ফিচার

ইসলামি শরিয়তে যাকাতের বিধান

ইকবাল কবীর মোহন : যাকাত ইসলামি শরিয়তের অন্যতম স্তম্ভ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো যাকাত। যাকাত আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ কোনো বস্তুকে পরিশুদ্ধকরণ, প্রবৃদ্ধিকরণ, পবিত্রতা, সুসংবদ্ধকরণ ইত্যাদি। আর যাকাতের শাব্দিক অর্থ পরিচ্ছন্নতা বা পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ইত্যাদি। কোরআনে শব্দটি আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যাকাত বলতে ধন-সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দান করাকে বোঝায়।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে যাকাত
ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর মধ্যে সালাতের পরই যাকাতের স্থান। সালাত দৈহিক ইবাদত, আর যাকাত হলো আর্থিক ইবাদত। মানবজীবনের বিশাল অধ্যায় অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই দেখা যায় মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই অর্থনীতি মানুষের কর্মকা-ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর যাকাত ব্যবস্থার প্রচলনও তখন থেকেই। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় যাকাত সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছেন। সূরা বাকারার ১১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং যাকাত প্রদান করো।’ একই সূরার ৪৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো, যাকাত আদায় করো, আর বিনয়ীদের সঙ্গে বিনয় প্রকাশ করো।’

যাকাতের নিসাব ও খাত
কারো কাছে যদি সাড়ে ৫২ ভরি রুপা বা সাড়ে ৭ ভরি সোনা বা উভয় বস্তুর যেকোনো একটির সমমূল্যের সম্পদ থাকে, তাকে বছরান্তে আড়াই শতাংশ হারে এবং বৃষ্টির পানিতে উৎপাদিত ফসলের এক-দশমাংশ ও সেচে উৎপাদিত ফসলের ২০ ভাগের এক ভাগ যাকাত আদায় করতে হবে। কোরআনে যাকাতের ৮টি খাত উল্লেখ করা হয়েছে। খাতগুলো হলো : ১. ফকির (যার কিছুই নেই), ২. মিসকিন (যার কিছু আছে, তবে নিসাব পরিমাণ নয়), ৩. যাকাত আদায়ে নিযুক্ত কর্মচারী, ৪. (অমুসলিমদের) মন জয় করার জন্য, ৫. দাসমুক্তির জন্য, ৬. আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যার্থে, ৭. ঋণমুক্তির জন্য, ৮. মুসাফির (যিনি ভ্রমণকালে অনটনে পতিত হয়েছেন)।

