প্রতিবেদন

নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদকে শুভেচ্ছা-অভিনন্দন

মেজর তারিকুল ইসলাম মজুমদার পিএসসি, জি (অব.) : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৫তম প্রধান হিসেবে তিন বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন জেনারেল আজিজ আহমেদ। তিনি বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল শফিউল হকের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ২৫ জুন। সরকার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিএ-২৪২৪ লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজিজ আহমেদ, বিজিবিএম, পিবিজিএম, বিজিবিএমএস, পিএসসি, জি কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেলকে ২৫ জুন অপরাহ্ন থেকে জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে প্রতিরা বাহিনী সমূহের প্রধানদের আইন, ২০১৮ অনুসারে ৩ বছরের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
সেনাবাহিনী প্রধানের পদ যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পদ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর েেত্র এ পদ অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত সকল সেনা ইউনিট পাকিস্তান সৈন্যদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূচনা করে। সেই থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধের সূত্রপাত। তারপর এই সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতি গঠনমূলক কাজেও সেনাবাহিনী অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে সেনাসদস্যরা নিজের জীবন বিপন্ন করে জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। রাজনৈতিক েেত্র গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী রেখেছে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এসব কারণেই সেনাবাহিনীর প্রধান কে হবেন তা নিয়ে সাধারণ জনগণের মাঝে সবসময়ই একটি কৌতূহল কাজ করে। জেনারেল আজিজের েেত্রও তা ব্যতিক্রম নয়। এ ধরনের পদে নিযুক্ত হওয়ার পর সাধারণত দুইটি কৌতূহল কাজ করে। একটি হলো কী যোগ্যতা বলে তিনি সেনাপ্রধান হয়েছেন, আর অন্যটি হলো সেনাবাহিনীর প্রধান হবার পর তাঁর ভূমিকাই বা কেমন হবে। জেনারেল আজিজের সঙ্গে আমিও ১৯৮১ সালের ৭ আগস্ট ক্যাডেট হিসেবে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি, ভাটিয়ারীতে যোগদান করেছিলাম। তারপর দীর্ঘ ২ বছর কঠোর প্রশিণের পর ১৯৮৩ সালের ৯ জুন আমরা সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করি। ক্যাডেট হিসেবেও জেনারেল আজিজ অনেক কৃতিত্বের স্বার রেখেছিলেন। মিলিটারি একাডেমিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপয়েন্টমেন্ট হিসেবে একজন ক্রস বেল্ট হোল্ডার ছিলেন। তিনি ছিলেন আন্তরিক এবং কঠোর পরিশ্রমী একজন ক্যাডেট। অফিসার হিসেবেও তিনি কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন। অফিসারদের মৌলিক কোর্সে আমরা অনেক সময় যখন নিজেদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত ছিলাম, লেফটেন্যান্ট আজিজ তখন বই নিয়ে ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসতেন। ফলে এই কোর্সে তিনি প্রথম স্থান দখল করেছিলেন। তার মানে ইংরেজিতে যাকে বলে ‘মর্নিং সোজ দ্য ডে’ তা তিনি তখনই প্রমাণ করেছিলেন। তারপর দীর্ঘ ৩৫ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি সবগুলো বড় কোর্স করেছেন এবং সকল কোর্সেই তীক্ষè প্রতিভার স্বার রেখেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্টাফ কোর্স এবং গানারি স্টাফ কোর্স। গানারি স্টাফ কোর্সে ভালো করার ফলে তিনি ভারতের দেওলালিতে লং গানারি স্টাফ কোর্স নির্বাচিত হয়েছিলেন। দেশের বাইরে এ সমস্ত প্রশিণে চৌকস অফিসারগণই সুযোগ পেয়ে থাকেন।
তবে প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী সেনাবাহিনী প্রধানের মতো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নির্বাচনের েেত্র লেখাপড়াই বড় কথা নয়। এ পদে যেতে হলে আরো অন্য কিছু গুণাবলি থাকতে হয়। আর সেগুলো হলোÑ ১. শিাগত যোগ্যতা, ২. নেতৃত্বদানের গুণাবলি, ৩. অপারেশনাল/কমান্ড সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা, ৪. কর্মদতা, ৫. সামরিক বিদ্যায় পারদর্শিতা, ৬. পরিকল্পনা প্রণয়ন করা ও তা বাস্তবায়নের যোগ্যতা, ৭. ডাইনামিজম, ৮. সততা, ৯. পারিবারিক ঐতিহ্য, ১০. লাস্ট বাট নট দি লিস্ট, সর্বোচ্চ নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ততা। জেনারেল আজিজের মাঝে সবগুলো গুণাবলিই বিদ্যমান। যার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন ২০১২ সালে ডিজি বিজিবি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে। তার আমলে বিজিবি এক নতুন দিগন্তে পদার্পণ করে। বিজিবির উন্নয়নে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন, যা বিজিবির ২ শত বছরের ইতিহাসে বিরল। তিনি সেনাবাহিনীতে ইউনিট থেকে শুরু করে ডিভিশন পর্যন্ত কমান্ড করেছেন। আর্টিলারি কোরের অফিসার হয়েও ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের স্টাফ অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, যা সেনাবাহিনীতে ইয়ং অফিসারদের জন্য প্রাইজ পোস্টিং হিসেবে বিবেচিত।
অবশ্য এতকিছুর পরও জনমনে এমন প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে কেমন হবেন বর্তমান সেনাপ্রধান! আর এর পেছনে যে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসে যায় তাহলোÑ ১. তিনি কেমন নেতৃত্বের গুণাবলি নিয়ে আসবেন তাঁর অধীনস্থদের জন্য। ২. তিনি কেমন আস্থাভাজন হবেন মতাসীন সরকারের নিকট। ৩. তিনি কী ধরনের ভূমিকা পালন করবেন দেশের দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্ত এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে। প্রথম প্রশ্নে তিনি দতার পরিচয় দিয়েছেন সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট, ব্রিগেড এবং ডিভিশন কমান্ড করে। দ্বিতীয় প্রশ্নে বিজিবির ডিজি হিসেবে তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাকি ইস্যুতে জোরালো ভূমিকা পালন করেছেন। ওই সময়কার সরকারের বিশেষ সংকটপূর্ণ সময়ে বিজিবির দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল প্রমাণিত সত্য।
আর শেষ প্রশ্নটি এখনও বাকি রয়েছে ভবিষ্যৎ আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই। উল্লেখ্য, বহির্বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষও দলমত নির্বিশেষে এখনও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওপর আস্থাশীল। তারা আশা করে অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের যেকোনো দুর্যোগ ও সংকটকালীন সময়ে দেশ ও জনগণের পাশে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আর সেনাবাহিনীর প্রতি এ ধরনের ইতিবাচক ধারণা থেকেই এদেশের মানুষ আশা করে নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ তাঁর প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে দেশ ও জনগণের চাহিদা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন যাতে করে তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি আরো বেশি উজ্জ্বল হবে। অনেক শুভকামনা ও অভিনন্দন নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদকে।
লেখক : উপপরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন)
আর্মি ইনস্টিটিউট অব
বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
জালালাবাদ সেনানিবাস, সিলেট