প্রতিবেদন

সুশীল সমাজের উদ্যোগে মানববন্ধন : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বিশ্ববাসীকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক : রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনে বিশ্বের সরকারগুলোকে দ্রুত কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ। তারা বলেছেন, বর্তমানে দেশের ১০ লাখ শরণার্থীকে নিজ গৃহ ছেড়ে অন্য দেশের সীমানা অতিক্রম করতে বাধ্য করায়, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। এ জন্য তাদের অবশ্যই আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
গত ১৯ জুন জাতীয় প্রেসকাবের সামনে বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলে ‘বাংলাদেশে আগত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দ্রুত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা এসব কথা বলেন। কোস্ট ট্রাস্ট ও কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) যৌথভাবে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে।
বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের প্রধান নির্বাহী এএইচএম বজলুর রহমান বলেন, দেশে আগত প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মানে বিশাল এক কর্মশক্তি, যা অলসভাবে বসে আছে। কাজ করলে তারা অনেক কিছু উৎপাদন করতে পারত। আবার কাজ না করার কারণে তাদের নানা অনাকাক্সিত কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কতটা অমানবিক জীবনযাপন করছে তা অনুধাবন করতে না পারলে তাদের জন্য দাবি তোলা সহজ নয়। জাতীয় শ্রমিক নিরাপত্তা জোটের খন্দকার আব্দুস সালাম বলেন, কক্সবাজারে দুই লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিবার রয়েছে এবং একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ৮০ হাজার নতুন শিশু এখানে জন্ম নেবে। এ বিপুল জনগোষ্ঠীর দায়ভার কে নেবে? এই পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশ সরকার যেমন দায়ী নয়, রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও দায়ী নয়। এর জন্য এককভাবে দায়ী মিয়ানমারের সামরিক জান্তা, যাকে অবিলম্বে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের বদরুল আলম বলেন, এ মুহূর্তে পৃথিবীতে প্রায় ৭ কোটি শরণার্থী রয়েছে। আমরা জানি না, বিশ্বের সরকারগুলো তাদের জন্য কী করছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের শরণার্থী এজেন্সি একটি পিটিশন দিয়েছে যেখানে বিশ্বের সকল সরকারকে আহ্বান করা হয়েছে তারা যেন অবশ্যই শরণার্থীদের প্রতি সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে।
কোস্ট ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক বরকত উল্লাহ মারুফ বলেন, শরণার্থীরা সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে শরণার্থীদের ঘর ছাড়তে বাধ্য করার জন্য সংঘটিত যুদ্ধ ও ঘৃণা। বিশ্বের দেশে দেশে সংঘটিত এ যুদ্ধ ও জাতিগত ঘৃণা তাই মানবতাবিরোধী অপরাধ। যা নারী ও শিশুদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করতে হবে। যাতে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা অবিলম্বে মর্যাদার সঙ্গে ও তাদের সকল অধিকার নিয়ে নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। কোস্ট ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, বিশাল রোহিঙ্গা শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আশ্রয়, খাদ্য ও জরুরি চিকিৎসা প্রদানের জন্য আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। তবে এখন এ শরণার্থীদের দ্রুত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্যও আমাদের কাজ করতে হবে।

৩০ জুন বাংলাদেশ সফরে আসছেন জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংক প্রধান

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুটেরেজ এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম রোহিঙ্গাদের দেখতে আগামী ১ জুলাই ৩ দিনের সফরে ঢাকায় আসছেন। তারা একসঙ্গে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন। সফরকালে তারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিনে দেখবেন।
জানা যায়, আগামী ৩০ জুন ৩ দিনের জন্য ঢাকায় আসছেন এই দুই সংস্থার প্রধান। ঢাকায় আসার পর অ্যান্তোনিও গুটেরেজ ও জিম ইয়ং কিম কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গেও বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। অ্যান্তোনিও গুটেরেজ জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআরের প্রধান থাকাকালে ২০০৮ সালে একবার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে এসেছিলেন। কিন্তু জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে এটাই তার প্রথম বাংলাদেশ সফর। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের এটি দ্বিতীয় সফর। গত বছর বৈশ্বিক দারিদ্র্য নিরসন দিবস পালন সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। গত বছরের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিধন অভিযান শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এসব রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি প্রত্যাবাসন চুক্তি হলেও এখন পর্যন্ত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার দাবি রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো উপযুক্ত পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি মিয়ানমারে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ দুই আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানের বাংলাদেশ সফর বর্তমান সময়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে সূত্র জানায়, সম্পূর্ণ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও বাংলাদেশের পে তাদের ভরণপোষণ ও যতদিন এখানে অবস্থান করবেন ততদিন সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এর পরিপ্রেেিত রোহিঙ্গাদের সহায়তায় তাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বনেতাদের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থা এগিয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাংকও রোহিঙ্গাদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর অভিযানকে জাতিগত নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মহাসচিব রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের জন্য মিয়ানমার সামরিক জান্তার কঠোর সমালোচনা করেন এবং রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার জন্য বিশ্ববাসীকে পাশে দাঁড়ানোরও আহ্বান জানান।