প্রতিবেদন

ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট প্রকল্পসহ একনেকে ১৮ হাজার ৩৭২ কোটি টাকার ১৫ প্রকল্প অনুমোদন

নিজস্ব প্রতিবেদক : বর্তমানে প্রচলিত মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের (এমআরপি) পাশাপাশি চালু হতে যাচ্ছে ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট। এখন থেকে যিনি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করবেন, তাকে এমআরপি পাসপোর্টের পরিবর্তে ই-পাসপোর্ট দেয়া হবে। যারা এমআরপি পাসপোর্টের অধিকারী তাদের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ই-পাসপোর্ট নিতে হবে। ২১ জুন এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন একনেক চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
‘বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট ও স্বয়ংক্রিয় বর্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন’ শীর্ষক এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। সভা শেষে ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ এমআরপি গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমা শেষে তারা এমআরপির পরিবর্তে ই-পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক করবে। প্রচলিত এমআরপি ব্যবস্থায় ১০ আঙুলের ছাপ ডাটাব্যাজে সংরণের সুযোগ না থাকায় বর্তমান এমআরপি পাসপোর্টে জালিয়াতির আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। এ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একাধিক পাসপোর্ট করার প্রবণতাও ধরা পড়েছে। তাই সর্বশেষ প্রযুক্তির ই-পাসপোর্ট চালু করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ১০ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে জুলাই থেকে। তবে কবে নাগাদ ই-পাসপোর্ট হাতে পাওয়া যাবে সে বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরা সেবা বিভাগের আওতায় ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট সেবা অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ বিষয়ে বলেছেন, ই-পাসপোর্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জার্মানির একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জুন-জুলাইয়ের মধ্যে চুক্তি সম্পাদন করা হবে। আশা করা যায়, ডিসেম্বরের মধ্যে ই-পাসপোর্ট চালু করা সম্ভব হবে। তবে সেটা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে জার্মানির প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর। কারণ কাজটা তারাই করবে। তারা যদি বলে ডিসেম্বরের মধ্যে চালু করা সম্ভব হবে না, সে েেত্র সময় এক-দু মাস বেশি লেগে যেতে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব দেশে ই-পাসপোর্টের সুবিধা রয়েছে, সেখানে যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ বর্তমান বিশ্বের ১১৯ দেশে এই ধরনের পাসপোর্ট চালু আছে।
পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বই আকারে যে পাসপোর্ট আছে, ই-পাসপোর্টেও একই ধরনের বই থাকবে। তবে বর্তমান পাসপোর্টের বইয়ের শুরুতে ব্যক্তির তথ্যসংবলিত যে দুটি পাতা আছে, ই-পাসপোর্টে তা থাকবে না। সেখানে থাকবে পালিমারের তৈরি একটি কার্ড। এই কার্ডের মধ্যে থাকবে একটি চিপ। সেই চিপে পাসপোর্টের বাহকের তথ্য সংরতি থাকবে। ই-পাসপোর্টে ৩৮ ধরনের নিরাপত্তা ফিচার থাকবে। বর্তমানে এমআরপি ডাটাব্যাজে যেসব তথ্য আছে, তা ই-পাসপোর্টে স্থানান্তর করা হবে। পাসপোর্টের মেয়াদ হবে বয়সভেদে ৫ ও ১০ বছর। তবে ই-পাসপোর্ট চালু হলেও পুলিশ ভেরিফিকেশনের নিয়ম বাতিল হবে না। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সভায় অনেকেই পুলিশ ভেরিফিকেশন তুলে দেয়ার কথা বললেও একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী তা রাখার পে মত দিয়েছেন। এেেত্র প্রধানমন্ত্রী যুক্তি দিয়ে বলেছেন, ১০ আঙুলের ছাপসহ অন্যান্য তথ্য ব্যক্তির দৈহিক পরিচয় শনাক্ত করবে। কিন্তু ব্যক্তির সাম্প্রতিক সময়ের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন আছে। কারণ ব্যক্তি যেকোনো সময় অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে।
২১ জুন একনেক সভায় ই-পাসপোর্ট ছাড়াও আরো ১৪টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ১৮ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১১ হাজার ২২৯ কোটি টাকা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা ৫৮৮ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা পাওয়া যাবে। পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী হাওর এলাকায় আগামীতে যেসব রাস্তা তৈরি করা হবে সেগুলো এলিভেটেড পদ্ধতিতে করা হবে। যাতে নিচ দিয়ে নৌকা বা সাম্পান চলতে পারে। উপর দিয়ে রাস্তা থাকবে। তাহলে আলাদা করে ব্রিজ করতে হবে না। এক খরচেই সব কাজ হবে।
অনুমোদিত অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৬১১ কোটি টাকা। দেশব্যাপী ডিজিটাল টেরেস্ট্রিয়াল সম্প্রচার প্রবর্তন প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ২৫০ কোটি টাকা। ২১ জেলার সুবিধাবঞ্চিত নারী ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা প্রদান প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৯৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। ব্লু গোল্ড প্রোগ্রাম ফর ইন্টিগ্রেটেড সাসটেইনেবল ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট ইমপ্রোভিং দ্য ওয়াটার অ্যান্ড প্রোডাকটিভ সেক্টরস ইন সিলেকটেড পোল্ডারস ফিন্যানসিয়াল প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৬৬৩ কোটি টাকা। এস্টাবলিশমেন্ট অব ডিজিটাল ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থ্রো ডিজিটাল সার্ভে অ্যান্ড সেটেলমেন্ট অপারেশনস অব থ্রি সিটি করপোরেশনস ওয়ান পৌরসভা অ্যান্ড রুরাল উপজেলা অব বাংলাদেশ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৩৫১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। লোকাল গভর্নমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অন কাইমেট চেঞ্জ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ১৬৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। দণি-পশ্চিমাঞ্চলীয় ট্রান্সমিশন গ্রিড সম্প্রসারণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৩ হাজার ২৭৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ডিপিডিসির আওতায় ঢাকার কাওরানবাজারে ভূ-গর্ভস্থ উপকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৯৫০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। লং টার্ম সার্ভিস অ্যাগ্রিমেন্ট ফর ভেড়ামারা কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৬৫২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। লাকসাম এবং চিনকী আস্তানার মধ্যে ডাবল লাইন ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮১৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সিগন্যালিংসহ টঙ্গী ভৈরববাজার সেকশনে ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ২ হাজার ১৭৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৮৭৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের জন্য লজিস্টিকস ও ফিট মেইনটেন্যান্স ফ্যাসিলিটিজ গড়ে তোলা প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৪৪৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এছাড়া পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ১ হাজার ১৬২ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।