আন্তর্জাতিক

বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীন ভারত ইইউ : উল্টো চাপে আমেরিকা!

নিজস্ব প্রতিবেদক : ডোনাল্ড ট্রাম্পের একগুঁয়েমি ও অতিরিক্ত মোড়লিপনার কারণে বাণিজ্যযুদ্ধে ক্রমেই একা হয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র। বেশ কিছুদিন ধরে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ চরমে পৌঁছেছে। এরপর স্টিল এবং অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে শুল্ক বসানোর পর ইউরোপ, কানাডা এবং ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এতে দৃশ্যতই উল্টো চাপে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনকে শায়েস্তা করতে গিয়ে চীনসহ ভারত ও ইইউর চাপে বিশ্ববাণিজ্যে এখন যুক্তরাষ্ট্রের নাস্তানাবুদ অবস্থা। চীন ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে, তারা তেলসহ আরো মার্কিন পণ্যে শুল্ক আরোপ করছে। একই পদপে নেয়ার কথা ঘোষণা করেছে ভারত, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বিদেশি পণ্য আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। বিভিন্ন চীনা পণ্যের ওপর প্রথমদিকে শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর স্টিল এবং অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতেও ২৫ ভাগ শুল্ক বসায় যুক্তরাষ্ট্র। চীনও মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানিসহ ইইউভুক্ত বিভিন্ন দেশ ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন চীনা পণ্যের ওপর আরো শুল্ক আরোপ করা হবে, যা থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয় হবে। আগামী ৬ জুলাই থেকে এই পদপে কার্যকর হবে। এরপর চীন ঘোষণা করে, তারা তেলসহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে। চীনের এই ঘোষণার পর মার্কিন শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। গত কয়েক মাসে চীনে মার্কিন ক্রুড অয়েলের রপ্তানি অনেক বেড়েছিল। ১৪ জুন থেকে মার্কিন তেল কোম্পানি এক্সন মোবিল এবং শেভরনের শেয়ারে এক থেকে দুইভাগ পতন হয়েছে। একটি তেল কোম্পানির কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এর ফলে চীনে মার্কিন তেল রপ্তানি কমে যাবে। কারণ চীন ক্রুড অয়েলের েেত্র যুক্তরাষ্ট্রের স্থলে ইরানকে বসাতে চাইছে।
স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে শুল্ক আরোপ করায় েেপছে কানাডা এবং ভারতও। গত মার্চে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। ১৬ জুন ভারত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে জানিয়েছে, তারা ৩০টি মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে। ৫০ ভাগ শুল্ক বাড়ানো হবে। স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে শুল্ক আরোপ করায় ভারতের ২৪০ মিলিয়ন ডলারের তি হয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। মার্কিন পণ্যের মধ্যে আপেল, মোটরসাইকেল, যন্ত্রপাতি এবং চিংড়িও রয়েছে। ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপ করায় ভারতের যে তি হয়েছে তা পুষিয়ে নিতেই পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত।
ট্রাম্পের সর্বশেষ শুল্ক আরোপের ঘোষণার পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা ইতোমধ্যেই দিয়েছে চীন। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্রাম্পের নতুন ঘোষণাকে ব্ল্যাকমেইল হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বেইজিং বলেছে, ইতঃপূর্বের বৈঠকগুলোতে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে এটি তার বিরোধী। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও হতাশ করেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঘোষণা। শক্ত প্রতিক্রিয়া ও সমপরিমাণ পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং তারা তা কার্যকর করতে শুরু করেছে।
