কলাম

আওয়ামী লীগের সংগ্রাম, গৌরব ও সাফল্যের ৬৯ বছর : রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা থেকে উন্নত দেশের স্বপ্ন পূরণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

ড. হারুন-অর-রশিদ : আওয়ামী লীগ এদেশের প্রাচীন, সর্ববৃহৎ, ঐতিহ্যবাহী, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নাম। প্রতিষ্ঠা থেকে বর্তমান পর্যন্ত এ দলের রয়েছে ৬৯ বছরের সুদীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, সৃষ্টি ও অর্জনের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা আওয়ামী লীগ ও জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ আওয়ামী লীগ ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতামুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতাসহ জাতির এ পর্যন্ত যা কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন, এর সিংহভাগ কৃতিত্ব এ দলের।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা। ‘আওয়াম’ শব্দের অর্থ ‘জনগণ’ আর ‘লীগ’ হচ্ছে ওই জনগণের ‘সম্মিলনী’ বা ঐক্য। তাই নামগতভাবেও আওয়ামী লীগ হচ্ছে জনগণের দল, গণ-মানুষের দল, দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত দল। এ দেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-বেদনা, সাফল্য-সৃষ্টি, উন্নয়ন-অগ্রগতি, অর্জন সব কিছুর সঙ্গে নিবিড় ও অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে আছে আওয়ামী লীগ।
ইতিহাসে বাঙালিরা কখনো স্বাধীন জাতি বা তাদের জাতি-রাষ্ট্র ছিল না। একাদশ শতাব্দীতে ভারতের দাক্ষিণাত্য থেকে আগত সেন শাসকদের সময় থেকে শুরু করে তুর্কি, আফগান, মুগল, ব্রিটিশ ও সর্বশেষ পাকিস্তানি-প্রায় হাজার বছর ধরে তাঁরা বিজাতীয়/ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের অধীনস্থ থেকেছে। ৪০-এর দশকে পাকিস্তান আন্দোলনের মধ্যে জাতীয় মুক্তি প্রত্যাশী বাঙালিরা তাদের সার্বিক মুক্তির স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সে স্বপ্নের আদৌ পূরণ ঘটেনি। ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান তাদের রাষ্ট্র-ভাবনায়ও ছিল না। তাদের ওপর চেপে বসে ২৪ বছরের পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক ঔপনিবেশিক ধাঁচের শাসন-শোষণ আর চলে একের পর এক জাতি-নিপীড়ন।
বস্তুত ১৯৪৯ সালে বাঙালির সার্বিক মুক্তির প্রশ্নকে সামনে রেখেই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা। যে কারণে আওয়ামী লীগ কখনো সর্ব-পাকিস্তানভিত্তিক দল ছিল না বা সেভাবে গড়ে তোলার চেষ্টাও ছিল না। শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ ছিল বাংলা ও বাঙালিদের দল। বঙ্গবন্ধু ছিলেন দলের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম-সম্পাদক (তখন তিনি কারাবন্দি)। পাকিস্তান রাষ্ট্রে ’৪৮ ও ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির মুক্তির নবতর অধ্যায়ের সূচনা। বঙ্গবন্ধু সে আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে এবার তিনি দলকে মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্বদান উপযোগী সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। এমনকি এজন্য ১৯৫৬-৫৭ সালে ৯ মাস মন্ত্রী থাকার পর স্বেচ্ছায় তা ত্যাগ করেন। তাঁরই অকান্ত পরিশ্রম ও নেতৃত্বে ৬০-এর দশকে আওয়ামী লীগ পরিণত হয় বাঙালির জাতীয় মুক্তির মঞ্চে। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে গৃহীত হয় বাঙালির মুক্তি সনদ বা ‘ম্যাগনাকার্টা’ খ্যাত বঙ্গবন্ধুর ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ ৬ দফা ঐতিহাসিক কর্মসূচি। ৬ দফা ভিত্তিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামি করে আইয়ুব সরকারের দায়ের করা আগরতলা মামলা (১৯৬৮), ’৬৯-এর আইয়ুববিরোধী গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২রা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ তাঁর আহ্বানে পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন, ২৫শে মার্চ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানিবাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণ, ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা এবং সর্বশেষে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাঙালির হাজার বছরের স্বাধীনতার স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা এভাবে ’৭১-এ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ণতা পায়। তিনি আমাদের জাতির পিতা ও রাষ্ট্রের স্থপতি।
কী বিরোধী শিবিরে, কী সরকারে যেকোনো অবস্থানেই আওয়ামী লীগ জনগণের পাশে থেকে তাদের কল্যাণে ভূমিকা পালনে সক্রিয় থেকেছে। কিন্তু পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগ বা বাঙালিরা সরকারি ক্ষমতা থেকে প্রায় বঞ্চিত ছিল। ওই রাষ্ট্রের ২৪ বছরে মাত্র ১৩ মাস কেন্দ্রে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ-রিপাবলিকান কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা এবং পূর্ব বাংলায় ’৫৪-র যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে মাত্র ৫৬ দিন এবং ১৯৫৬-৫৮ সময়ে খান আতাউর রহমানের নেতৃত্বে ২ বছরের মতো সরকার পরিচালনার সুযোগ পায় এ দল। এতদ্সত্ত্বেও এ স্বল্প সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সমর্থ হয়, তার মধ্যে ছিলÑ ভূমিহীন কৃষকদের জন্য টেস্ট রিলিফ, মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ‘বর্ধমান হাউজ’-কে বাংলা ভাষার গবেষণাগারে পরিণত করা (বর্তমান বাংলা একাডেমি), যথাসময়ে উপনির্বাচন অনুষ্ঠান, ভাষা আন্দোলনে শহীদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দান, ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা, ১লা বৈশাখ নববর্ষ উদযাপন, আলিয়া মাদ্রাসার স্থায়ী ভবন নির্মাণ, ময়মনসিংহে পশু চিকিৎসা কলেজ, ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা, সাভার ডেইরি ফার্ম, চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি), জুট মার্কেটিং করপোরেশন, চট্টগ্রামে স্বতন্ত্র কন্ট্রোলার অব এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইমপোর্ট অফিস প্রতিষ্ঠা, আইডব্লিউটিএ ও ওয়াপদা প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।
স্বাধীনতা-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন, ধ্বংসপ্রাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন, ১৪০টি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায়, জাতিসংঘসহ বিশ্ব সংস্থায় বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভ, সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য সংবিধান প্রণয়ন (১৯৭২), নতুন করে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান (৭ই মার্চ ১৯৭৩), সর্ব পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান-কাঠামোর ভিত্তি নির্মাণ, ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সদস্যদের দেশে ফেরত পাঠানো, ভারতে আশ্রয় নেয়া ১ কোটি শরণার্থী ও মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে সম্ভ্রম হারানো কয়েক লক্ষ মা-বোনের পুনর্বাসন ইত্যাদি বিষয়ে আওয়ামী লীগ যখন জাতির পিতার নেতৃত্বে আত্মনিয়োগ করে বহু ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়, ঠিক এমন এক সময়ে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত দেশি-বিদেশি মহলবিশেষের ষড়যন্ত্রে সংঘটিত হয় বাঙালির ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি, ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের হত্যাকা-। এতে প্রাণ হারান জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের উপস্থিত সকল সদস্য।
জাতির পিতাকে নির্মম হত্যার পরে জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের দীর্ঘ ১৫ বছরের সেনাশাসন আমলে মুক্তিযুদ্ধ সৃষ্ট বাংলাদেশকে পাকিস্তান সেনা-আমলা নিয়ন্ত্রিত সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল ধারায় ফিরিয়ে নেয়ার সর্বাত্মক অপচেষ্টা চালানো হয়। জাতির পিতার হত্যাকারীদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন চাকরিতে নিয়োজিত করা হয় এবং বিচারের হাত থেকে রেহাই দেয়ার জন্য জারি করা হয় কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’। ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর চার জাতীয় নেতাকে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শভিত্তিক ’৭২-এর সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করা হয়। সাম্প্রদায়িক দলের ওপর সংবিধানে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বনকারী ও তাদের গণহত্যায় সহযোগী নিষিদ্ধ থাকা রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বকে নতুন করে রাজনীতি চর্চার সুযোগ দেয়া হয়। গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করা হয়। ভোটাধিকারসহ জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান কাঠামো ইতঃপূর্বে যতটুকু গড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছিল, তা বিনষ্ট করা হয়। ক্যু পালটা ক্যু’র নামে শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে চলতে থাকে ক্ষমতা দখলের হীন প্রতিযোগিতা। এতে প্রাণ হারাতে হয় শত শত দেশপ্রেমিক সৈনিককে। রাষ্ট্র ক্ষমতার অপব্যবহার ও গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্যে দলছুট ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের নিয়ে নতুন দল গঠন করা হয়। এক পর্যায়ে বেসামরিকীকরণের নামে চলে নির্লজ্জ প্রহসন। পেশিশক্তিই হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতার উৎস। রাষ্ট্রের মালিকানা আর জনগণের হাতে রইল না। মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় চরম হতাশা, অবিশ্বাস ও মূল্যবোধের অবক্ষয়।
