কলাম

দুর্নীতি দমনে বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টা

অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস : ‘গ্রামে গ্রামে কাজ করো, দুঃখের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়াও’ এটি ছিল নেতাকর্মীদের প্রতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ। বর্তমান সরকারের আমলে একটি দৈনিক পত্রিকার সংবাদ ছিল বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশের মতোই। ‘নজরদারিতে মন্ত্রী-এমপিরা, সম্পদ-ব্যবসার খোঁজে বিশেষ গোয়েন্দা টিম, দুর্নীতির প্রমাণ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা’ শীর্ষক সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছাকে উদ্ধৃত করে। আমাদের দেশের অগ্রযাত্রায় এই ধরনের সুশাসনের প্রত্যয় ঘোষণা গত দু’দশকের রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার বিরল ঘটনা। সেসময় সংবাদ থেকে জানা গেছে, মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতির প্রমাণ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাদের সম্পদ ও ব্যবসাবাণিজ্যের খোঁজ রাখতে গঠন করা হয়েছে বিশেষ গোয়েন্দা টিম। সিনিয়র মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন বলে কেউ-ই এ েেত্র ছাড় পাবেন না। ৭ জুন (২০১৮) সরকারের এই মেয়াদের শেষ বাজেট উপস্থাপিত হওয়ার পর নানান প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য দিক সামনে এসেছে, তা হলো বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন একান্ত কাম্য তথা জরুরি।
অবশ্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের সদিচ্ছার প্রমাণ রয়েছে ৫ জানুয়ারি (২০১৪) জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বে ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারেও। ‘আমাদের এবারের অগ্রাধিকার : সুশাসন, গণতন্ত্রায়ন ও মতার বিকেন্দ্রায়ন’ শীর্ষক উপবিভাগের ১.৮ অনুচ্ছেদে দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্পর্কে বলা হয়েছেÑ ‘দুর্নীতি প্রতিরোধে, আইনি, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতা ও দতা বৃদ্ধি করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা আরও বাড়ানো হবে। ঘুষ, অনোপার্জিত আয়, কালো টাকা, চাঁদাবাজি, ঋণখেলাপি, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নিজেদের সম্পদ, আয়-রোজগার সম্পর্কে সর্বস্তরের নাগরিকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।’ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিগত মহাজোট সরকারের নেতৃত্ব দেয়ার সময় লক্ষ্য করেছেন জনগণের প্রত্যাশা আসলে কী? জনগণ শেখ হাসিনার পাশে দুর্নীতিবাজদের দেখতে পছন্দ করে না। এ কারণে মন্ত্রিপরিষদে পূর্বের অনেকেই ঠাঁই পাননি। উপরন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তদন্ত শুরু করলে সরকারপ্রধান হস্তক্ষেপ না করে নীরবে তা পর্যবেক্ষণ করেছেন। একথা ঠিক যে সরকারপ্রধান নির্লোভী হলেও তাঁর নির্ভরযোগ্য বা আশপাশের অনেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতিতে মেতে উঠতে পারেন; জনগণের প্রত্যাশা ধূলিসাৎ করে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেন। অথচ সরকার অতীতের ভুলত্রুটি শুধরে, জনগণের সেবা নিশ্চিত ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে আগামী নির্বাচনে আবার জয়ী হয়ে পাঁচ বছর মতায় থাকতে চায়। এই প্রত্যাশা ফলপ্রসূ করতে হলে জনগণ যে আশা-ভরসা নিয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়, সেটা রা করতে হবে। কোনো ধরনের অন্যায়কে বর্তমান সরকার প্রশ্রয় দিলে তা হবে আত্মঘাতী। এজন্য কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া অবশ্যক। গত মাসে (মে ২০১৮) শুরু হওয়া মাদকবিরোধী অভিযানে সেই দৃষ্টান্তই স্থাপন করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
২.
গত মহাজোট সরকারের আমলে স্বপ্নের পদ্মাসেতু বাস্তবায়নে প্রধান অন্তরায় ছিল বিশ্বব্যাংকের অতি মাতব্বরি এবং কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও আমলার যথার্থ পদক্ষেপের অভাব; তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ জানানোর ব্যর্থতা। অতীতের ভুল শোধরানোর দায়িত্ব অবশ্যই নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের কাঁধে থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে অন্যায় কর্মকা- কিংবা ঘুষ বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার প্রবণতা কঠোর ব্যবস্থায় রুখতে হবে। সচিবালয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং তাদের পিএস-এপিএস সকলের বিষয়ে নজরদারি দরকার। কারণ নিয়োগ-বদলিকে কেন্দ্র করে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ যেমন আছে তেমনি রয়েছে প্রতারণার ঘটনা। জনগণের সেবার মানসিকতা নিয়ে সরকারি প্রশাসন যে কাজ করে না তার প্রমাণ তো আমরা প্রতিদিনের হয়রানি থেকে তীব্রভাবে উপলব্ধি করি। রাস্তা-ঘাট, বাজার-বিপণিতে অব্যবস্থাপনা ও অরাজকতা থাকলেও অফিস-আদালতের সর্বত্রই দেখা যায় নিয়মকানুনের কড়াকড়ি। অথচ সেখানে ফাইল নড়তে টাকা দিতে হয়। তবে এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিস্তারই কেবল হয়রানি সৃষ্টি করে না বরং তা হয়ে ওঠে প্রতারণার শ্রেষ্ঠ জায়গা। আমাদের প্রশ্ন ডিজিটাল বাংলাদেশে কেবল যন্ত্র আর কাগজের মধ্যেই কি সব সেবা লুকিয়ে আছে। রাস্তার ফুটপাত কি চিরদিন দখলদারিত্বের কবলে থাকবে?
ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি সরকারের বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ সম্পাদনের পাশাপাশি এবার কঠোর গোপনীয়তায় মন্ত্রীদের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন শেখ হাসিনা। কারণ ‘গত সরকারের আমলে কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি অস্বাভাবিক অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়ায় সরকারের ভাবমূর্তি ুণœ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যেকোনো মূল্যে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে চান।’ মনে রাখা দরকার আমরা দুর্নীতির স্রষ্টাদের দুর্নীতিবিরোধী বয়ান শুনে শুনে আতঙ্কিত হয়েছি। এমনকি দুর্নীতি নিয়ে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে অনেক মুখরোচক কথা চালু রয়েছে। কথাবার্তায় আমরা প্রায় সবাই দুর্নীতিবিরোধী হয়ে ওঠার চেষ্টা করি। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা দরকার সেই প্রচেষ্টা গ্রহণ করি না। এমনকি দুর্নীতির নীতিগত উৎসাহদাতা অনেক আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা প্রায়শ বলে থাকে দুর্নীতির কারণে এদেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের অবশ্যই দুর্নীতির স্রষ্টাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ প্রতিনিয়ত মুক্তবাজার, বেসরকারীকরণ, বাজার উন্মুক্তকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সরকারি সেবাগুলোর ওপর ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য উন্নয়ন সহযোগী আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান চাপ প্রয়োগ করছে। এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে অকার্যকর করার জন্য এবং দেশের রাজনীতিকে কলঙ্কিত করতে রাজনীতিবিদদের ক্রয়-বিক্রয়ে মেতে উঠছে অনেকেইÑ এ সম্পর্কেও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। অনেক গবেষকই বলে থাকেন মুক্তবাজারের প্রতিযোগিতাকে অবাধ করার অর্থই হলো দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা। মুক্তবাজার নিজেই দুর্নীতির স্রষ্টা, এটাকে বজায় রেখে যারা ব্যক্তি দুর্নীতিবাজ ধরার প্রচেষ্টা চালায়, তারা অনেকটা জল ঘোলা করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের পথ খুঁজে ফেরেন। তারা চায় অর্থনৈতিক সক্ষমতায় দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোতে নামমাত্র পুতুল সরকার বজায় রেখে বিশ্বব্যাপী ধনী রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করতে। ১/১১-এর সময় দেশ থেকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের হঠানোর যে হঠকারী আয়োজন হয়েছিল, সে ঘটনাও মনে রাখা দরকার। এছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে এমনভাবে যেন তারা মনে না করে টাকা থাকলেই সমাজ সম্মান করবে।
কারণ লেখাপড়ার উদ্দেশ্য যদি ভালো চাকরি পাওয়া হয় তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি কখনো উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। সকলে জানেন যে, ‘দুদক’ সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান সংসদের এমপিদের কয়েকজনকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এতে সরকারের সদিচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে।
৩.
একটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অনেক আশাবাদ নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ২০১৪ সালে পুনরায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন শেখ হাসিনা। তাঁর আগের জোট সরকারের আমলের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস ছিল কলঙ্কিত। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী, এমপি এবং দলীয়/অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনের দুর্নীতি, দৌরাত্ম্য দেশবাসীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। জোট সরকারের পাঁচ বছরের শাসনামলের পাঁচ বছরই টিআইবির রেটিংয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করেছিল। উল্লেখ্য, দেশ পরিচালনায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সামগ্রিক ব্যর্থতা, অদতা, দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং মতার অপব্যবহার উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকেই উল্টে দিয়েছিল। নস্যাৎ করে দেয় সব সম্ভাবনা। তারেক রহমানের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছিল রাষ্ট্রমতার সমান্তরাল বা বিকল্প কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’। এই হাওয়া ভবন থেকেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা নেয়া হয়। ‘হাওয়া ভবন’ হয়ে উঠেছিল সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি ও কমিশন সংগ্রহ, প্রশাসনের নিয়োগ-বদলি, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা প্রভৃতি দেশবিরোধী অবৈধ কর্মকা-ে অঘোষিত হেড-কোয়ার্টার। মহাজোট সরকারের গত পাঁচ বছরে সেই দুর্নাম বহুলাংশে মোচন হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন করেছে। দুর্নীতির তদন্ত, অনুসন্ধান, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দুদক প্রয়োজনে মন্ত্রী, আমলাসহ যেকোনো মতাধর ব্যক্তিকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদের নজির স্থাপন করেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের উৎসমুখগুলো বন্ধ করার ল্েয অনলাইনে টেন্ডারসহ বিভিন্ন সেবা খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী প্রকোপ অনেকটাই কমেছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ সংগ্রামের চালিকাশক্তি ছিল একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন। কিন্তু রাষ্ট্রের দীর্ঘ ইতিহাসে সেই স্বপ্ন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে, পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং মুখ থুবড়ে পড়েছে। জাতির পিতার শাহাদতবরণ, সামরিক শাসন এবং স্বৈরাচারী, গণবিরোধী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির মতা দখল জনগণের সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নকে বারবার দূরে সরিয়ে দিয়েছে। জনগণের জীবনে এ ধরনের শাসনের কুফল প্রতিফলিত হয়েছিল অনুন্নয়নে, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অবদমনে, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনায়, দুর্নীতিতে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শুদ্ধাচারের অভাবে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রীয় মতা গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ সরকার এই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, অব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। এই যুদ্ধকে শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তাঁর শাসনামলে একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘… সুখী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়তে হলে দেশবাসীকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে হবে। কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না- চরিত্রের পরিবর্তন না হলে এই অভাগা দেশের ভাগ্য ফেরানো যাবে কি না সন্দেহ। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও আত্মপ্রবঞ্চনার ঊর্ধ্বে থেকে আমাদের সকলকে আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি করতে হবে।’ শেখ হাসিনাও তাঁর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সকল কাজে আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রনিষ্ঠার ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
প্রথম থেকেই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। সে আলোকে আইনকানুন, নিয়মনীতি, পরিকল্পনা ও বিভিন্ন কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন অব্যাহত আছে; দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদপে গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি, আইনকানুন প্রণয়ন ও প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; তার জন্য সামগ্রিক এবং নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ প্রয়োজন। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সামগ্রিক উদ্যোগের সহায়ক কৌশল হিসেবে ‘সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় : জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই কৌশলটি বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ এবং বেসরকারি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আরো কিছু নতুন আইন প্রণয়ন করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে এবং এগুলির ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতির উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১৬-২০২০) শেখ হাসিনা সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নের ল্েয প্রণীত ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেতি পরিকল্পনা ২০১০-২০২১’ শীর্ষক দলিলে দুর্নীতি দমনকে একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এই আন্দোলনে সবাইকে অংশীদার হতে উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। কারণ দুর্নীতিকে কেবল আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে দমন করা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এজন্য সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, সুশীলসমাজ ও নাগরিকগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রয়াস দরকার।
৪.
বাংলাদেশ জাতিসংঘের টহরঃবফ ঘধঃরড়হং ঈড়হাবহঃরড়হ অমধরহংঃ ঈড়ৎৎঁঢ়ঃরড়হ (টঘঈঅঈ)-এর অনুসমর্থনকারী দেশ। দুর্নীতি নির্মূলের জন্য ‘ফৌজদারি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে দুর্নীতির প্রতিকার ছাড়াও দুর্নীতির ঘটনা যাতে না ঘটে তার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণকে’ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এই কনভেনশনে। আগামী এক দশকে এ দেশে ুধা, বেকারত্ব, অশিা, বঞ্চনা ও দারিদ্র্য থাকবে না। দেশে বিরাজ করবে সুখ, শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধি। সংবিধানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ‘এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা’ হবে, ‘যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত’ হবে। এই ল্য পূরণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের অবশ্য-কর্তব্য এবং সেই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি দমন একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য উপাদান। কেবল আইন প্রয়োগ ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক েেত্র একটি আন্দোলন গড়ে তোলা, যাতে নাগরিকগণ চরিত্রনিষ্ঠ হয়, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সুশীলসমাজের প্রতিষ্ঠানসমূহে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা পায়। দুর্নীতি প্রতিরোধে মানুষকে নৈতিক জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সততা দ্বারা প্রভাবিত আচরণগত উৎকর্ষ যেন সে অনুসরণ করে চলে। তিনি যেন সমাজের কালোত্তীর্ণ মানদ-, নীতি ও প্রথার প্রতি অনুগত থাকেন। দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যক্তি-পর্যায়ে কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততা, তথা চরিত্রনিষ্ঠা খুব দরকার। এজন্য বিদ্যমান আইনকানুন, নিয়মনীতির সঙ্গে দুর্নীতি দমনকে একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করতে হবে। সেই অঙ্গীকারকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ল্েয সরকারের সদিচ্ছার সঙ্গে সঙ্গে জনগণের প্রচেষ্টাও গুরুত্ববহ।