অর্থনীতি

দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে শেয়ারবাজার চাঙা করার বিকল্প নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক :L প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিয়মিত না হওয়ায় শেয়ারবাজার যেন চাঙাই হচ্ছে না। গত প্রায় ৫ বছর ধরে শেয়ারবাজারের অবস্থা যেমন ছিল, এখনো অনেকটা তেমনি আছে। ফলশ্রুতিতে শেয়ারবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছেই না। এতে পতনের ধারাতেই চলছে এ বাজার। আর টানা পতনে বাজারবিমুখ হয়ে পড়ছেন সব শ্রেণির বিনিয়োগকারী। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগকারীরা বাজারে ঢুকছে না। এমনকি নতুন নতুন আইপিও তাদের পুঁজিবাজারের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারছে না। যে কারণে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে নতুন বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা। গত মাসে মাত্র ২ হাজার বিও অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, যা এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন। অন্যদিকে পুরাতন বিও অ্যাকাউন্টও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রাইমারি মার্কেটে আইপিও আবেদনকারীদের প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এরপর আইপিও শিকারিদের আধিপত্য, আর তিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের কোটার পরে নতুন আইপিও পাওয়াটা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য কমে গেছে বিও অ্যাকাউন্ট খোলার সংখ্যা। এছাড়া শেয়ারবাজারের অবস্থা করুণ হওয়ায় এই পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। সম্প্রতি বাজারে কয়েকটি কোম্পানির আইপিও থাকলেও এ অফার বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারে টানতে পারছে না।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্যে দেখা গেছে, গত মে মাসে নতুন বিও অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে ২ হাজারেরও কম। এপ্রিল শেষে বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ২৭ লাখ ৮১ হাজার ৭৩৬টি। মে শেষে তা বেড়ে হয়েছে ২৭ লাখ ৮৩ হাজার ৬১৯টি। এদিকে মার্চের শেষে বিও হিসাবসংখ্যা ছিল ২৭ লাখ ৭৭ হাজার ৩৩৪টি। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে বিও বেড়েছে ৪ হাজারের কিছু বেশি। অন্যদিকে জানুয়ারি শেষে মোট বিও হিসাব খোলা হয় ২৬ হাজার।
নতুন বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট রকিবুর রহমান স্বদেশ খবরকে বলেন, তুলনামূলকভাবে সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে প্রাইমারি মার্কেটের প্রতি সবার আগ্রহ বেশি থাকে; কারণ এখান থেকে বেশি মুনাফা করা যায়। এ কারণেই বাজারে আইপিওর প্রস্তাব থাকলে বিও হিসাব বাড়ে। তবে সম্প্রতি এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে। তবে আগামীতে এ পরিস্থিতি বদলে যাবে বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বের সব পুঁজিবাজারেই উত্থান-পতন আছে। এটা খুবই স্বাভাবিক।
বর্তমানে যে বিও অ্যাকাউন্ট রয়েছে, এর মধ্যে সারাদেশে পুরুষদের ২০ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫৪টি এবং নারীদের বিও হিসাব ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৮২৮টি। আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে চালু আছে ১২ হাজার ১৩৭টি বিও এবং প্রবাসীদের রয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৯২টি। বিও হ্রাস পাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে আইপিও শিকারি ও কোটাকে দায়ী করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। পুঁজিবাজারে এমন লোক রয়েছে যারা নামে-বেনামে শত শত অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করেন। এরপর ২০ শতাংশ শেয়ার বরাদ্দ থাকে তিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য, যে কারণে এসব বিনিয়োগকারীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। অন্যদিকে প্রবাসীর নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে আবেদন করছেন অসংখ্য লোক। যে কারণে নতুন বিও খোলার আগ্রহ কমে গেছে।
২০১০ সালের পর থেকে মূলত বিনিয়োগকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারের প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হয়। ওই ধসের পর বাজার ছাড়তে শুরু করেন অনেকে। পুঁজিবাজারমুখী হননি আগ্রহী নতুন বিনিয়োগকারীরাও, যে কারণে একেবারে থমকে যায় বিও হিসাব খোলা। ২০১২ সাল থেকে ধীরে ধীরে বিও বাড়তে থাকে। পরবর্তীকালে আবারও বিও খোলার প্রবণতা থমকে যায়। এর আগে সময়মতো বিও ফি না দেয়ায় গত বছর বন্ধ করে দেয়া হয়েছে দেড় লাখের বেশি বিও হিসাব। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধানত দুই কারণে এবার অসংখ্য বিও বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকে বাজারের মন্দা পরিস্থিতি; অন্যটি প্রাইমারি মার্কেট থেকে বিনিয়োগকারীদের সুবিধা না পাওয়া। যে কারণে বিনিয়োগকারীরা ৫০০ টাকা দিয়ে বিও নবায়ন করেননি। ফলে এসব হিসাব বাতিল হয়ে গেছে।
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) ডিপোজিটরি (ব্যবহারিক) প্রবিধানমালা ২০০৩-এর তফসিল-৪ অনুযায়ী বিও হিসাব পরিচালনার জন্য ডিপোজিটরি অংশগ্রহণকারী বা বিনিয়োগকারীকে নির্ধারিত হারে বার্ষিক হিসাবরণ ফি দিয়ে হিসাব নবায়ন করতে হয়। এর আগে পঞ্জিকাবর্ষ হিসেবে প্রতি বছর ডিসেম্বরে এই ফি জমা নেয়া হতো। তবে ২০১০ সালের জুন মাসে বিএসইসি বিও হিসাব নবায়নের সময় পরিবর্তন করে বার্ষিক ফি প্রদানের সময় জুন মাস নির্ধারণ করে। এ সময়ে বিও নবায়ন ফি ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করা হয়। এরপর বিএসইসির জারি করা ২০১১ সালের ১৮ এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপনে ৩০ জুনের মধ্যে বিও হিসাব নবায়নের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়, না হলে তা বাতিল করা হবে বলে ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল।
জুন প্রায় শেষ হয়ে গেলেও অ্যাকাউন্ট হোল্ডাররা বিও নবায়নে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। যে কারণে এখন পর্যন্ত ১০ শতাংশ বিও নবায়ন হয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবায়ন না করলে বিও অ্যাকাউন্টগুলো বাতিল হয়ে যাবে। চলতি বছর বিপুল সংখ্যক অ্যাকাউন্ট বাতিল হবে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
যতটি বিও অ্যাকাউন্ট বাতিল হবে, ধরে নিতে হবে ঠিক ততজন বিনিয়োগকারীই শেয়ারবাজার ছেড়ে চলে যাবেন। এটি শেয়ারবাজারের জন্য অনেকটা অশনি সংকেতের মতো। দিনের পর দিন বাজার অপরিবর্তিত থাকায় কোনোরূপ আশার আলো না দেখে বিও অ্যাকাউন্টধারী অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের বুঝতে হবে। শেয়ারবাজার থেকে যদি ক্ষুদ্র বিনিয়োকারীরা চলে যায়, তাহলে তাদের চলে যাওয়ার পরই বোঝা যাবে শেয়ারবাজার কী রকম টাল-মাটাল অবস্থা পরিগ্রহ করে। তাই সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে শেয়ারবাজারকে চাঙা করার কার্যকর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নতুন বিও অ্যাকাউন্টধারী সৃষ্টিকল্পে তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। নামে-বেনামে যারা শত শত বিও অ্যাকাউন্ট খুলে রেখেছে তাদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। মোট কথা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থ্ াবৃদ্ধির জন্য শেয়ারবাজারকে চাঙা করতে সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রয়াস চালাতে হবে।