ফিচার

কেরানীগঞ্জের পোশাকপল্লীতে ঈদুল ফিতরের প্রতিচ্ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঈদকে সামনে রেখে দণি এশিয়ার সর্ববৃহৎ কেরানীগঞ্জের তৈরি পোশাকপল্লীতে পাইকারদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। আর তাদের চাহিদা মতো পোশাক সরবরাহ করতে এখানকার কারখানাগুলোতেও দিন-রাত কাজ করে চলেছেন শ্রমিকরা। চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও ইতালিসহ নানা দেশের ব্র্যান্ড অনুযায়ী পোশাক তৈরি হয় এখানে। দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ক্রেতারা এ পোশাকপল্লীতে এসে ঘুরে ঘুরে পছন্দের পোশাক অর্ডার দিচ্ছেন এবং অর্ডার দেয়া পোশাক বুঝে নিচ্ছেন। তৈরি পোশাকের পাইকারি বাজার হওয়ার কারণে এ এলাকার বাজার জমতে শুরু করে শব-ই-বরাতের পর থেকেই। ৫০ শতাংশ বেচাবিক্রি রমজান শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। ২০ রমজান পর্যন্ত পাইকারি বিক্রি চলে। আর খুচরা বিক্রি চলে চাঁদরাত পর্যন্ত।
ব্যবসায়ীরা জানান, এবার ঈদ উপলে এ পোশাক বাজারে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হবে। কেরানীগঞ্জের একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মো. মিজানুর রহমান জানান, পুরো কেরানীগঞ্জ ঘিরেই পোশাক তৈরির কারখানা ও শোরুম। দেশে তৈরি পোশাকের প্রায় ৭০ শতাংশ ও শতভাগ জিন্স প্যান্টের চাহিদাও পূরণ করছে এ বাজার।
কেরানীগঞ্জে ২ হাজার ৭৯৬টি পোশাক তৈরির কারখানা রয়েছে। আর সেলস সেন্টার ও শোরুম রয়েছে ৪ হাজার ৬৮৮টি। তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৮ হাজার। প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক এ পোশাক বাজারসংশ্লিষ্ট কারখানা ও দোকানে কাজ করছেন। এছাড়া আরও প্রায় হাজারখানেক ছোট কারখানা রয়েছে কেরানীগঞ্জে। এ কারখানাগুলোতেও লাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। এছাড়া দুই শতাধিক ওয়াশিং ফ্যাক্টরি আছে কেরানীগঞ্জে।
কেরানীগঞ্জ পোশাক বাজার ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতা-বিক্রেতা আর শ্রমিকদের উপচেপড়া ভিড়। ট্রাক, ভ্যানসহ নদীর পাড়ে বাঁধা সারি সারি লঞ্চ, নৌকায় পোশাক বোঝাই করা হচ্ছে। যেখানে চোখ যায় শুধু পোশাকের শোরুম আর কারখানা। চতুর্দিকে শুধু বাহারি পোশাকের সমাহার। নানা ডিজাইনের প্যান্ট, শার্ট, পাঞ্জাবি, গেঞ্জি, বোরকা, ফতুয়া, কাবলি পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস।
দেখা যায়, বহুতল শপিংমলের কারখানাগুলোতে পোশাক তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিকরা। আলম শপিংমলের তৃতীয় তলা থেকে ৬ষ্ঠ তলা পর্যন্ত শত শত পোশাক তৈরির কারখানা রয়েছে। এসব ফ্যাশন কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা একটানা কাজ করে চলেছেন। তারা পাঞ্জাবি, শার্টসহ নানা রকমের পোশাক তৈরি করছেন। ঈদ উপলে অর্ডার অনুযায়ী পোশাক তৈরি করতে হচ্ছে বলেই তাদের এ ব্যস্ততা। এই শপিংমলের মীম ফ্যাশন হাউজ কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, শিশু ও তরুণীদের পোশাক তৈরি করা হচ্ছে। ফ্যাশন হাউজটির ম্যানেজার মো. উজ্জ্বল জানান, তারা এবার ভারত ও পাকিস্তানের নামকরা ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি করছেন। তারা ভারতের আকর্ষণীয় সাহারা, মাস্তানি, বাহুবলি পোশাক হুবহু তৈরি করছেন। এমনকি ভারতের ওইসব পোশাকের চেয়ে তাদের তৈরি পোশাকের কোয়ালিটি অনেক ভালো।
বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা কেরানীগঞ্জের পূর্ব আগানগর ও কালীগঞ্জে গড়ে ওঠা আলম টাওয়ার, শহিদুল আলম, মশিউর আলম, ইসলাম প্লাজা, সেঞ্চুরি কমপ্লেক্স, আশা কমপ্লেক্স, জিলা পরিষদ, মাহবুবুল আলম মার্কেট, মসজিদ মার্কেট, হান্নান মার্কেট, এসআর শপিংমল, খাজা মার্কেট, বাবুল ঢালী মার্কেট, আনোয়ার সুপার মার্কেট, লায়ন সুপার মার্কেট, জিঞ্জিরার ফ্যামিলি শপিংমলসহ প্রায় অর্ধশত মার্কেট ও কারখানা ঘুরে একই দৃশ্য চোখে পড়ে।
পাইকারি ক্রেতারা জানান, দামে কম ও কাপড়ের গুণগতমান ভালো হওয়ায় সারাদেশ থেকে ব্যবসায়ীরা এ পোশাক বাজারে ছুটে আসেন। কুমিল্লা থেকে আসা ব্যবসায়ী হারুন-অর রশীদ জানান, কুমিল্লা খদ্দরের কাপড়ের জন্য বিখ্যাত হলেও ঈদের সময় এ বাজারের পোশাক দারুণ বিক্রি হয়। তিনি ভারত ও পাকিস্তানি আকর্ষণীয় মডেলের পোশাক কিনতে এসেছেন।
চাঁদপুরের ব্যবসায়ী হিরণ মিয়া জানান, তিনি চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন মার্কেটে পোশাক সরবরাহ করেন। এখান থেকে এ পোশাক লঞ্চে করে নিয়ে যাবেন চাঁদপুরে। তিনি বলেন, সারা বছর তেমন ব্যবসা হয় না। ঈদ উপলে একটি মাস ব্যবসার সময়। এ মাসেই বাকি ১১ মাসের ব্যবসা করি।
আবিদ পাঞ্জাবি ফ্যাশন হাউজের স্বত্বাধিকারী মো. জুয়েল জানান, তার হাউজে দিন-রাত পাঞ্জাবি তৈরি হচ্ছে। এবারও অর্ডার রয়েছে লাখ লাখ পিসের। তিনি বলেন, তার শোরুমে ২০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দামের পাঞ্জাবি রয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের বিখ্যাত মাইনুক, ইউনিটিকা, পাঞ্জাবিসহ শতাধিক ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি হচ্ছে। পাইকারি বিক্রেতারা এখান থেকে ৫০০-৬০০ টাকায় কেনা এক একটি পাঞ্জাবি বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি করবে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায়।
একাধিক কারখানার মালিক জানান, তাদের কারখানায় শ্রমিকরা আনন্দসহকারে কাজ করেন। শ্রমিকদের বোনাসসহ ওভারটাইম দেয়া হয়। প্রতিটি কারখানাতেই আধুনিক মেশিন রয়েছে। এসব মেশিনে দ্রুত সময়ের মধ্যেই নির্দিষ্ট পোশাক তৈরি করা যায়।
ব্যবসায়ী ও কারখানা মালিক জালাল উদ্দিন জানান, এবার প্যান্টের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে কলকাতা নাইট, পিকে, ব্যাং-ব্যাং, হিমেশ, রোমিও, বিকিং, ব্লেসন, প্রোমা, ডিসকভারি, সালমান প্রভৃতি ব্র্যান্ড। গেঞ্জির মধ্যে কেএনজি, গিফিনি, জিকিউ, সিকে, পুলিশ, ৩৯ ও ৬৯ সহ বিভিন্ন অঙ্ক সংখ্যার বিদেশি মডেলের ফ্যাশনেবল ব্র্যান্ড বিক্রি হচ্ছে। কিরণমালা, জলপরী, জলনূপুর, ফোরটাচ, চেন্নাই এক্সপ্রেসের সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে সাহারা, মাস্তানি, বাহুবলিসহ বিভিন্ন নামে মেয়েদের পোশাক।
পাইকারি ক্রেতারা জানান, কেরানীগঞ্জ এলাকায় ২৫ থেকে ৩০টি ব্যাংক রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য এটিএম বুথ। ফলে কেনাকাটার জন্য নগদ টাকা বহন করতে হয় না। এছাড়া টিটি করেও টাকা আনতে হয় না। ফলে পকেটমার কিংবা অজ্ঞান পার্টির কবল থেকে রা পাওয়া যাচ্ছে অতি সহজেই।