যাকাতের আর্থসামাজিক গুরুত্ব
যাকাত দেয়া ফরজ। যাকাত না দিলে বা তা অস্বীকার করলে দুনিয়া ও আখিরাতে ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করতে হবে। আর যাকাত দিলে মানুষ তার সম্পদের পবিত্রতা ও বৃদ্ধিই অর্জন করবে না, এতে তার পরকালীন মুক্তির পথও সুগম হবে। এ ছাড়া যাকাত সামাজিক জীবন ও জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যাকাতের আর্থসামাজিক গুরুত্ব নিম্নে বর্ণনা করা হলো :
ক. যাকাত সম্পদ পবিত্র করে : মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তুমি যখন যাকাত দেবে, তখন তা থেকে তার খারাবি দূর করে দিলে।’ যারা যাকাত দেয়, তারা সবসময় চিন্তা করে যে তার আয় যেন হালাল হয় এবং উপার্জনের মধ্যে যেন কোনো খারাবি না থাকে। এতে যাকাতদাতাদের মধ্যে সম্পদের পবিত্রতা অর্জনের প্রয়াসও সৃষ্টি হয় ।
খ. যাকাত ধনীদের পরিশুদ্ধ করে : পবিত্র কোরআনে সূরা তাওবার ১০৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, ‘আপনি তাদের ধন-সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করে তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে দিন।’ সম্পদশালীরা যাকাত প্রদানের মাধ্যমে মালের পরিশুদ্ধি লাভের পাশাপাশি তাদের মনেরও পরিশুদ্ধি অর্জন করে।
গ. যাকাত দারিদ্র্য দূর করে : যাকাতের ৮টি খাত রয়েছে। যাকাত বণ্টনের এই খাতগুলোর মধ্যে ফকির, মিসকিন, দাস-দাসী ও ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিÑ এই চারটি শ্রেণি হচ্ছে অবহেলিত, পীড়িত ও অভাবগ্রস্ত। যাকাত এদের মধ্যে বণ্টিত হলে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে বাধ্য, যা সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর করে সমাজকে আর্থিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে।
ঘ. যাকাত উৎপাদন বৃদ্ধি করে : অর্থনীতিতে যাকাতের প্রভাব খুবই উল্লেখযোগ্য। যাকাত গরিব, দুঃখী ও অভাবী মানুষের মধ্যে বণ্টিত হলে তাদের ক্রয়মতা বৃদ্ধি পায়। ফলে এসব লোকের চাহিদা বাড়ে। চাহিদা পূরণের জন্য স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায় উৎপাদন ও জোগান। এতে চাহিদা, উৎপাদন ও মুনাফাও বেড়ে যায়। ফলে সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারিত হয়। বেড়ে যায় অর্থনৈতিক কর্মকা-।
ঙ. যাকাত অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে
যাকাত ঠিকমতো আদায় ও বিলিবণ্টন হলে গরিব ও অভাবীরা সচ্ছল ও উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ পায়। ফলে ধনী-গরিবের বৈষম্য দূরীভূত হয়। যাকাত ধনীদের সম্পদকে গরিবদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে সম্পদ শুধু ধনীদের হাতেই আটকে থাকে না।
চ. যাকাত সমাজে শান্তি আনে : যাকাতের ওপর অর্থনীতির যে ভিত তৈরি হয়, তাতে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমে যায়। সমাজের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর হাতে সম্পদ বণ্টিত হওয়ার ফলে সমাজে থাকে না কোনো বিরোধ। এতে সমাজে আসে শান্তি ও নিরাপত্তা। একটি স্থিতিশীল সমাজ ও টেকসই অর্থনীতি পরিগঠনে তাই যাকাতের ভূমিকা অনন্য।

দারিদ্র্য বিমোচন ও যাকাত
ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মহানবী (সা.) মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে যাকাত ব্যবস্থাও কায়েম করেছেন। যাকাত আদায় ও বণ্টনের জন্য কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদিনের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় ও বণ্টন ব্যবস্থা জোরদার করেন। দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর আমলে যাকাত আদায় ও বণ্টন ব্যবস্থা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে একসময় যাকাত নেয়ার মতো লোকও খুঁজে পাওয়া যায়নি। খোলাফায়ে রাশেদিনের তৃতীয় ও চতুর্থ খলিফার আমলেও যাকাত ব্যবস্থা খুবই শক্তিশালী ছিল। ফলে ইসলামি রাষ্ট্রে অভাব-অনটনের চিহ্ন পর্যন্ত ছিল না। এই যাকাত ব্যবস্থা উমাইয়া ও আব্বাসীয় খলিফাদের আমলেও জোরদার ছিল বলে তখন দেশ ও সমাজ ছিল অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল।
যাকাত আধ্যাত্মিক ব্যবস্থা হিসেবে ধনীদের সম্পদের পরিশুদ্ধি এবং তার আখিরাতের মুক্তিই শুধু নিশ্চিত করে না, বরং যাকাত সম্পদকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকা- সচল রাখে, উৎপাদন বৃদ্ধি করে, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে এবং সামগ্রিকভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তাই ইসলামের বুনিয়াদি নীতির স্বার্থে, দুনিয়া ও আখেরাতের মুক্তির ল্েয এবং সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে সম্পদশালী মুসলমানের উচিত সুষ্ঠুভাবে যাকাত প্রদান করা। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে যাকাতের মর্ম ও উপকারিতা বুঝে নিজের মুক্তি ও সমাজের শান্তির জন্য কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার ও
প্রাক্তন সিনিয়র ব্যাংকার