সমগ্র বিশ্বব্যবস্থা যখন মুক্তবাণিজ্য ও উদার নীতির দিকে ঝুঁকছে, সে সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প হাঁটতে শুরু করেছেন সম্পূর্ণ উল্টো পথে। বিশ্বের এক ও দুই নম্বর অর্থনীতির মধ্যে এই বাণিজ্যযুদ্ধের পরিণতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা বাণিজ্যযুদ্ধে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দেবে সেটা নিশ্চিত।
ট্রাম্পের ঘোষণার পরই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অন্য যেসব দেশ পণ্য সরবরাহ করে তারাও তিগ্রস্ত হবে এতে। গত জি-৭ সম্মেলনেই দেখা গেছে তার প্রতিফলন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সাথে ব্যাপক মতানৈক্য হয়েছে ট্রাম্পের। সেখানে ট্রাম্প ট্রুডোকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলেও টুইট করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানি করে কানাডা থেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনকে মোকাবিলা করতে গিয়ে ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করছেন। এমনকি ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির অনেকেও অবস্থান নিয়েছে তার এই একরোখা বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে। অবশ্য ট্রাম্প এসবকে পাত্তাই দিচ্ছেন না। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, বাণিজ্যযুদ্ধ ভালো এবং আমেরিকার তাতে কোনো তি নেই, বরং লাভ। আসলে এতে কোনো লাভ আছে কি না তা নিশ্চিত হতে পারছেন না খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাই। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের বাণিজ্য বিষয়ক রিপোর্টার অ্যান্ডু ওয়াকার মনে করেন, এতে সমস্যা আরো বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, ফলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে মার্কিন নাগরিকদেরই। অ্যান্ডু ওয়াকার মনে করেন, যেসব চীনা পণ্যে শুল্কারোপ করা হয়েছে, সেসব েেত্র মার্কিন আমদানিকারকরা চীন বাদ দিয়ে বিকল্প সাপ্লায়ার খুঁজে নেবে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের খুব বেশি লাভ হবে না।
অবশ্য অনেক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি ট্রাম্পের একটি রাজনৈতিক চাল। চলতি বছর অনুষ্ঠিত হবে সিনেট নির্বাচন। যে জাতীয়তাবাদের মানসিকতা দেখিয়ে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতেছেন তা-ই আবার কাজে লাগাতে চান তিনি। সিনেটে রিপাবলিকানদের জিতিয়ে আনতে ট্রাম্প দেশের বাণিজ্য উন্নয়ন ও বেকারত্ব হ্রাসের এই টোপ ফেলেছেন। আর মার্কিন ভোটাররা যে কট্টর জাতীয়তাবাদী ইস্যুগুলোকে সমর্থন করে, সেটি তো ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই দেখা গেছে। কিন্তু কথা হচ্ছে চীনের সাথে নতুন একটি সেক্টরে যুদ্ধ লাগিয়ে কতটা সফল হবেন ট্রাম্প? চীন বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় শক্তি। অনেক দিন ধরেই তাদের অর্থনীতির চাকা ক্রমেই জোরে ঘুরছে। বিশ্ববাজার দখলে এখন চীন সবাইকে ছাড়িয়ে। তাই এ যুদ্ধে চীনকে পরাজিত করা ট্রাম্পের একার পে সম্ভব নয়। এমনিতেই বাণিজ্যযুদ্ধ আসলে কাউকে থামিয়ে রাখতে পারে না। রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞ রয়েছে, তবুও সমান তালে যুক্তরাষ্ট্রকে টক্কর দিয়ে চলেছে মস্কো। আর সারা বিশ্বেই চীনা বাজারের যে অবস্থা, তাতে তাদের হারানো ট্রাম্পের পে বেশ কঠিন। তাছাড়া চীনের সঙ্গে এবার যোগ দিয়েছে ভারত, ইইউ ও কানাডা। সুতরাং ট্রাম্পের সামনে বিপদই অপেক্ষা করছে। আসলে ট্রাম্প স্ট্যান্টবাজি করতে গিয়ে মূল্যস্ফীতির বিপদে ফেলে দিয়েছেন মার্কিন নাগরিকদের। এতে করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মহল বলছেন, চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধে নেমে যুক্তরাষ্ট্রই এখন উল্টো চাপে রয়েছে।