প্রতিবেদন

বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালিত : বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক : ২০ জুন ছিল বিশ্ব শরণার্থী দিবস। শরণার্থীদের অধিকার রায় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রতি বছর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এ দিবসটি পালন করে। এ দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়Ñ ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে নতুন করে আশ্রয় নেয়া ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা নিবন্ধিত হয়েছে; যা শরণার্থী সংখ্যার মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম। আশ্রয়দাতা দেশের মধ্যে তুরস্ক নতুন শরণার্থী নিবন্ধনের সংখ্যায় সবচেয়ে বৃহত্তম। দেশটি সিরিয়ার ৬ লাখ ৮১ হাজার অধিবাসীকে অস্থায়ী সুরা প্রদান করেছিল। প্রতিবেদন অনুসারে কক্সবাজার জেলায় বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ফলে দেশটির স্থানীয় বাসিন্দা ও সম্পদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ২০ জুন আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবসকে সামনে রেখে প্রতি বছর ইউএনএইচসিআর-এর গ্লোবাল ট্রেন্ডস রিপোর্টটি বিশ্বব্যাপী প্রকাশিত হয় এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ওপর ইউএনএইচসিআর, সরকার ও অন্যান্য সহযোগী সংস্থা কর্তৃক সংগৃহীত তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রকাশিত বার্ষিক গ্লোবাল ট্রেন্ডস রিপোর্টে বলা হয়Ñ বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রাষ্ট্রহীন এবং উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের আন্তর্জাতিক সুরা প্রয়োজন। গত আগস্টে মিয়ানমারে নৃশংস সহিংসতা চলাকালে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ শরণার্থী বাংলাদেশে আসে। সে সময় থেকে প্রতিদিন কয়েক হাজার শরণার্থী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে, যা গত দুই দশকের মধ্যে এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় এবং দ্রুততম শরণার্থী প্রবাহ ছিল। কক্সবাজারের কুতুপালং, বালুখালি এখন বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী আশ্রয়স্থল। ঘনবসতিপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্যোগময় আবহাওয়ার সময় বিশেষ করে মে ও সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্ষা মৌসুমে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বাড়ছে।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি বৃহৎ অংশ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। তাদের অর্ধেকের বেশির বয়স ১৮ বছরের নিচে, অর্ধেকের বেশি নারী ও মেয়ে শিশু এবং এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পরিবারের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে বলে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের অনেকেই নিজ দেশে যৌন নির্যাতন এবং মানসিক আঘাতসহ চরম সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। ইউএনএইচসিআর মিয়ানমার সরকারকে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা, নাগরিকত্ব প্রদানসহ সমস্যার মূল কারণগুলো সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্ব শরণার্থী দিবসে বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘জোরালো মানবিক সহায়তাদান ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র লাখো আশ্রয়প্রার্থী ও অন্যান্য আইনি ব্যবস্থার আওতায় সাময়িক সুরা পাওয়া মানুষকে ঠাঁই দিয়েছে।’ বার্নিকাটের ওই নিবন্ধ বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নীতি আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে শরণার্থী শিবির হতে দেবেন না।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নিরাপত্তা বাহিনী ও তাদের দোসরদের ক্রমাগত নির্যাতন, জাতিগত নিধন, গণহত্যা এবং তা ঠেকাতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের ব্যর্থতায় গত কয়েক দশক ধরে লাখ লাখ শরণার্থীর বোঝা চেপেছে বাংলাদেশের ওপর। সর্বশেষ গত বছরের ২৫ আগস্ট নতুন করে গণহত্যা শুরু হওয়ার পর আরো প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। বিশাল জনগোষ্ঠীর বোঝা সত্ত্বেও মানবিক কারণে ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা অনুযায়ী সীমান্ত খোলা রেখেছে বাংলাদেশ। কৌশলগত কারণে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শরণার্থী’ ঘোষণা দিয়ে তাদের দায়িত্ব জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) কাছে হস্তান্তর করেনি। তবে শরণার্থী হিসেবে প্রাপ্য প্রায় সব সুবিধা রোহিঙ্গাদের দেয়ার পাশাপাশি তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ল্েয কাজ করে চলেছে বাংলাদেশ।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গারা কবে ফিরবে বা আদৌ ফিরবে কি না তা কেউ জানে না। তারা যদি না ফেরে তাহলে নিঃসন্দেহে এ বোঝা বাংলাদেশের জন্য স্থায়ী রূপ নেবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক স্বদেশ খবরকে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো যখন আশ্রয়প্রার্থী বা শরণার্থীদের জন্য নিজেদের সীমান্ত বন্ধ করে দিচ্ছে তখন বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে অত্যন্ত মানবিকতা ও মহানুভবতা দেখিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোও চেয়েছিল বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিক। এখন এ সমস্যার সমাধান করাও পশ্চিমা দেশগুলোর নৈতিক দায়িত্ব।
সম্প্রতি পাহাড়ধসে রোহিঙ্গার পাশাপাশি বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে ওই কূটনীতিক বলেন, পশ্চিমাদের উচিত বাস্তবতার নিরিখে কথা বলা। পাহাড়ধসে যতজন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে তার কয়েক গুণ বেশি বাংলাদেশি নিহত হয়েছে।
পশ্চিমা সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের পর অনেক দেশ মানবিক সহায়তার প্রস্তাব দিলেও শরণার্থীর বোঝার ভাগ নেয়ার প্রস্তাব তুলেছে কেবল কানাডা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত রোহিঙ্গাদের কানাডায় আশ্রয় দেয়ার সুপারিশ করেন। কানাডার জনগণের বড় অংশও একে সমর্থন করে। কিন্তু অতীত সময়ে সীমিত পরিসরে এ ধরনের শরণার্থী স্থানান্তর ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনি।
শরণার্থী ও শরণার্থীর মতো পরিস্থিতিতে থাকা লোকদের নিয়ে কাজ করা ইউএনএইচসিআর এক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৭ সাল শেষে বিশ্বে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ব্যক্তির সংখ্যা ৬ কোটি ৮০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। যুদ্ধ, সহিংসতা ও নির্যাতনের কারণে বিশ্বব্যাপী জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। টানা পঞ্চমবারের মতো বাস্তুচ্যুতির হার বেড়েছে। কঙ্গোর সংকট, দণি সুদানের যুদ্ধ এবং মিয়ানমার থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া এ েেত্র মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। এতে মূলত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোই বেশি তিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপো গ্র্যান্ডি বলেন, ‘আমরা একটা সন্ধিণে আছি, যেখানে বিশ্বব্যাপী জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা সফলতার জন্য দরকার নতুন এবং অধিক সর্বাঙ্গীণ পন্থা, যাতে কোনো দেশ ও জনগোষ্ঠীকে এই সমস্যা একা মোকাবিলা করতে না হয়।’ এ েেত্র আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘শরণার্থী পরিস্থিতিতে সাড়া দেয়ার জন্য এরই মধ্যে ১৪টি দেশ একটি নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই শরণার্থীদের ওপর একটি নতুন গ্লোবাল কম্প্যাক্ট জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হবে।’
ইউএনএইচসিআর বলছে, বিশ্বে শুধু ২০১৭ সালেই বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১ কোটি ৬২ লাখ মানুষ। গড় হিসাবে তা দিনে সাড়ে ৪৪ হাজার এবং প্রতি ২ সেকেন্ডে ১ জন। বিশ্বে এখন শরণার্থীর সংখ্যা অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা থাইল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার প্রায় সমান।