রাজনীতি

জাতীয় নির্বাচনের আগেই নিষ্পত্তি হচ্ছে খালেদা জিয়ার আপিল সাজার রায় বহাল থাকার আতঙ্কে শঙ্কিত বিএনপি নেতাকর্মীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের আগেই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার সাজার রায়ের বিরুদ্ধে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার করা আপিল হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হচ্ছে। ২৪ জুন ওই আপিলসহ মোট ৪টি আপিলের ওপর শুনানির দিন ধার্যের জন্য আবেদন জানিয়েছে রাষ্ট্রপ ও দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বেই খালেদা জিয়ার আপিলের ওপর উচ্চ আদালত থেকে রায় আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। ওই রায়েই জানা যাবে নিম্ন আদালতের দেয়া সাজা বহাল থাকবে কি না। নিম্ন আদালতের দেয়া সাজা উচ্চ আদালতে বহাল থাকলে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অংশ নিতে পারবেন না। আর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না সে নিয়েও সন্দেহ থেকে যায়। বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ধরেই নিয়েছে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেয়ার আইনগত অধিকার হারালে বিএনপি কিছুতেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাবে না। সেক্ষেত্রে বিএনপির যেসব নেতা বাদবাকি ২৯৯ আসনে নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আছেন, তাদের কথা ভেবে প্রার্থী ও সম্ভাব্য প্রার্থীর পাশাপাশি সকল স্তরের নেতাকর্মীরাই গভীর চিন্তায় আছেন। বিএনপির অনেক নেতা ইতোমধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার সবুজ সংকেত পেয়ে অনেক টাকা-পয়সাও খরচ করে ফেলেছেন। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার কারণে যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে বিএনপির এসব নেতার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়েও শঙ্কিত বিএনপির অনেক নেতাকর্মী।
তবে সে যা-ই হোক, এখন বিএনপির নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার সাজা বাতিল সংক্রান্ত আপিল, রিভিউ এবং খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের কার্যক্রমের দিকে চেয়ে আছেন। দুদক আইনজীবী খুরশীদ আলম খান জানিয়েছেন, সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী শুনানির দিন ধার্যের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, আপিল বিভাগ ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার আপিল নিষ্পত্তি করতে হাইকোর্টকে নির্দেশনা দিয়েছেন। সর্বোচ্চ আদালতের এই নির্দেশনা হাইকোর্টের জন্য বাধ্যতামূলক। এখানে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়ার কোনো অবকাশ নেই। সেই হিসাবে ২৪ জুন কোর্ট খোলার দিনই বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে শুনানির দিন ধার্যের আবেদন জানানো হয়েছে।
এদিকে আপিল বিভাগের রায়ের এই নির্দেশনা পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ পিটিশন দায়েরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাঁর অন্যতম আইনজীবী সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার এম মাহবুবউদ্দিন খোকন বলেন, আপিল নিষ্পত্তির জন্য যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত তা বৈষম্যমূলক। এ ধরনের নির্দেশনা অন্য কোনো মামলায় ইতঃপূর্বে দেয়া হয়নি। আর এ কারণেই এই বেঁধে দেয়া সময়সীমার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রিভিউ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি।
চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদ- দেয় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫। রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন ছাড়াও তার ছেলে তারেক রহমানসহ আরো ৫ জনকে ১০ বছরের কারাদ- ও অর্থদ- দেয় আদালত। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন খালেদা জিয়া। আপিলে নিম্ন আদালতের দেয়া সাজা বাতিল করে তাকে বেকসুর খালাস দেয়ার আবেদন জানানো হয়। পাশাপাশি জামিনও চান তিনি। গত ১২ মার্চ বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ খালেদা জিয়াকে চার মাসের জামিন দেয়। একইসঙ্গে ওই সময়ের মধ্যে মামলার পেপারবুক প্রস্তুতের জন্য হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখাকে নির্দেশ দেয়া হয়। ওই জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপ ও দুদক আপিল করে। গত ১৬ মে ওই আপিল খারিজ করে দিয়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ খালেদা জিয়ার জামিন বহাল রাখেন। পাশাপাশি সাজার বিরুদ্ধে তার করা আপিল ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হাইকোর্টকে নির্দেশনা দেয় আপিল বিভাগ।
গত ১১ জুন আপিল বিভাগের রায়ের অনুলিপি প্রকাশ পায়; কিন্তু সুপ্রিমকোর্টে অবকাশকালীন ছুটি চলায় ২৪ জুন হাইকোর্টে আপিল শুনানির দিন ধার্যের আবেদন জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্রপ ও দুদক। সে অনুযায়ী আবেদন জানানোও হয়।
বিএনপি চেয়ারপারসনের পাশাপাশি হাইকোর্টে শুনানি হবে দ-প্রাপ্ত কারাবন্দি আরো দুই আসামির আপিলের। এরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকনো কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমদ। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দুইজনই দশ বছরের সশ্রম কারাদ-প্রাপ্ত। ওই সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন তারা। হাইকোর্ট ইতোমধ্যে দ-িতদের আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেছে। এদিকে খালেদা জিয়ার সাজা বৃদ্ধি চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করে দুদক। ওই আবেদনের পরিপ্রেেিত বিএনপি চেয়ারপারসনের সাজা কেন বৃদ্ধি করা হবে নাÑ এই মর্মে রুল জারি করে হাইকোর্ট। ওই তিন আপিলের সঙ্গে এই রুলের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান দুদক আইনজীবী খুরশীদ আলম খান।
এদিকে আপিল শুনানির জন্য সকল ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন উভয় পরে আইনজীবীরা। ইতোমধ্যে তারা পেপারবুক সংগ্রহ করেছেন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে। পর্যালোচনা করছেন মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। তবে বিএনপি নেতারা বুঝতে পেরেছেন, খালেদা জিয়া আষ্টেপৃষ্ঠে মামলার জালে জড়িয়ে পড়েছেন। খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের শৈথিল্যের কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। স্বেচ্ছাচারিতার কারণে অন্তত তিনটি মামলার জামিন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা নেননি। ফলে জিয়া ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের কারাদ- হলে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও খালেদা জিয়া জেল থেকে বের হতে পারেননি। এখন বিএনপির নেতাকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, পুরো ৫ বছরই খালেদা জিয়াকে জেলে থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ ইস্যুতে দলটির সকল স্তরের নেতাকর্মীরাই চিন্তিত ও শঙ্কিত।