জাতির এমনি এক ক্রান্তিকালে কা-ারির ভূমিকায় এগিয়ে এলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দীর্ঘ ৬ বছর বাধ্য হয়ে নির্বাসনে থাকা তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনা। প্রবাসে নির্বাসিত থাকা অবস্থায় ১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে দলের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। একই বছর ১৭ মে তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। বলা যায়, সেদিন থেকেই শুরু হয় জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে গড়ে তোলার তাঁর নিরন্তর সংগ্রাম, যা ৩৭ বছর ধরে চলছে। দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলন সংগ্রাম শেষে ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে জেনারেল এরশাদের পতনের পর ৫ বছরের জন্য খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি দেশ শাসন করে বটে কিন্তু পূর্ব-অবস্থা প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন করে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি হয়। বিএনপি সকল দলের বর্জন সত্ত্বেও ভোটারবিহীন মধ্য ফেব্রুয়ারি (১৯৯৬)-র তথাকথিত নির্বাচন শেষে গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য হয়। এরপর ১২ জুন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয় লাভ করে বঙ্গবন্ধু হত্যার ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের সুযোগ পায়। তাঁর এ সরকার ৫ বছরের পূর্ণ মেয়াদ পূরণ এবং দেশ-জাতির উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত ৪ দলীয় জোট ক্ষমতাসীন হয় ও সরকার গঠন করে। এবার নিজামী ও মুজাহিদের মতো চিহ্নিত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যুদ্ধাপরাধী মন্ত্রিসভায় স্থান পায়। এক কথায়, বিএনপি-জামায়াতের এ জোট সরকারের আমলে দেশময় কায়েম হয় হত্যা, খুন, ধর্ষণ, দখলদারিত্ব, লুটপাট, দুর্নীতি, জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থানসহ সন্ত্রাসের এক মহা রাজত্ব বা ‘রেইন অব টেরর’। প্রধানত এদের কারণেই দেশে ২০০৭ সালের ১/১১-এর সৃষ্টি, যা সেনাসমর্থিত তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ক্ষমতাসীন হওয়ার সুযোগ করে দেয়। সংস্কারের নামে দলে ভাঙন সৃষ্টি ও বিরাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে প্রকারান্তরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ছদ্মাবরণে দেশে সেনা-শাসন দীর্ঘস্থায়ী করার তাদের নীলনকশার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকেই লড়তে হয়। তিনি ওই লড়াই-সংগ্রামে সফল হন। ২০০৮ ও ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিজয়ী হয়ে একটানা প্রায় ১০ বছর সরকার পরিচালনা করে আসছে।
দেশ-জাতির উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তিনবারের সরকার এ পর্যন্ত যেসব যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়, তা হচ্ছেÑসেনাশাসনের কবল থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপন, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও শক্তিশালীকরণ, ’৭২-এর সংবিধানে চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি প্রতিস্থাপন, রাষ্ট্রপরিচালনায় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বা ডিজিটাল বাংলাদেশ, বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়সহ ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে দুই দশক স্থায়ী সশস্ত্র সংঘর্ষ রক্তপাত বন্ধ করে শান্তিচুক্তি সম্পাদন, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন, সমাজের দুস্থ, অসহায়-অক্ষম, বৃদ্ধ, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা, খাদ্য ঘাটতির স্থলে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় কমিউনিটি হেলথ কিনিক স্থাপন, সার্বজনীন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন, দারিদ্র্যসীমা শতকরা ৪৪ ভাগ থেকে ২ ভাগে এবং হতদরিদ্র ২২ থেকে ১২ ভাগে কমিয়ে আনা, সাক্ষরতার হার শতকরা ৭৩ ভাগে উন্নীত, গড় আয়ু ৭২ বছর, বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১৮ হাজার মেগাওয়াট, বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৭.৬৭%, মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৫২ মার্কিন ডলার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, রপ্তানি আয় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ ও সেক্ষেত্রে অগ্রগতি, রূপপুর পামাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, কক্ষপথে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর সফল উৎক্ষেপণ, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান কঠোর হস্তে দমন, দুর্নীতি দমন কমিশন শক্তিশালীকরণ, ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ছিটমহল সমস্যার সমাধান, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি, বাংলাদেশের উন্নয়ন ভিশন-২০২১, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্তির জাতিসংঘের স্বীকৃতি অর্জন, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ও ’৭১-এর মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বিচারের রায় কার্যকর করে আইনের শাসন এবং মানবাধিকার সমুন্নত, কর্ণফুলী নদীতে টানেল, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেল নির্মাণের প্রকল্প ইত্যাদি। এছাড়া ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের চরম সহিংস কর্মকা- ও উসকানির মুখে দেশকে সম্ভাব্য সেনা হস্তক্ষেপের হাত থেকে রক্ষা ও গণতান্ত্রিক শাসনের ধারাবাহিকতা অুণœ রাখা বিশেষভাবে উল্লেখ্য।
