প্রতিবেদন

ভোটের হাওয়া : খুলনা-গাজীপুরের পর রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন নির্বাচনি আমেজে উদ্বেল সারা বাংলাদেশ

মেহেদী হাসান : রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন-ইসি। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রার্থীদের ২৮ জুনের মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। ১৩ জুন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ এই তফসিল ঘোষণা করে বলেন, ‘রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র, সংরতি আসনের কাউন্সিলর ও সাধারণ আসনের কাউন্সিলরদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ সময় ২৮ জুন। রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। রিটার্নিং অফিসার ১ থেকে ২ জুলাই মনোনয়নপত্র বাছাই করবেন। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ৯ জুলাই। ৩০ জুলাই ভোট গ্রহণ হবে। বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে জানান ইসি সচিব। হেলালুদ্দীন জানান, রাজশাহীতে ১০ জন, বরিশালে ১০ জন ও সিলেটে ৯ জনকে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পরে আপিল কর্তৃপ হিসেবে সহকারী বিভাগীয় কমিশনার দায়িত্ব পালন করবেন। ইসি সচিব বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তবে এই তিন সিটি নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে। আর খুলনায় ২টি ও গাজীপুরের ৬টি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে।
ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৩০ জুলাই। ১৫ মে অনুষ্ঠিত হয়েছিল খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। সে নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক। ২৬ জুন অনুষ্ঠিত হয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। দেশের এক-তৃতীয়াংশ জনপদ এ মুহূর্তে সরাসরি নির্বাচনে আছে। অক্টোবর থেকে সারাদেশে পুরোদমে শুরু হয়ে যাবে জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণা। ৩০০ সংসদীয় আসনে একযোগে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে সারাদেশে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে একদফা নির্বাচনি প্রচারণা শেষ করেছেন। ঈদের কোলাকোলিকে তারা নির্বাচনি কোলাকোলিতে পরিণত করেছেন। বর্তমান এমপিরাও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের নামে একদম ভোটারের ঘর পর্যন্ত গিয়েছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীদের এবার বেশি করে জাকাত-ফিতরা ও গরিবদের নতুন কাপড় দিতে দেখা গেছে। অনেক জায়গায় রাজনৈতিক নেতাদের রীতিমতো প্যান্ডেল টানিয়ে মানুষজনকে নতুন কাপড় ও নগদ টাকা দিতে দেখা গেছে।
ঈদুল ফিতর উপলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রায় সবাই নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় গেছেন। কেন্দ্রীয় অনেক নেতাই এবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও শুভেচ্ছা বিনিময় করেননি। ঈদকে নির্বাচনি প্রচারণার কাজে পুরোপুরি ব্যবহারের জন্য তারা নির্বাচনি এলাকায় ঈদ করাকে শ্রেয় মনে করেছেন।
এবার ঢাকায় ঈদ করেননি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও। গত ১৪ জুন নিজ নির্বাচনি এলাকা নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে যান তিনি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদও ঈদ করেন নিজ নির্বাচনি এলাকা কোম্পানীগঞ্জে। দুই দলের এই দুই হেভিওয়েট নেতার বাড়ি একই নির্বাচনি এলাকায় হওয়ায় ওই আসনের ভোটারদের ঈদ উদযাপিত হয় বাড়তি আনন্দের সাথে। উভয় নেতাই তার অনুসারীদের জন্য কিছু না কিছু উপহারের ব্যবস্থা করেন, ভোটার ও সমর্থকদের সঙ্গে তারা করেন অকৃত্রিম শুভেচ্ছা বিনিময়। মওদুদ-ওবায়দুল-এর মতো বৃহত্তম নোয়াখালীর সব কেন্দ্রীয় নেতাই এবারের ঈদে নির্বাচনি প্রচারণায় ছিলেন অতিমাত্রায় সক্রিয়। ফলশ্রুতিতে বৃহত্তর নোয়াখালীর ভোটারদের ঈদে এবার যোগ হয়েছে বাড়তি পাওয়া। নোয়াখালীর মতো আসলে সারা বাংলাদেশের ভোটারদের সঙ্গেই এবারের ঈদে রাজনৈতিক নেতাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়েছে। হয়েছে উপঢৌকন ও শুভেচ্ছা বিনিময়।
প্রতিবারের মতো এবারও নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে ঈদ করেছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ঈদের সময় ছিলেন তার নির্বাচনি এলাকা ভোলায়। সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ ঈদ করেছেন তার নির্বাচনি এলাকা ফরিদপুরে। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ঈদ করেছেন নিজ নির্বাচনি এলাকা ঢাকার মোহাম্মদপুরে। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মণি নিজ এলাকা চাঁদপুরের মানুষের সঙ্গে ঈদ করেছেন। এছাড়া আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমানও ঈদ করেছেন তার নিজ এলাকা ফরিদপুরের মানুষের সঙ্গে। সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ আল মাহমুদ স্বপন জয়পুরহাটের নিজ নির্বাচনি এলাকায় ঈদ উদযাপন করেছেন। নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে ঈদ করেছেন সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীম। পাশাপাশি আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ঈদ করেছেন নিজ নির্বাচনি এলাকা চট্টগ্রামে।
আওয়ামী লীগ নেতাদের পাশাপাশি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও সাধ্যমত নিজ নিজ এলাকায় ঈদ করেছেন। তবে ঈদের দিন জেলে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার জন্য বিএনপি নেতাদের নির্বাচনি এলাকায় যাওয়ার প্রবণতা ছিল কম। তবে তারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে না পেরে ঈদের দিন বিকেলের দিকে নির্বাচনি এলাকায় যেতে শুরু করেন।
এসবের পাশাপাশি গাজীপুর, বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহীতে সিটি করপোরেশন নির্বাচন থাকায় এই ৪ মহানগরীর রাজনৈতিক নেতারাও সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচনের নির্বাচনি প্রচারণাও চালান। এই চার সিটিতে ভোটারদের সাথে প্রার্থীদের সংযোগ ঘটে ইতিবাচকভাবে। প্রার্থীরা ভোট চাইতে যেমন ভোটারের ঘরে ঘরে যান, তেমনি ভোটারদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছাও বিনিময় করেন সমানতালে।
বলা যায় এবারের ঈদুল ফিতর থেকেই আসলে শুরু হয়ে গেছে ৪ সিটি নির্বাচন পেরিয়ে জাতীয় নির্বাচনের কাউন্ট-ডাউন। ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্বাচনি জ্বরে আক্রান্ত থাকবে দেশ। চায়ের কাপে ঝড় উঠবে। নিজ দলের প্রার্থীর গুণগানে মুখর থাকবে কর্মী-সমর্থকরা। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের একটি উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে ২০১৮ সাল হয়ে উঠবে একটি আনন্দময় নির্বাচনি বছর। আর দেশি-বিদেশি সবাই এ নির্বাচনি উৎসবের দিকেই তাকিয়ে আছে উন্মুখ হয়ে।