক্তিকে য়িষ্ণু ও পচনশীল আখ্যা দিয়ে গত ৮ মে তা থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিলেও নিজেদের সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা নিশ্চিত করেছে তিন ইউরোপীয় দেশÑ ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য। চুক্তিতে স্বারকারী বাকি দুই দেশ রাশিয়া এবং চীনও রয়েছে একই অবস্থানে।
ওবামা প্রশাসনের সময় ৬ জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে তেহরানের সম্পাদিত পরমাণু চুক্তিকে শুরু থেকেই নেতিবাচক অবস্থান থেকে দেখছে ইসরাইল। এ নিয়ে ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। তবে মতায় আসার পর দৃশ্যত এ চুক্তি নিয়ে ইসরাইলের অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে সমর্থন প্রত্যাহারে রাজি করানোর জন্য তিন ইউরোপীয় দেশ সফর শুরু করেন নেতানিয়াহু। ৪ জুন বার্লিনে তাকে স্বাগত জানান মার্কেল। দ্বিপাকি বৈঠকে ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসতে মার্কেলের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন নেতানিয়াহু। কিন্তু তাতে সফল হননি। নেতানিয়াহুকে মার্কেল বলেন, আমরা ইসরাইলের নিরাপত্তার অধিকারকে সমর্থন করি এবং সবসময়ই ইরানকে বিষয়টি নিয়ে বলে যাচ্ছি। আমাদের ল্য (জার্মানি ও ইসরাইল) একই, তাহলো ইরানের হাতে যেন কখনও পারমাণবিক অস্ত্র না থাকে। তবে কী উপায়ে সে ল্য অর্জন করতে হবে তা নিয়ে আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো চুক্তি বহাল রেখে ইরানকে নিষেধাজ্ঞা-বহির্ভূত বাস্তবতায় আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করার প।ে তবে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর একটা বড় অংশের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপ্তি অনেক বিস্তৃত হওয়ায় ইউরোপের বাণিজ্যিক আদান-প্রদানেও এর প্রভাব পড়বে। তাদের পওে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছে ওই কোম্পানিগুলো। ইরানে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে ফ্রান্সভিত্তিক বহুজাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান টোটালের। তবে ইরানে ব্যবসার কারণে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু টোটালসহ ফরাসি কোম্পানিগুলো নয়, চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে আসার ঘোষণার পর আর্থিক তির ঝুঁকিতে রয়েছে জার্মানিসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ।