কলাম

উন্নয়নের পক্ষে জনরায় : প্রেক্ষিত সিটি করপোরেশন নির্বাচন

অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস : চলতি বছরের (২০১৮) শেষ নাগাদ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় নির্বাচনের আগে যৌক্তিক সময়েই গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচন হচ্ছে। ১৩ জুন রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২৬ জুন গাজীপুর সিটির নির্বাচন। ১৮ জুন থেকে গাজীপুরে নির্বাচনি প্রচারণা পুনরায় শুরু হয়েছে। এরপরই অনুষ্ঠিত হবে সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটিতে নির্বাচন। পাঁচ সিটি করপোরেশনের মধ্যে খুলনার নতুন মেয়র দায়িত্ব পাবেন ২৫ সেপ্টেম্বর, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ হবে ৪ সেপ্টেম্বর, সিলেটের ৮ সেপ্টেম্বর, রাজশাহীর ৫ অক্টোবর ও বরিশালের ২৩ অক্টোবর। গাজীপুর নিয়ে সীমানা জটিলতার মামলা নিষ্পত্তির পর স্থগিত নির্বাচন পুনর্নির্ধারণ করা হয় ২৬ জুন। খুলনার মতো এই চার সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠান যেন সুষ্ঠুভাবে হয় নির্বাচন কমিশনের সেই চেষ্টা করতে হবে। নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ রাখতে হবে, যাতে ভোটাররা নির্বিঘেœ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। মনে রাখা দরকার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে যা যা প্রয়োজন তা করতে হবে। আশার কথা হলো আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনসমূহ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টদের ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। নিরপেক্ষ নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনোরূপ ব্যত্যয় ঘটলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে; যা গণমাধ্যমের বদৌলতে সিইসির কণ্ঠে শোনা যায়।
বর্তমান বছরে অনুষ্ঠিতব্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী বিশ্লেষণ হচ্ছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এই নির্বাচনগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে বলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ নির্বাচনকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। গত ১৫ মে (২০১৮) খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক পেয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯০২ ভোট, বিপরীতে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৯৫৬ ভোট। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছে অবাধ সুষ্ঠু এবং সবার কাছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপসহ অন্যান্য নির্বাচনি পর্যবেক সংস্থার মতেও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন ছিল শান্তিপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক। কিন্তু আমরা ল্য করেছি যে কিছু সংগঠন, যাদের নির্বাচন পর্যবেণের অনুমতি নেই তারা প্রায়ই বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করার নামে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে। যেহেতু এই সকল সংস্থার সরাসরি পর্যবেণের মাধ্যমে প্রাথমিক তথ্য নেয়ার সুযোগ নেই সেহেতু তাদের তথ্যসূত্র নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সুতরাং এক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপ ব্যতীত অন্য কারো বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য।
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে অন্যতম একটি অভিযোগ ছিল বিএনপির নেতাকর্মীদের কেন্দ্রে যেতে দেয়া হয়নি। আসলে তাদের নেতাকর্মীদেরকে কেন্দ্রের বাইরে বা অন্য কোথাও দেখা যায়নি। ওই নেতাকর্মীরা দলের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধও না। বিএনপি’র যেকোনো কর্মসূচিতে জনশূন্যতাই এটা প্রমাণ করে। নেতাকর্মীরাও উপলব্ধি করতে পারছে যে তাদের দীর্ঘদিনের সহিংস কর্মকা-ই তাদেরকে জনগণ থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো বিএনপি যদি তার নেতাকর্মীদেরকে মাঠে নামাতে না পারে তার দায়ও কি সরকারকে নিতে হবে?
মূলত খুলনা সিটি নির্বাচন ছিল উন্নয়নের প্রতি জনগণের রায়ের প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বাংলাদেশের জনগণ তাদের ভোটের মাধ্যমে মূল্যায়ন করেছে। এই অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষকে ুধা, দারিদ্র্য, অশিার হাত থেকে মুক্ত করে একটি সুন্দর জীবন নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছিলেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও তিনি কাক্সিত ল্য অর্জনের জন্য উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দেন। কিন্তু পঁচাত্তরে অগণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির উত্থানের ফলে তা ব্যাহত হয়; যা দীর্ঘ ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবার পুনরুজ্জীবিত হয়।
শেখ হাসিনার সৎ, বলিষ্ঠ এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই আজ বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। তিনি টাইম ম্যাগাজিনের বিবেচনায় বিশ্বের প্রভাবশালী ১০ নারী নেত্রীর একজন মনোনীত হয়েছেন। অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তার দিক থেকেও শেখ হাসিনার সমক হিসেবে কাউকে চিন্তা করার কোনো অবকাশ নেই। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ জরিপে দেখা যায় যে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে বাংলাদেশ সঠিক নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে, যা ২০১৫ সালে ছিলো ৬২ শতাংশ। এ থেকেই প্রতীয়মান হয় যে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা দিন দিন অপ্রতিরোধ্যভাবে বেড়েই চলেছে। এমন নেতৃত্বের কারণেই মহাকাশে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎপেণের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রযুক্তিগতভাবে তার অগ্রসরতা জানান দিয়েছে। সন্ত্রাসবাদ এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুসংহত করার পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং অগ্রসরতার প্রতি জনগণের বিশ্বাস, আস্থা এবং ভালোবাসাই খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছে। জনগণ খুলনা নগরীকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকা-ের সাথে সম্পৃক্ত করতে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেছে। দেশের মানুষ বিগত বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলের সাথে তুলনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। যারা জনগণের উন্নয়নের রাজনীতি করে জনগণ তাদের পাশে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং গাজীপুরসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ আবার উন্নয়নের পে রায় দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে এটাই আমাদের বিশ্বাস।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই অন্য আরও তিনটিÑ রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সঙ্গে খুলনার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ চারটি নির্বাচনেই মতাসীন আওয়ামী লীগের বিদায়ী মেয়ররা, যাঁদের প্রায় সবাই মেয়র হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত সফল ও বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। সেসময় ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দাপট ছিল বেশি। অবশ্য পরপর ৫টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বড় ব্যবধানে মতাসীনদের পরাজয়ের পরও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিল। এবার সেই ধারায় আরো কিছু সাফল্য যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সকল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ী হয়ে জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ তাদের জয়ের ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হবে এবং পুনরায় ক্ষমতায় আসীন হবে বলে দেশের আপামর জনসাধারণ বিশ্বাস করে।