প্রতিবেদন

জাতীয় সংসদে বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী : সরকারের প্রচেষ্টায় গত এক বছর রেকর্ড সংখ্যক ১০ লাখ ৮ হাজার ৫২৫ জন কর্মী বিদেশে প্রেরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক : গত ১৮ জুন জাতীয় সংসদে সরকারি দলের নুরজাহান বেগমের এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেছেন, গত বছর ১০ লাখ ৮ হাজার ৫২৫ জন কর্মী প্রেরণ করে বাংলাদেশ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড স্থাপন করেছে। মন্ত্রী বলেন, ২০১৬ সালে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩১ জন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, বর্তমান সরকারের শ্রম কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেই বাংলাদেশি কর্মী গমন করেছে। বাংলাদেশ থেকে বর্তমান বিশ্বের ১৬৫টি দেশে কর্মী পাঠানো হচ্ছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরবে ৫ লাখ ৫১ হাজার ৯৫৪ জন কর্মী গমন করেছে। সম্প্রতি চলতি বছরের ১৮ এপ্রিলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে গৃহকর্মের পেশায় কর্মী পাঠানোর বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়েছে।
সরকারি দলের আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, জাপানে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন প্রেরণের বিষয়ে ২০১৭ সালে মার্চে একটি সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়েছে। ওই সমঝোতার আলোকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে ইন্টারন্যাশনাল ম্যানপাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (আইএম-জাপান)-এর সহযোগিতায় জাপান টেকনিক্যাল ইন্টার্ন গমন শুরু হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে দুইটি ব্যাচে ৩১ জন জাপানে গমন করেছে। এছাড়াও চলতি বছরের জানুয়ারিতে অধিকহারে কর্মী প্রেরণের বিষয়ে একটি সহযোগিতা স্মারক স্বারিত হয়েছে। তিনি বলেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কর্মী প্রেরণের জন্য মালয়েশিয়ার সাথে বাংলাদেশ সরকারের জি-টু-জি প্লাস প্রক্রিয়ায় কর্মী প্রেরণের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়েছে। এর আওতায় মালয়েশিয়ায় কর্মী গমন অব্যাহত রয়েছে এবং ২০১৭ সালে ৯৯ হাজার ৭৮৭ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় গমন করেছে। মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারে শ্রমিক প্রেরণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ৫২টি শ্রমবাজার গবেষণার কার্যক্রম চলমান
রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী জাতীয় সংসদকে জানান, বিদেশে কর্মী প্রেরণের েেত্র বর্তমানে কোনো জটিলতা নেই। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে শ্রমিক প্রেরণ বন্ধ নেই। সরকারের শ্রমকূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেই বাংলাদেশি কর্মী গমন করছে।
সংসদ সদস্য সেলিম উদ্দিনের অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী জানান, ২০১৮ সালে বিদেশে গমনকারী নারীকর্মীর সংখ্যা ৫৫ হাজার ১৪৯ জন এবং বর্ণিত সময়ে সমস্যার কারণে দেশে ফেরত আসা কর্মীর সংখ্যা ৩৬৯ জন। তিনি জানান, বৈদেশিক কর্মসংস্থানে গমনকারী কর্মীরা প্রতারিত হলে বা দেশে ও বিদেশে সমস্যার সম্মুখীন হলে সরাসরি অভিযোগের পাশাপাশি অনলাইনের মাধ্যমে বিএমইটি/মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দাখিল করে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ হয়েছে। তাছাড়া মহিলা কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ওমান এবং সৌদি আরবের জেদ্দা ও রিয়াদে সেইফ হোম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিদেশগামী নারী কর্মীদের জন্য এক মাসের ট্রেনিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিদেশে গিয়ে ভাষাগত সমস্যার সম্মুখীন যেন হতে না হয় সে ল্েয এ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে টিটিসিগুলোতে জাপানিজ ক্যান্টনিজ, আরবি, ইংরেজি ও কোরিয়ান ভাষা প্রশিণ কোর্স চালু করা হয়েছে।
সরকার দলীয় সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি জানান, সরকারের গৃহীত নানামুখী কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও কর্মী প্রেরণের ধারা অব্যাহত রাখতে প্রচলিত শ্রমবাজারের পাশাপাশি সরকার নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের কারণে ৫ হাজার ৩৫ জন বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হয়ে জেলে রয়েছেন। আটক বাংলাদেশিদের মুক্তকরণের ল্েয সরকার সকল ধরনের আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। এজন্য বাংলাদেশ দূতাবাস/হাইকমিশনের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা প্রদান করা হয়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি জাতীয় সংসদকে জানান, বিদেশে কর্মী নিয়োগে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য হ্রাসে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদ- এবং ন্যূনতম ৫ লাখ টাকা অর্থদ-ের মতো কঠোর শাস্তির বিধান রেখে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন-২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে দোষী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তাৎণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে বিদেশে কর্মী প্রেরণ বৃদ্ধি সত্ত্বেও রেমিট্যান্স প্রেরণে নিম্নগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকার রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় পদপে গ্রহণ করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নামে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ রেমিট্যান্স হ্রাসের অন্যতম কারণ। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির ল্েয বিভিন্ন পদপে গ্রহণ করা হয়েছে। অবৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টায় ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সেক্টরে কর্মী গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। ফলে ২০১৭ সালে দেশটিতে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়। এর বাইরে ২০১৭ সালের মার্চে আইএম জাপানের সঙ্গে টেকনিক্যাল কর্মী পাঠানোর বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বার হয়েছে। ফলে দেশটিতে বাংলাদেশিরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরিশাস ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে দ্বিপাকি চুক্তি হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গেও কর্মী প্রেরণ সংক্রান্ত চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর ফলে প্রতি বছরই বিদেশে কর্মী প্রেরণের বিপুল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৮টি দেশে ১৯টি নতুন শ্রম কল্যাণ উইং খোলা হয়েছে। এরই মধ্যে ২০১৭ সালে লেবানন ও মরিশাসে শ্রম কল্যাণ উইং চালু হয়েছে। বর্তমানে ২৭টি দেশের মিশনসমূহে ৩০টি শ্রম কল্যাণ উইং অভিবাসন সমর্থিত কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করছে। সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারণে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ভূমিকাকে স্বীকার করেছেন। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালে মোট ৭ লাখ ৪২ হাজার ৫১৬ জনকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিণ দিয়ে দ করে তুলেছে। চলতি বছর সংস্থাটির কর্মী প্রশিক্ষণ দেয়ার সংখ্যা ৫ লাখ অতিক্রম করেছে।