কলাম

কেমন হলো ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট

ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী : ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ঘোষিত বাজেটটি এক কথায় বলা চলে জনকল্যাণমূলক বাজেট। এ বাজেটটি ৩টি সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবেÑ অক্টোবরের পূর্ব পর্যন্ত বর্তমান সরকার, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্বাচনি সরকার এবং জানুয়ারি থেকে নির্বাচিত আরেকটি সরকার। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার আরেকবার মতায় এলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি, মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন, সুষমবণ্টন ব্যবস্থা, কর্মোপযোগী শিাবান্ধব পরিবেশ, সামাজিক সুরা-সুব্যবস্থা ও মানব উন্নয়নের প্রয়াস অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ঘোষিত হয়েছে এ বাজেটে। আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার হচ্ছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে মোট জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ হবে বলে উল্লেখ করা হয়। নারীর অধিকার সুরা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, দারিদ্র্য দূরীকরণ, টেকসই উন্নয়ন, আঞ্চলিক পর্যায়ে অভিবাসন, লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার কথাও অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন।
আইএমএফ-এর হিসাব মতে, বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ ৪৩তম বড় অর্থনীতির অংশীদার এবং ক্রয়মতার বিচারে ৩২তম বড় অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে টপ-ডাউন অ্যাপ্রোচ ও বটম-আপ অ্যাপ্রোচের মধ্যে সমন্বয় থাকা উচিত। রাজস্ব আরোপের যে কৌশল বিধৃত হয়েছে তা বাস্তবায়নযোগ্য হলেও এজন্য কাজের ধারাবাহিকতা রা করতে হবে। কেননা আগামীতে ৩টি সরকারের মধ্য দিয়ে এ বাজেট বাস্তবায়িত হবে। বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৫২ মার্কিন ডলার, মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, রপ্তানি আয় ৩৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ও দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার হচ্ছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। বোঝাই যায়, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
ভ্যাটের েেত্র স্ল্যাব ৯টি থেকে হ্রাস করে ৫টি করা হয়েছে। এটি সুসমন্বিত করা একটি ভালো উদ্যোগ। আশা করি, ভ্যাট আদায়ে রাজস্ব কর্মকর্তারা অধিকতর দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন। বর্তমানে পাবলিক ট্রেডেড কোম্পানির েেত্র করপোরেট ট্যাক্সের হার হচ্ছে ২৫ শতাংশ এবং নন-পাবলিক ট্রেডেড কোম্পানির েেত্র করপোরেট ট্যাক্সের হার হচ্ছে ৩৫ শতাংশ। তালিকাভুক্ত নয় এমন ব্যাংক, মোবাইল ফোন ও সিগারেটের ওপর করপোরেট ট্যাক্সের হার হচ্ছে ৪০ শতাংশের বেশি। এটি ঘোষিত বাজেটে আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। যে সাধু উদ্যোগ নিয়ে করপোরেট ট্যাক্স কমানো হয়েছেÑ তা যাতে প্রসারিত হয়, ব্যাংক যেন বিনিয়োগের সুদের হার কমায় এবং স্বেচ্ছায় কর প্রদান করে সে ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে। এদিকে আয়কর নতুন করে না বাড়ায় জনমনে আশার সৃষ্টি হয়েছে। দুটো গাড়ির েেত্র সারচার্জ বসানো যৌক্তিক হয়েছে।
ঘোষিত বাজেটে অতিরিক্ত ১০ লাখ লোককে সেফটি নেটের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৯৬ লাখ লোক সেফটি নেটের আওতায় আসবে। বর্তমান সরকার জনকল্যাণের কথা বিবেচনায় এনে দলিত, ুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও দুস্থ মানুষের কল্যাণে গত সাড়ে ৯ বছর ধরে বাজেটের আওতায় ও বাজেট বহির্ভূত নানা উপায়ে কাজ করে চলেছে। এসডিজি বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরে যে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেটি বাস্তবায়নে যথেষ্ট কাজ হচ্ছে। তবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকা- প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় ঘটলে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত অনেক বেশি বাড়ানো সম্ভব হতো। আসলে বিবিএসের হিসাবে দেখা যায় দেশে ৮৭ শতাংশ কর্মকা- পরিচালিত হয় অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে আর ১৩ শতাংশ কর্মকা- পরিচালিত হয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে। ফলে যারা অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় কাজ করে তাদেরকে করের আওতায় আনতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। এজন্য সুশৃঙ্খল একটি পদ্ধতি উদ্ভাবনের ব্যবস্থা করতে হবে এনবিআরকে। অন্যদিকে যারা একের অধিক কাজ করে থাকে অথচ একটি চাকরির েেত্র কেবল কর দিয়ে থাকে তাদের থেকে কর আদায়ের ব্যবস্থা করা দরকার। আর যারা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় কর দিচ্ছে না তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
কর আদায় বাড়লেও গত ১০ বছরে কিন্তু কর-জিডিপির অনুপাত মাত্র ১০ শতাংশ। অথচ গত ১০ বছরে মানুষের আয়প্রবাহ বেড়েছে বেশ কয়েকগুণ। সে অনুপাতে কর-জিডিপির অনুপাত বাড়েনি। আমাদের দেশে সমস্যা হচ্ছে নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত স্ব স্ব অবস্থানে থেকে কর প্রদানে দারুণ অনীহা দেখায়। এমনকি প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক েেত্র কর দেয় না। সরকার যে সমস্ত উন্নয়নমূলক কর্মকা- চালু করেছে সেগুলো বাস্তবায়নে অবশ্যই কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। কেননা নেপালে কর-জিডিপি অনুপাত হচ্ছে ১৭ শতাংশ ও ভারতে কর-জিডিপি অনুপাত ২৭ শতাংশ। কর-জিডিপি অনুপাত না বাড়ানো গেলে দেশের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমসমূহের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কষ্টসাধ্য হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক প্ল্যান্ট, পদ্মাসেতু, পদ্মা রেললাইন সংযোগ ও মেট্রোরেল। সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে কুমিল্লা-গোমতী-মেঘনা-কাঁচপুর বরাবর রেললাইনের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়ার। যদি কুমিল্লা-গোমতী-মেঘনা-কাঁচপুর বরাবর রেললাইনের সংযোগ তৈরি করা যায় তবে ঢাকার ওপর বাড়তি চাপ কমে যাবে। এ জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় পদপে গ্রহণ করতে হবে। এদিকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎপেণ করা একটি জাতীয় অর্জন।
শিাকে প্রাধান্য দেয়ার জন্যই বিদ্যালয়হীন এলাকায় ১ হাজার প্রাথমিক স্কুল বিল্ডিং তৈরির জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। আসলে শিার উন্নয়নে সরকার নানামুখী পদপে গ্রহণ করেছে। বস্তুত বৈশ্বিক পরিবেশে ঘোষিত বাজেটে মানবকল্যাণের যে প্রত্যয় ঘোষিত হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হলে আন্তরিকতার সঙ্গে বরাদ্দকৃত অর্থের সদ্ব্যবহার ও কর আদায়ে নৈতিকতা ও সততা দরকার। রাজনৈতিক ছাতার নিচে সমাজ গঠনে বাজেট ঘোষিত হয়েছেÑ যাতে করে নতুনভাবে কর আরোপিত না হয়। তবে কর আদায়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে; যা চলতি সংশোধিত বাজেটের ৩২ শতাংশ বেশি। এদিকে সরকার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজারের মতো প্রাথমিক শিা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি একটি শুভ উদ্যোগ। প্রাইমারি শিার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের পাঠ-পঠনের মান বৃদ্ধি করতে হলে অবশ্যই আত্মনির্ভরশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়। না হয় উন্নয়নের স্বাভাবিক নিয়মে পরমুখাপেী শিকদের পে উন্নত শিা দেয়া সম্ভব নয়। এজন্য কারিগরি শিার পাশাপাশি শিকদের বেতন বৃদ্ধি করা দরকার।
এবারের বাজেটে ইউনিভার্সেল পেনশন স্কিমের একটি রূপরেখা দেয়া হয়েছে। আসলে বেসরকারি খাতে পেনশন দেয়ার প্রচলন এদেশে খুব একটা নেই বললেই চলে। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির নিশ্চয়তা যেমন নেই, তেমনি সময়মতো বেতন-ভাতাদি পরিশোধ করা হয় না। বিষয়টি আসলে অতীব দুঃখজনক।

এদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়ি তৈরির জন্য ঋণ দেয়া হবে। এটি একটি বিশেষ প্রণোদনা। এর ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের গতি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকার বিগত সাড়ে ৯ বছরে যে সমস্ত উন্নয়নমূলক কাজ করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, দেশকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের মহাসড়কে উন্নীতকরণ, ডিজিটালাইজেশন করা, জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার গত ১০ বছরে গড়ে ৭ শতাংশের অধিক হারে উন্নীত করা, মূল্যস্ফীতির হার হ্রাস করে সহনীয় পর্যায়ে রাখাÑ এগুলো আসলে বাজেট কার্যক্রমের মাধ্যমে রাজস্বনীতি সুস্পষ্ট করাই বহিঃপ্রকাশ। ব্যাংকিং সেক্টরে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তা সাময়িক। এটি সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনাগত কলা-কৌশল দ্বারা উত্তরণ সম্ভব। ব্যবসা করতে গেলেই বিজনেস সাইকেলের নিয়ম অনুসারে ওঠা-নামা থাকবেই। এটি নিয়ে অযথা প্রোপাগান্ডা থেকে বিরত থাকা উচিত। পাবলিক লিমিটেড ব্যাংকগুলোকে বন্ডের মাধ্যমে তাদের মূলধন ঘাটতির ব্যবস্থা করতে হবে।
শিল্পায়নের জন্য পুঁজিবাজারকে আরো শক্তিশালী রাজস্বনীতি দ্বারা পরিচালিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। ঘোষিত বাজেটকে কৃষিবান্ধব ও জনবান্ধব বলাই বাঞ্ছনীয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে; যার কার্যক্রম যেন ১ জুলাই থেকে শুরু করা যায়Ñ সেজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অধিকতর মনোযোগী হতে হবে। সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ওপর ঘোষিত বাজেটে গুরুত্ব আরোপ করা হলেও এটি বাস্তবায়ন যাতে হয়, সেজন্য ধারাবাহিকতা রা করাটাই গুরুত্বপূর্ণ। যে উচ্চতায় সরকার দেশের অর্থনীতিকে নিয়ে গেছেন তা যেন বজায় থাকে সে ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতকেই ভূমিকা রাখতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক
ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়্যাল ইকোনমিস্ট