আওয়ামী লীগ এদেশের রাজনীতিতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যম-িত অগ্রবর্তী চিন্তার পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান। এ দল স্বপ্ন দেখে, মানুষকে স্বপ্ন দেখায় এবং বহুলাংশে স্বপ্ন পূরণেও সক্ষম। জাতির পিতার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছে এবং দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সে স্বপ্ন পূরণ করেছে। ১৯৫৫ সালে গৃহীত আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্রে সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রে ‘নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে’ একথা স্পষ্ট সন্নিবেশিত হয়, যে পথ বেয়ে আজ নারীর ক্ষমতায়ন। ১৯৬৪ সালেই আওয়ামী লীগ উত্তরবঙ্গের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নে যমুনা নদীর ওপর সেতু বা নিচ দিয়ে টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেতু আজ যার সফল বাস্তবায়ন। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে উদ্বোধন সংগীত ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’; স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে যা গৃহীত। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করার কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা আজ বাস্তবায়িত। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে (বাঙালি) জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাÑ এই চার মূলনীতি গ্রহণ করে, যা রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি হিসেবে ’৭২-এর সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত। ২০০৮ সালের নির্বাচন উপলক্ষে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রণীত আওয়ামী লীগের ইশতেহারে পদ্মাসেতু নির্মাণের অঙ্গীকার করা হয়, আজ যার বাস্তবায়ন পূর্ণগতিতে এগিয়ে চলছে। একই নির্বাচনকালে জাতির উদ্দেশে পেশকৃত আওয়ামী লীগের ‘ভিশন ২০২১’ বা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কর্মসূচি আজ একের পর এক বাস্তবায়িত হচ্ছে। এভাবে আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে।
আওয়ামী লীগ সাত দশক ধরে অত্যন্ত বলিষ্ঠতার সঙ্গে এ দেশের রাজনীতির অগ্রভাবে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার পর ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে দলের নেতাকর্মীদের ওপর নেমে আসে জেল, জুলুম, হত্যাসহ চরম নির্যাতন, নিষ্পেষণ। ২১ বছর ধরে দলটিকে ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়। এরপর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে বিস্ময়করভাবে আবার ওঠে আসা। দলটির কতিপয় বৈশিষ্ট্য এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। সেসব হচ্ছেÑরাজনৈতিক বাস্তববাদিতা। (চড়ষরঃরপধষ জবধষরংস), পরিবর্তিত অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে চলন ক্ষমতা বা পরিবর্তনশীলতা (জবংঢ়ড়হংরাবহবংং/অফধঢ়ঃধনরষরঃু), দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা, অফুরন্ত ধারণ ক্ষমতা (অনংড়ৎনধনরষরঃু), উদ্ভাবন ক্ষমতা (ওহমবহঁরঃু), নবীন-প্রবীণের সেতুবন্ধ (জবপৎঁরঃসবহঃ) ইত্যাদি।
আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় পরিসরে গড়ে ওঠা আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির সমন্বয়, সমতা ও সম্প্রীতির মূল আদর্শ বা বৈশিষ্ট্য ধারণকারী দল। আওয়ামী লীগ আমাদের সমাজ-রাজনীতির মূলধারা। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া এ দেশের গণমানুষের দল আওয়ামী লীগের ক্ষয় নেই। আওয়ামী লীগের ইতিহাস বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম, স্বপ্ন, অর্জন ও উন্নয়ন-অগ্রগতির ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশের আপামর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে একটি রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে। সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার মমতা চিরন্তন। এখানেই অন্যদের থেকে আওয়ামী লীগের পার্থক্য। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুসংস্কারমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বা সোনার বাংলা। তাঁর অবর্তমানে তাঁরই কন্যা ও আদর্শের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনা সে স্বপ্ন-লক্ষ্য পূরণে দৃঢ় পদে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর হাত ধরেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্তির জাতিসংঘ-স্বীকৃতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন আজ অনেকের কাছে বিস্ময়কর। বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর কাছে উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশ ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যে সক্ষম হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগই সে স্বপ্ন-লক্ষ্য পূরণে নেতৃত্ব দেবে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্রষ্টা, স্থপতি। তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ইতিহাসে চিহ্নিত হবেন উন্নত-সমৃদ্ধ আধুনিক বাংলাদেশের নির্মাতা হিসেবে। জয়তু আওয়ামী লীগ।
লেখক : ভাইস-চ্যান্সেলর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়