ফিচার

রঙিন পোশাকের বাহারি সাজে সেজেছে রাজশাহীর সিল্কপল্লী

নিজস্ব প্রতিবেদক : সুই-সুতার ফোড়নে কেউ পোশাকে আনছে বাহারি সাজ। কেউ করছে রঙের কাজ। আবার চুমকি-পুঁতি লাগানোর কাজেও ব্যস্ত অনেকে। আবার কেউ বেদম চালাচ্ছে তাঁত। নারীরা বসে বসে এসব কাজই করছেন। সামনে ঈদ, তাই তাদের হাতে সময় নেই। পুরোদমে চলছে সবার হাত। শুধু কাজ আর কাজ। রাজশাহীর সিল্কপল্লীতে এমন দৃশ্য এখন খুবই স্বাভাবিক। শুধু সিল্কপল্লীই নয়, ঈদ সামনে রেখে রাজশাহীর বিভিন্ন অঞ্চলে নারীরা এখন সুই-সুতার নিখুঁত ফোড়নে ব্যস্ত, উজ্জীবিত। ঘরে বসে অর্ডার এনে ফিনিশড কাজগুলো সিল্ক কোম্পানিতে সরবরাহ করছেন তারা। বৃহত্তর রাজশাহীতে এখন অন্তত ১০ হাজার নারী এ কাজে যুক্ত। এভাবে ঘরে বসে ভাগ্য বদলানোর নিরন্তর সংগ্রামে লিপ্ত তারা।
আমের পরই রাজশাহীর সিল্কের কদর দেশজুড়ে। এ জন্য রাজশাহীকে বলা হয় রেশমনগরী। এখন আমের মৌসুম। আবার একই সময় শুরু হয়েছে ঈদের আমেজ। রাজশাহীর মানুষের ঈদ আর সিল্ক একই সুতোয় গাঁথা। তাই ঈদের কেনাকাটা জমতে শুরু করেছে রাজশাহীর সিল্ক হাউজগুলোতে। ফলস্বরূপ রাজশাহীর সিল্কপল্লী এখন বছরের সবচেয়ে ব্যস্ততম সময় কাটাচ্ছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন শোরুমে তাকে তাকে স্থান পেয়েছে ঐতিহ্যবাহী সিল্কের বাহারি পসরা। বেচাকেনাও জমে উঠতে শুরু করেছে এরই মধ্যে। দেদার বিক্রির আভাসে পুলকিত হতে শুরু করেছে ব্যবসায়ীদের মনপ্রাণ।
রাজশাহীর বিসিক শিল্প এলাকার শোরুমগুলোয় এখন কেউ গেলেই দূর থেকে সবার আগে কানে বিঁধবে তাঁতের খট খট শব্দ। বিসিক এলাকায় এখন দিনরাত চলছে তাঁতমেশিন। ঈদের মৌসুমে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার সিল্কসামগ্রী যেমন শাড়ি, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ বেশি বেশি বেচাকেনা হবে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন। ঈদের বাজার ধরতে জেলার ঐতিহ্যবাহী সিল্ক কারখানাগুলোতে চলছে রাতদিন কাজ আর কাজ। শাড়ি বুনন, রঙ ও হাতের কাজ চলছে এসব কারখানায়। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকায় এ বছর ভালো ব্যবসা করবেন বলে ব্যবসায়ীদের আশা। সে অনুযায়ী আগাম কাজ শুরু হয়েছে কারখানাগুলোয়। কেউ তাঁতে কাপড় বুনছেন, কেউ করছেন হাতের কাজ। আবার কেউ বাহারি নকশা আঁকছেন কাপড়ের ক্যানভাসে। কেউ রং লাগাচ্ছেন, কেউবা পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখছে নিজেদের করা হাতের কাজ। সেখান থেকে সরাসরি পাঠানো হচ্ছে শোরুমে।
রাজশাহী মহানগরীর বিসিক এলাকার কারখানাগুলোয় হরদম কাজ চলছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার এসব কারখানায় আগাম উৎপাদন শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিগত ৩ বছরের তুলনায় এবার বেচাকেনা অনেক ভালো হবে। দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহনশীল থাকায় এখন সরব হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী সিল্কের কারখানাগুলো।
রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিল্কবস্ত্র কারখানা সপুরা সিল্কমিলের নারীকর্মীরা তাঁতে কাপড় বুনছেন। অনেকে ব্যস্ত ব্লকের ওপর কারচুপির কাজে। তসর সিল্কের ওপর স্যাডো দিচ্ছেন কেউ কেউ। সাধারণ সিল্কে চুমকি বসাচ্ছেন অনেক নারীকর্মী। সপুরা সিল্ক মিলসের স্বত্বাধিকারী সদর আলী বলেন, বিগত বছরগুলোর চেয়ে এবার অনেক ভালো কেনাবেচা হবে। বিগত বছরগুলোতে রোজা শুরুর দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে কেনাবেচা শুরু হয়। তবে এবার ব্যতিক্রম ঘটেছে। এবার রোজা শুরুর আগের সপ্তাহ থেকে কেনাকাটার একটি আবহ তৈরি হয়েছে শোরুমে। তার অর্ডার নিয়ে এখন বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের ১০ হাজার নারী ঘরে বসে কাজ করছেন, আর তাদের শোরুমে সরবরাহ দিচ্ছেন।
