রাজনীতি

জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্তহীনতায় বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কাউন্ট-ডাউন্ট শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, অক্টোবরে তারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং ডিসেম্বরে নির্বাচন আয়োজন করতে চান। সে হিসাবে বলা যায়, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আর ১০০ দিনেরও কম সময় বাকি আছে।
সূত্র জানায়, মতাসীন আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাচনের জন্য শতভাগ প্রস্তুত। বিপরীতে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগছে। তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন করবে না নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করবে সে নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। তবে নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হতে আগ্রহীরা স্থানীয়ভাবে প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি লবিংয়েও ব্যস্ত। যদিও বিএনপি এখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে নিশ্চিত করে প্রকাশ্যে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি, তারপরও অন্তরালে তাদের প্রস্তুতি থেমে নেই।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, নতুন ভোটাররাই আগামী নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে বড় নিয়ামক হবে। তারাই মূল ফ্যাক্টর। অতীতেও প্রতিটি নির্বাচনে তারাই জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে মূল ভূমিকা পালন করে এসেছে। ফলে আগামী নির্বাচনে নবীন ভোটারদের কাছে টানতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। প্রায় আড়াই কোটি নতুন-তরুণ ভোটারকে পে রাখতে কৌশল হিসেবে মতাসীনরা এবার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তরুণদের নানা সুযোগ-সুবিধা ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহার, প্রণীত হচ্ছে নির্বাচনি কৌশল। নানা প্লাটফর্মে তরুণদের কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। বিগত বিভিন্ন সংসদ নির্বাচনের ভোটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন ভোটাররাই মূলত প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩৭৮ ভোট (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ১৫৩ আসন ছাড়া)। জাতীয় পার্টি পেয়েছিল ১১ লাখ ৯৯ হাজার ৭২৭ ভোট। আর নবম সংসদ নির্বাচনে মতাসীন আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার ৬২৯ ভোট। আর বিএনপি পেয়েছিল ২ কোটি ২৭ লাখ ৫৭ হাজার ১০০ ভোট। আর অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছিল ২ কোটি ২৮ লাখ ৩৩ হাজার ৯৭৮ ভোট। আর আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২ কোটি ২৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫১৬ ভোট। সেই হিসাবে নবম থেকে এ পর্যন্ত ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়া ২ কোটি ৩৫ লাখ ১২ হাজার ৯৯৭ জন নতুন ভোটার মতায় যাওয়ার নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। আওয়ামী লীগ মনে করে, এ েেত্র যদি তারা নতুনদের ভোট টানতে পারেন তাহলে আগামীতে তারা আবারো মতায় যাবেন।
চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি সর্বশেষ হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রকাশ করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। চলতি বছর হালনাগাদ ভোটার তালিকায় যোগ হয়েছেন ৪৩ লাখ ২০ হাজার নতুন ভোটার। নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, নবম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের পর থেকে ১০ বছরে দেশে নতুন ভোটার বেড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখের মতো। এদের মধ্যে অধিকাংশের বয়স এখন ১৮ থেকে ২৮ বছর। এদের মধ্যে ১ কোটি ২১ লাখ ৩৪ হাজারের অধিক ভোটার এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার পেয়েছেন। বাকি তরুণ ভোটাররা দশম জাতীয় সংসদে প্রথম ভোটাধিকার পেয়েছিলেন।
এ কারণটিকেই প্রাধান্য দিয়ে তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে নির্বাচনি কৌশল সাজাচ্ছে আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে ফার্স্টটাইম ভোটারদের মন জয় করতে চাচ্ছে দলটি। এজন্য বিগত দুবারের মতো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী মনোনয়নে তারুণ্যনির্ভর এবং জনপ্রিয়দের বাছাই করছে মতাসীনরা। এছাড়া এবার দলের নির্বাচনি ইশতেহারেও তরুণ সমাজকে আকৃষ্ট করার মতো বিষয় থাকবে। তরুণদের জীবনমানের উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব তা চূড়ান্ত করার ল্েয ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। ১৩৬ সদস্যের কমিটি ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এ কমিটির চেয়ারপারসন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সারাদেশে দলের সদস্য সংগ্রহ অভিযানেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে ‘জীবনে প্রথম ভোটার হলেন’ এমন তরুণদের। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও সম্প্রতি দলীয় একাধিক বৈঠকে বলেছেন, এবার আমাদের প্রধান টার্গেট তরুণ ও নারী ভোটার। বিশেষ করে ফার্স্টটাইম ভোটার। এজন্য তারুণ্যনির্ভর এবং তরুণদের কাছে জনপ্রিয় ও উইনেবল প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে আওয়ামী লীগ।
জানা গেছে, ‘আওয়ামী লীগ পারে, আওয়ামী লীগই পারবে’ এই মূলমন্ত্রই থাকবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে। টানা দুই মেয়াদে মতায় থেকে তরুণদের জন্য আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার কী কী করেছে, সেসবের বিবরণ থাকবে। এবার নির্বাচনি ইশতেহারে তরুণদের জন্য আলাদা চমক রাখবে মতাসীন দলটি।
অপরদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাগারে থাকলেও আগামী নির্বাচনের জন্য বিএনপি প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়ন করছে। প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে নির্বাচনের। বেগম জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগেই ইশতেহারের খসড়া প্রণয়ন করা হয়। এর পুরোভাগে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে নতুন ভোটারদের আকর্ষণ করে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে। বিএনপি ঘোষিত রূপকল্প ২০৩০-এর আলোকে এই ইশতেহার হচ্ছে। ইতোমধ্যে দলে নতুন সদস্য সংগ্রহ অভিযানেও নতুন ভোটারদের টার্গেট করে দলে অন্তর্ভুক্ত করানোকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। জানা গেছে, নির্বাচন সামনে রেখে তরুণ ভোটারদের বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে তাদের ভোট পেতে দলটির নির্বাচনি ইশতেহারেও থাকছে নতুন কর্মসংস্থান, বেকার ভাতাসহ নানা প্রতিশ্রুতি।
তবে বিএনপি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখলেও তারা এখনো সিদ্ধান্তহীন যে তারা আদৌ নির্বাচনে যাবে কি না। খালেদা জিয়া জাতীয় নির্বাচনের আগে মুক্তি পাবেন কি না, মুক্তি পেলেও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না, খালেদা জিয়া মুক্তি না পেলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি আন্দোলনে যাবে কি নাÑ এসব নিয়েই বিএনপি নেতারা এখন সিদ্ধান্তের দোলাচলে আছেন। ফলে বলা যায়, এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য যতটা প্রস্তুত, বিএনপি ততটাই অপ্রস্তুত ও সিদ্ধান্তহীন। তাই নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনি দৌড়ে আওয়ামী লীগের তুলনায় এখনও অনেক পিছিয়ে আছে বিএনপি।