এবারও সিল্কপ্রেমীদের চাহিদা পূরণে নতুন নতুন ডিজাইন আর বাহারি সব পোশাক নিয়ে হাজির হয়েছে নগরীর সিল্ক হাউজগুলো। ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে নিজেদের নিয়মিত ডিজাইনের সঙ্গে ঈদের জন্য তৈরি করা হয়েছে নতুন নতুন পোশাক। আবহাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে সিল্কের এসব পোশাক স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। রাজধানীর বিভিন্ন শোরুমেও শোভা পাচ্ছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিল্কের পোশাক। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এরই মধ্যে ক্রেতারা আসছেন রাজশাহীর সিল্ক হাউজগুলোয়। রাজশাহীর সিল্ক কারখানাগুলোয় এবার কী কী নতুন ফ্যাশন আসছে তা নিয়ে ক্রেতাদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। সপুরা সিল্ক প্রতিষ্ঠান এবার নানান ডিজাইন ও দামের পোশাক বাজারে আনছে। শাড়ি-জামা থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ-শিশু সবার জন্যই বিভিন্ন ডিজাইন ও দামের পোশাক তৈরিতে এখন নগরীর বিসিক শিল্প এলাকায় তুমুল ব্যস্ত এখানকার শ্রমিকরা। কারখানার শোরুমে ঈদের জন্য তৈরি করা নতুন ডিজাইনের কিছু পোশাক এরই মধ্যে এলেও বেশিরভাগ নতুন পোশাকের কাজ এখনও চলছে। কারখানার শোরুম ইনচার্জ জানান, এবারের ঈদে তাদের বড় আকর্ষণ কাটোয়ার ডিজাইনের শাড়ি। আর আছে সিল্কে হাতের কারুকাজ। বিভিন্ন ডিজাইনের এই শাড়িগুলোর দাম রাখা হয়েছে ৩ হাজার ২০০ থেকে ১০ হাজার ৫০০ টাকা। মসলিনের ওপর কারচুপি করা ডিজাইনের শাড়িও এবার নতুনভাবে হাজির করেছেন তারা। এসব শাড়ির দাম পড়বে ৩ হাজার ২০০ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। এই সিল্কশিল্প নতুন ধরনের পাঞ্জাবিও বাজারে আনছে। কারখানায় এখন পুরোদমে চলছে এসব পাঞ্জাবির কাজ। পর্যায়ক্রমে শোরুমে আসতে শুরু করেছে এসব পাঞ্জাবি। সিল্কের সঙ্গে মিলিয়ে প্রিন্ট, স্ট্রাইপ ও নানান ডিজাইনের পাঞ্জাবি তৈরি করা হয়েছে আবহাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে। এছাড়া মসলিনের ওপর ব্লক করা থ্রিপিস নতুন ডিজাইন হিসেবে এনেছে এই সিল্ক। নগরীর বিসিক শিল্প এলাকায় বিভিন্ন সিল্ক কারখানায় মেশিনচালিত একটি তাঁতও বসে নেই। রাজশাহীর সিল্কপল্লীতে বাহারি ডিজাইনের পোশাক আকর্ষণ করলেও এবার দাম ক্রেতাদের কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলছে। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় সব ধরনের সিল্ক পোশাকের দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানিকৃত সুতা, রঙের দাম বৃদ্ধি, মজুরি বৃদ্ধির কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সব ধরনের কাপড়ের দাম বাড়াতে হয়েছে তাদের।
রাজশাহী সিল্ক রেশম তন্তু দিয়ে উৎপন্ন। এটি অনেক সূক্ষ্ম এবং নরম মোলায়েম আঁশযুক্ত। আঁশের উপাদান পিউপা; যা আসে তুঁত রেশম থেকে। সাধারণত ৩ ধরনের সিল্ক হয়Ñ তুঁত সিল্ক, এন্ডি সিল্ক এবং তসর সিল্ক। রাজশাহীর সিল্ক দিয়ে তৈরি শাড়ি এবং অন্যান্য পণ্য গ্রাহকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। দেশ অভ্যন্তরে এমনকি দেশের বাইরেও এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।